ভূমিহীন মানুষও শেষ পর্যন্ত মাটির পৃথিবীকেই আঁকড়ে বাঁচে। অথচ সম্পত্তি ও ভূমি ভাগাভাগির সময় আপনজনের আচরণে মনে দীর্ঘশ্বাস ওঠে- ‘মাটি কখনো দুই ভাগ হয় না!’ মানুষের লোভ ও সীমাহীন চাওয়ার শেষ নেই। পবিত্র কুরআনে মানব প্রকৃতির এই রূপ তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘মানুষের জন্য ওই সব বস্তুর আসক্তিকে মনোরম করা হয়েছে, যা তার প্রবৃত্তির চাহিদা মোতাবেক অর্থাৎ নারী, সন্তান, রাশিকৃত স্বর্ণ-রুপা, চিহ্নিত অশ্বরাজি, চতুষ্পদ জন্তু ও ক্ষেত-খামার।
এসব ইহ-জীবনের ভোগসামগ্রী’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৪)। রক্তের সম্পর্কের ভাইবোনের টান জন্মগত ও পবিত্র। অথচ এই রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়রাই অনেক সময় বোনদের সম্পত্তি জোরপূর্বক আত্মসাৎ করে। এক হাঁড়িতে খেয়ে ও একই ছাদের নিচে বড় হওয়া ভাইবোনের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং আস্থার অভাব একসময় অধিকার ও আত্মসম্মানের প্রশ্নকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করে। পরিণতিতে পারস্পরিক দূরত্ব ও ফাটল হয়ে ওঠে চিরস্থায়ী।
মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টনের জন্য সুরা নিসার বিভিন্ন আয়াতে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে বোনদের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু মুনাফিক ও লোভী মানুষরা প্রতারণার আশ্রয় নেয়। হারাম উপার্জনের শাস্তি প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘ধ্বংস ও বিপর্যয় ধোঁকাবাজদের জন্য’ (সুরা মুতাফফিফিন, আয়াত : ১)। মানুষের হক দুই প্রকার- আল্লাহর হক এবং বান্দার হক। বান্দার হক নষ্ট হলে প্রাপক ক্ষমা না করা পর্যন্ত আল্লাহ তা ক্ষমা করেন না।
আল্লাহ তায়ালার কঠোর সতর্কতা হলো, ‘যারা অন্যায়ভাবে এতিমদের সম্পত্তি আত্মসাৎ করে, তারা মূলত তাদের পেটে আগুন ঢুকাচ্ছে। অচিরেই তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১০)। ক্ষমতার প্রভাব বা আইনি প্যাঁচে ফেলে সম্পত্তি জবরদখল করা সম্পূর্ণ অবৈধ ও অনৈতিক। পবিত্র কুরআনের ঘোষণা হলো, ‘তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং জেনেশুনে গুনাহর উদ্দেশ্যে তা শাসকের হাতেও তুলে দিয়ো না’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৮)। দুনিয়ার প্রাচুর্যের মোহ মানুষকে যতই অস্থির করে তুলুক না কেন, সব সম্পত্তির প্রকৃত মালিক মহান আল্লাহ। মানুষের মালিকানা কেবল সাময়িক।
দুনিয়ার মোহে অন্ধ হয়ে যারা অন্যায়ভাবে ওয়ারিশদের ঠকায়, তাদের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ম্যাকিয়াভেলি তার ‘দ্য প্রিন্স’ গ্রন্থে বলেছেন, মানুষ পিতার মৃত্যু খুব দ্রুত ভুলে গেলেও পৈতৃক সম্পত্তির মায়া কখনো ভুলতে পারে না। বস্তুবাদী দুনিয়ায় মানুষ নিজের স্বার্থের টানে ভাইবোন ও ওয়ারিশদের হক মেরে খেতে দ্বিধাবোধ করে না। অথচ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে মাটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘মাটি হতে তোমাদের সৃষ্টি করেছি, মাটিই তোমাদের ফিরিয়ে নেবে, মাটি থেকেই পুনরায় বের করে আনব’ (সুরা তোয়াহা, আয়াত : ৫২৫)।
তাই সম্পত্তি আত্মসাতের লোভে অন্ধ না হয়ে আমাদের উচিত অন্যের হক ফিরিয়ে দেওয়া এবং পরকালের জবাবদিহিতার কথা স্মরণ করা। দুনিয়ার লোভ ও স্বজনপ্রীতি ত্যাগ করে কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশ অনুযায়ী ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, গাজীপুর
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি