দুই ভাগ হচ্ছে এনবিআর

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পুনর্গঠনের বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে কঠোর বার্তা দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।তিনি

2026-06-22T00:40:00+00:00
2026-06-22T00:41:41+00:00
 
  শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
দুই ভাগ হচ্ছে এনবিআর
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬, ১২:৪০ এএম  আপডেট: ২২.০৬.২০২৬ ১২:৪১ এএম
জাতীয় রাজস্ব ভবন। সংগৃহীত ছবি
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পুনর্গঠনের বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে কঠোর বার্তা দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। 

তিনি বলেছেন, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে পৃথক করতে এনবিআরকে দুই ভাগ করা হবে এবং এ প্রক্রিয়ায় কেউ বাধা সৃষ্টি করলে প্রশাসনে তার জায়গা হবে না। 

রোববার (২১ জুন) রাজধানীর লেকশোর হোটেলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) বাজেট সংলাপে এমন মন্তব্য করেন তিনি। 

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, কর প্রশাসন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির লক্ষ্যে পরিচালিত বিস্তৃত সংস্কারের অংশ হিসেবে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন এবং এর ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়াকে আলাদা করা হবে। এনবিআর এমন একটি সমস্যা, যা আমাদের সমাধান করতে হবে। রাজস্ব কর্তৃপক্ষের বর্তমান কাঠামো দীর্ঘকাল ধরে নীতি-সংক্রান্ত দুর্বলতায় ভুগছে এবং প্রস্তাবিত এই পুনর্গঠনের মূল উদ্দেশ্য হলো সেই সব সীমাবদ্ধতা ও ঘাটতিগুলো দূর করা। 

তিনি বলেন, কর বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে, অন্যদিকে আমলারা কেবল সেই নীতিগুলো বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেবেন। আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত নীতি প্রণয়নের ওপর জোর দিয়ে আমির খসরু বলেন, নীতি নির্ধারণী পর্যায় আমলাদের দ্বারা পরিচালিত হতে যাচ্ছে না। 

আমরা চাই কর বিশেষজ্ঞ এবং যারা বাংলাদেশ ও এ দেশের মানুষকে বোঝেন, তারা নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় আসুক। নীতি নির্ধারণের দুর্বলতাই ছিল বাংলাদেশের সামগ্রিক কর ব্যবস্থা এবং এনবিআরের অন্যতম প্রধান সমস্যা। শুরুতেই যদি আপনি এটি (নীতি নির্ধারণ) ঠিক করতে পারেন, তবে সমস্যার ৫০ শতাংশ সমাধান হয়ে যায়। 

এ ছাড়া নীতি প্রণয়নকে ব্যবস্থাপনা থেকে আলাদা করার মাধ্যমে কর প্রশাসনের সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে, যা শেষ পর্যন্ত দেশের বর্তমান কর-জিডিপি অনুপাতকে কাক্সিক্ষত পর্যায়ে উন্নীত করতে সহায়ক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল সাপোর্ট কমে আসছে ঠিক এই সময়ে আমাদের বাজেট দিতে হয়েছে। প্রত্যেক জায়গায় শুধু শুনি বাকি বাকি (টাকা)। 

পাওয়ার প্লান্ট বিলই বাকি আছে ৫০ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া এই বাজেটের প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে ঋণের সুদ বা ডেট সার্ভিসিংয়ে। ফলে সরকারের খরচের জায়গা বা ‘ফিসকাল স্পেস’ সংকুচিত হয়ে আসছে। তারপরও দেশের সামগ্রিক জনঅর্থায়ন কাঠামো সংস্কারের মাধ্যমে স্থানীয় ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ট্যাক্স ও জিডিপি বৃদ্ধিসহ বিকল্প অর্থায়নের পথে হাঁটছে সরকার। সবকিছুর জন্য আমাদের দুই বছর সময় দিতে হবে। দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুরোপুরি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনতে সরকারের অন্তত দুই বছর সময় লাগবে, তা হলে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যাবে। 

তিনি বলেন, আমরা দেশের উন্নয়নে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও শক্তিশালী ইন্টারনেট- এই তিন সেক্টরে ইনভেস্ট করছি। এ ছাড়া দেশের উন্নতির জন্য দেশকে অবশ্যই ডিরেগুলেশন করার ওপর জোর দেন তিনি।

অন্যদিকে জাতি হিসেবে আমরা ট্যাক্স দিতে চাই না জানিয়ে তিনি বলেন, ট্যাক্সের লোক দেখলে মানুষ ভয় পায়। এটা খারাপ অভ্যাস। 

ব্যবসা বৃদ্ধির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন যে এক্সপোর্ট করতে চাইবে তাকেই বন্ড দেওয়া হবে। আর কেউ যদি বন্ড না নেয় তা হলে তাকে এক্সপোর্টের ক্ষেত্রে ডিউটি ফ্রি করে দেব। এ ছাড়া সবার জন্য এখন এলসিও খোলা বাধ্যতামূলক নয়। সরাসরি তারা পেমেন্ট করতে পারবে। গ্রাজুয়ালি ডাইরেক্ট রেমিট্যান্স করবে। এখন এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হবে।

তবে আসন্ন বাজেট ব্যবসায়ীবান্ধব হয়েছে কিন্তু শ্রমিকদের জন্য কিছুই বলা হয়নি এবং রাখা হয়নি। এত বড় বাজেটেও তাদের জীবনের কোনো পরিবর্তন আসেনি। সবসময়ের মতো এবারও তারা উপেক্ষিত রয়েছেন জানিয়ে সংলাপে বাজেট নিয়ে সমালোচনা করেছেন গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিউনের সভাপতি অ্যাডভোকেট মন্টু ঘোষ। 

তিনি বলেন, অর্থনীতির এই কঠিন সময়ে বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংসার চলছে না শ্রমিকদের। তাই বেঁচে থাকতে অনেক শ্রমিক কিছু টাকা বাড়তি কামাইয়ের জন্য অতিরিক্ত ডিউটিসহ ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করছে। কোথাও বাড়তি কাজের সুযোগ না পেলে চাকরিও ছেড়ে দিচ্ছে। এমন অবস্থায় শ্রমিকদের জন্য ‘রেশনিং প্রথা’ চালু করার বিকল্প নেই, যার জন্য অনেক দিন ধরে দাবি তোলা হচ্ছে।

অন্যদিকে সংলাপ চলাকালে এক প্রশ্নে বাংলাদেশ পোশাক শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক তাহমিদা খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশে এত কার্ড চালু হয়েছে কিন্তু শ্রমিক কার্ড কেন চালু হলো না? তা হলে এই ফ্যামিলি কার্ড কি ভবিষ্যৎ ‘ভোট ব্যাংক’ বলে অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছোড়েন তিনি। সেই সঙ্গে মন্ত্রী হওয়ার পর শ্রমিকদের কথা তারা ভুলে যান কি না- তাও জানতে চান। 

ওই শ্রমিক নেতা তার দাবিতে বলেন, শ্রমিকদের জন্য ভর্তুকি মূল্যে এক হাজার টাকার খাদ্য সহায়তা দিতে হবে। এ ছাড়া তাদের জন্য দুর্ঘটনাজনিত স্কিম চালু করতে হবে। সে সঙ্গে শ্রমিকদের জন্য ডরমেটরির কথা জানান তিনি। 

তাহমিদা বলেন, ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করে শুধু ওপরে উঠবেন আর শ্রমিকরা সবসময় পদদলিত হবে। এ সময় আরেকবার মজুরি ঘোষণা করার কথা জানান এই শ্রমিক নেতা।

তবে সংলাপে ওঠা শ্রমিক নেতাদের প্রশ্নের জবাবে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান ‘কস্ট অব লিভিং’য়ে চলা আসলেই কষ্টকর। শ্রমিকদের বেতন সরকার দেয় না। তবে তাদের সুবিধা বাড়ানোর জন্য সরকার শ্রমিক পলিসি করতে পারেন, যেন মালিকপক্ষ বেতন দেয়। আমরা শ্রমিক আইন পাস করেছি, তা আইএলওতে সাবমিশন করেছি। তিনি বলেন, বাজেটে সমাজের সর্ব স্তরের মানুষকে এড্রেস করার চেষ্টা করেছি। প্রতিবন্ধীদের ভাতা বাড়ানো- সেই সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড অধিকাংশ পরিবারে কিছুটা স্বস্তি আনবে। 


এ ছাড়া শ্রমিক নেতা তাহমিদা খাতুনের তোলা প্রশ্ন টেনে তিনি বলেন, স্বচ্ছলতার জন্য বাজেটে থাকা ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে আপনি (তাহমিদা) কিছুটা সহায়তা পাচ্ছেন। অনেক শ্রমিকই এই সহায়তার আওতায় রয়েছে। তবে তার এমন কথায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ওই শ্রমিক নেতা। সংলাপ শেষে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় তার। 

তিনি বলেন, আসলে মন্ত্রী যা বলেছেন তা ভুল। তিনি না জেনেই বলেছেন যে, আমি কার্ডের সহায়তা পাই। কিন্তু আমি তা পাই না। এটা মিসকোট করা হয়েছে। আসলে তিনি আমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেননি। 

সিপিডির এই সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে অর্থমন্ত্রী ছাড়াও বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি এবং এনসিপির শীর্ষ নেতা ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আলোচক ছিলেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান, রিসার্স অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ, বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। প্রবন্ধে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণে সহায়তার জন্য বাজেটে পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনার অভাব থাকার কথা জানান তিনি। 

এটিসহ বাজেট নিয়ে মোট আটটি অবজারভেশন তুলে ধরেন তিনি। অবজারভেশনগুলো হলো- ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক প্রকল্প আশাব্যঞ্জক বলে মনে হচ্ছে; প্রস্তাবিত আর্থিক কাঠামোটির টিকে থাকার সম্ভাবনা কম; সরকারি ব্যয়কে মানব সম্পদ খাতের দিকে নতুন করে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে; এডিপি একটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প, কিন্তু এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে; রাজস্ব ব্যবস্থা পূর্বাভাসযোগ্যতা প্রতিফলিত করে কিন্তু ন্যায্যতার উদ্বেগ সৃষ্টি করে; স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণে সহায়তার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনার অভাব রয়েছে; অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত সামাজিক খাতগুলোর বাস্তবায়ন সক্ষমতার অভাব রয়েছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বরাদ্দ একটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করে। 

সময়ের আলো/জেডি 

  বিষয়:   দুই ভাগ  এনবিআর  জাতীয় রাজস্ব বোর্ড  আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: