চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষভাগে এসে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে। একদিকে প্রবাসী আয়ে (রেমিট্যান্স) একের পর এক রেকর্ড হচ্ছে, যার ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ডলারের জোগান আগের চেয়ে অনেক স্বাভাবিক ও পর্যাপ্ত। অন্যদিকে দেশের শিল্পায়নের প্রধান চালিকাশক্তি- ঋণপত্র বা এলসি খোলা এবং নিষ্পত্তির পরিমাণ প্রায় সব খাতেই আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বাজারে ডলারের সংকট নেই বলে বারবার আশ্বস্ত করা হলেও বাস্তবে আমদানির চাকা স্থবির হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের চিফ ইকোনমিস্টস ইউনিট প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন এবং খাত-সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণে অর্থনীতির এই উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে।
অর্থনীতিবিদ ও দেশের শীর্ষস্থনীয় ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, ডলারের জোগান এখন মূল সমস্যা নয়। ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের তীব্র আস্থার সংকট, ব্যাংক ঋণের আকাশচুম্বী সুদহার, উৎপাদন খাতের প্রধান বাধা জ্বালানি (গ্যাস ও বিদ্যুৎ) সংকট এবং সর্বোপরি ‘কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস’ বা ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ার কারণেই মূলত উদ্যোক্তারা নতুন কোনো বিনিয়োগে যাচ্ছেন না। ফলে বাজারে ডলার থাকা সত্ত্বেও শিল্প খাতের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির এলসি কমে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের কর্মসংস্থান, উৎপাদন এবং প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
পরিসংখ্যানে এলসি পরিস্থিতি : সব খাতেই মন্দার গ্রাস
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে সামগ্রিক এলসি খোলার পরিমাণ এবং এলসি নিষ্পত্তি- উভয় ক্ষেত্রেই পূর্ববর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় একটি বড় ধরনের পতন বা নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দেশের উৎপাদনমুখী ও আমদানি খাতের প্রধান প্রধান স্তম্ভগুলোর বর্তমান চিত্রও করুণ।
মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ধস : একটি দেশের নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন, বিদ্যমান কারখানার সম্প্রসারণ কিংবা পুরোনো কারখানার আধুনিকায়নের (বিএমআরই) প্রধান সূচক হলো মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি। এই খাতের চিত্রটি সবচেয়ে বেশি হতাশাজনক। তথ্যানুযায়ী, গত অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য যেখানে ১.৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এলসি খোলা হয়েছিল, চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১.৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। অর্থাৎ এই খাতে নতুন এলসি খোলা কমেছে ১০.৪৩ শতাংশ।
একইভাবে মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণও আগের অর্থবছরের ১.৫৪ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩.০৭ শতাংশ কমে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ১.৩৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এই ধারাবাহিক পতন এটাই প্রমাণ করে যে, দেশের বেসরকারি খাতে নতুন কোনো বড় শিল্প প্রকল্প বা বিনিয়োগ আসছে না।
শিল্পের কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি হ্রাস : মূলধনী যন্ত্রপাতির পাশাপাশি দেশের চলমান কারখানাগুলো চালু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতেও মন্দা চলছে। জুলাই-মার্চ ঋণ-২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, মধ্যবর্তী পণ্য (ইন্টারমিডিয়েট গুডস) আমদানির ক্ষেত্রে এলসি নিষ্পত্তি কমেছে রেকর্ড ১২.৯৩ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যেখানে ৩.৪৪ বিলিয়ন ডলারের মধ্যবর্তী পণ্যের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছিল, এবার তা কমে হয়েছে ৩ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে দেশের প্রধান উৎপাদন খাতের মূল ভিত্তি ‘শিল্পের কাঁচামাল’ আমদানির এলসি নিষ্পত্তি পূর্ববর্তী অর্থবছরের ১৮.১২ বিলিয়ন ডলার থেকে ২.৬৭ শতাংশ কমে ১৭.১৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। কাঁচামাল আমদানির এই নেতিবাচক সূচক দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খাতের শ্লথগতির কথাই জানান দিচ্ছে।
ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি : বাংলাদেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পের কাঁচামাল বা এক্সেসরিজ আমদানির জন্য ব্যবহৃত ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি পরিস্থিতিরও বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলার হার আগের বছরের ৮.৬১ বিলিয়ন ডলার থেকে ৭.৯৩ শতাংশ কমে ৭.৯৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে এই খাতের এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ ৭.৩৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১০.৯৫ শতাংশ কম। বৈশ্বিক বাজারে পোশাকের চাহিদা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নানা সংকটে রফতানি আদেশ কমে যাওয়ার কারণেই মূলত এই পতন ঘটেছে।
ভোক্তাপণ্য ও জ্বালানি তেল আমদানির চিত্র : রিপোর্টে দেখা যায়, সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় ‘ভোক্তা পণ্য’ (কনজ্যুমার গুডস) আমদানির এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ ২.৭৫ শতাংশ কমে ৪.৮৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর ছিল ৫.০২ বিলিয়ন ডলার। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, দেশে যখন তীব্র জ্বালানি সংকট চলছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রাথমিক জ্বালানির অভাব দেখা যাচ্ছে, তখন পেট্রোলিয়াম বা জ্বালানি তেল আমদানির এলসি নিষ্পত্তি আগের বছরের ৭.৪৬ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৬.৩৪ শতাংশ কমে চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে ৬.২৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। তবে এই খাতে নতুন এলসি খোলার পরিমাণ সামান্য (৪.৫১ শতাংশ) বৃদ্ধি পেয়ে ৬.৫০ বিলিয়ন ডলার হয়েছে।
রেমিট্যান্সে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি, স্থিতিশীল বিনিময় হার : আমদানি ও শিল্প খাতের এই অন্ধকার চিত্রের ঠিক বিপরীত মেরুতে রয়েছে দেশের রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) প্রবাসীরা রেকর্ড ৩২.৭৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ২৭.৫১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ রেমিট্যান্সে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৫.৩৪ শতাংশ। মে ২০২৬-এর একক মাসেই রেমিট্যান্স এসেছে ৩.৪৩ বিলিয়ন ডলার।
রেমিট্যান্সের এই ধারাবাহিক উল্লম্ফনের কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ অনেকটাই কমেছে। মে ২০২৬ শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ২৬.৬২ বিলিয়ন ডলারে (বিপিএম-৬ অনুযায়ী ২১.৪২ বিলিয়ন ডলার)। একই সঙ্গে আন্তঃব্যাংক টাকা-ডলার বিনিময় হার ১২২.৭৫ টাকা থেকে ১২২.৮১ টাকার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীল রয়েছে। ফলস্বরূপ ব্যাংকগুলোর কাছে এলসি সেটেল বা নিষ্পত্তি করার মতো প্রয়োজনীয় ডলারের জোগান এখন যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে, যা বিগত দুই বছরের তীব্র সংকটের তুলনায় অনেক স্বস্তিদায়ক।
পর্যাপ্ত ডলার থাকতেও কমেছে এলসি : বাজারে পর্যাপ্ত ডলার থাকার পরও দেশের আমদানি ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে চলছে বন্ধ্যাত্ব। এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, দেশের প্রধান প্রধান ব্যবসায়ী চেম্বারের সভাপতি এবং খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদেও কাছ থেকে উঠে এসেছে একাধিক কারণ।
বিনিয়োগে দুশ্চিন্তা, উচ্চ সুদহার ও ব্যাংক খাতের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য : বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং এলসি কমে যাওয়ার বিষয়ে দেশের অন্যতম শীর্ষ বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিনিয়োগ চাঙ্গা না হওয়ায় উৎপাদনমুখী পণ্য ও মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি খোলা হচ্ছে না। মূলত বিনিয়োগ নিয়ে ব্যবসায়ীদের যে দুশ্চিন্তা তা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কেটে গেছে- এটা সত্য, কিন্ত ‘ কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস’ (ব্যবসা পরিচালনার খরচ), ‘কস্ট অব ক্যাপিটাল’ (মূলধনের খরচ বা ঋণের সুদহার) এগুলোতে কোনো চাঙ্গাভাব বা ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। চড়া সুদে ঋণ নিয়ে নতুন কোনো কারখানা করা লাভজনক হচ্ছে না। পাশাপাশি দেশের ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতাও এর জন্য দায়ী বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।
তিনি বলেন, এর সঙ্গে ব্যাংকিং সেক্টরের স্বাস্থেরও একটা গভীর যোগসূত্র থাকতে পারে। খেলাপি ঋণের কারণে অনেক ব্যাংকেরই ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে গেছে। এখন যেহেতু নতুন বাজেট পেশ হয়েছে, রাজস্ব খাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার রিফাইন্যান্স স্কিম করছে- এগুলো হয়তো অর্থনীতিকে কিছুটা চাঙ্গা করবে, তবে তার ফল দেখতে একটু সময় নিতে পারে। তবে আগামী এক-দেড় বছরে ব্যাংক খাতের এই দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান হবে না। এ ক্ষেত্রে আমার পরামর্শ হলো, উদ্যোক্তাদের মূলধন বৃদ্ধির আরেকটি বড় জায়গা হতে পারে শেয়ার মার্কেট। যদি শেয়ার মার্কেটকে চাঙ্গা করা যায়, তা হলে ব্যাংকিং সেক্টরের বাইরে এসে উদ্যোক্তারা সেখান থেকে ইকুইটি বা মূলধন বৃদ্ধির সুযোগ নিতে পারবেন, যা ব্যাংক খাতের ওপর চাপ কমাবে।
নতুন প্রজেক্ট বন্ধ, সবাই ‘ভালো সময়ের’ অপেক্ষায় : দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান বর্তমান মাঠপর্যায়ের রূঢ় বাস্তবতার তথ্য তুলে ধরেছেন।
সামগ্রিক ব্যবসার পরিস্থিতি ভালো নয়- অকপটে স্বীকার করে তিনি বলেন, দেশের ভেতরের ব্যবসার পরিস্থিতি এই মুহূর্তে ভালো না। হয়তো সবাই ভালো সময়ের অপেক্ষা করছে। যেহেতু সম্প্রতি বাজেট পেশ হয়েছে, ব্যবসায়ীরা চাচ্ছেন বাজেটটা আগে পুরোপুরি পাস হোক, এর বিভিন্ন কর ও নীতিগত বিষয়গুলো চূড়ান্ত হোক; এরপর পরিস্থিতি দেখে তারা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন। বর্তমানে দেশে নতুন করে কোনো বড় ইন্ডাস্ট্রি বা প্রজেক্ট চালু হচ্ছে না। এখন এলসি বাবদ যতটুকু লেনদেন বা ডেটা দেখা যাচ্ছে, সেটা মূলত যাদের ইতিমধ্যে মূলধনী ব্যয় বা প্রজেক্টের কাজ অর্ধেকের বেশি হয়ে গেছে, তারা সেটা সম্পূর্ণ করতেই বাধ্য হয়ে এলসি খুলছেন। নতুন কোনো উদ্যোগের জন্য এলসি হচ্ছে না। বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর ঋণ না দেওয়ার অনীহার কথাও উল্লেখ করেন এই ব্যবসায়ী।
তিনি বলেন, দেশীয় ব্যাংকিং খাতের তারল্য পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যাংকগুলোও এখন বেসরকারি খাতে অর্থ বা বড় ঋণ প্রদান করতে চাইছে না। খেলাপি ঋণের আশঙ্কায় ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতের নতুন বিনিয়োগকে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছে। ফলে ঋণ না পাওয়ায় অনেকে এলসি খুলতে পারছেন না।
ব্যাংক খাতে দেউলিয়া পরিস্থিতি, বিনিয়োগ অসম্ভব : ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ এই মন্দার জন্য দেশের ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা এবং জ্বালানি সংকটকে সবচেয়ে বেশি দায়ী করেছেন।
ডলার থাকা সত্ত্বেও এলসি না হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অত্যন্ত কড়া এবং স্পষ্টভাষায় তিনি বলেন, পর্যাপ্ত ডলার থাকার পরও এলসি খোলা বা নিষ্পত্তি হচ্ছে না-এই কথাটি আপাতদৃষ্টিতে অদ্ভুত শোনালেও এটাই বাস্তব। কারণ বাজারে যখন নতুন পণ্যের চাহিদা কমে যাবে, ব্যবসায়ীরা তখন উৎপাদন কমিয়ে দেবে এবং কাঁচামাল আমদানি কম হবে। ফলে আমদানি কম হলে দেশের রিজার্ভ বা ডলার ব্যাংকে জমা থাকবে- এটাই স্বাভাবিক।
তিনি বলেন, নতুন নির্বাচিত সরকার অর্থনীতি সংস্কারে অনেক চেষ্টা করছে, কিন্তু আমাদের এখনও অনেক বড় বড় কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ব্যবসা বাড়বে না।
এ সময় ব্যাংকিং সেক্টরের চরম অস্থিরতার চিত্র তুলে ধরে ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, আমাদের ব্যাংকিং সেক্টরে এখনো তীব্র অস্থিরতা রয়ে গেছে। সত্যি কথা বলতে, বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশি ব্যাংক এখন টেকনিক্যালি দেউলিয়া হয়ে গেছে! এই ভঙ্গুর ব্যাংক খাতের ওপর ভরসা করে, এত উচ্চ সুদহার মাথায় নিয়ে এবং জ্বালানি সংকটের মধ্যে কোনো সুস্থ নতুন ব্যবসা বা বিনিয়োগ আসবে না। আমরা যারা এখনো অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছি, তারা প্রতিদিন নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী হচ্ছি। এই সংকট থেকে বের হতে হলে সরকারকে প্রথমে ব্যাংক খাতকে স্ট্যাবল বা স্থিতিশীল করতে হবে এবং এনার্জি সমস্যার সমাধান করতে হবে। এ জন্য সরকারকে অন্তত এক থেকে দেড় বছর সময় দিতে হবে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ‘অন্তরালে’ বড় ব্যবসায়ীরা : ডলার পর্যাপ্ত থাকার পরও এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি কম হওয়ার এই বৈপরীত্য নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক তথ্য সামনে এনেছেন।
তিনি বলেন, আমদানি কমার পেছনে বৈশ্বিক অস্থিরতা যেমন আছে, তেমনই আমাদের দেশের ভেতরের কিছু বড় অভ্যন্তরীণ বিষয়ও জড়িয়ে আছে। গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের অনেক বড় বড় শিল্পগ্রুপের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা অন্তরালে চলে গেছেন। আইনি বা রাজনৈতিক কারণে তাদের অনেকেরই কারখানা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বর্তমানে বন্ধ বা স্থবির হয়ে আছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিগত এক-দেড় দশক ধরে দেশের সিংহভাগ বড় বড় আমদানি ও শিল্প উৎপাদন মূলত তারাই নিয়ন্ত্রণ করেছেন এবং তারাই বড় বড় এলসি খুলেছেন। এখন সেই মূল ধারার ব্যবসায়ীরাই যদি দৃশ্যপটে না থাকেন বা অন্তরালে থাকেন, তবে এলসি কারা খুলবে? নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হতে বা অন্যদের সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে স্বাভাবিকভাবেই সময় লাগবে। এ কারণেই মূলত এলসি খোলার হার কমে গেছে।
এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে অর্থনীতি ও ব্যবসাকে সচল রাখতে বিভিন্ন ধরনের বড় বড় রিফাইন্যান্স (পুনঃঅর্থায়ন) স্কিম করছি। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা রাষ্ট্র নীতি সহায়তা দিতে পারলেও, কাউকে জোর করে এলসি খুলতে বাধ্য করতে পারে না। এলসি খোলা সম্পূর্ণ নির্ভর করে বাজারের চাহিদা এবং উদ্যোক্তাদের সদিচ্ছার ওপর। এ ক্ষেত্রে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি হলো- দেশে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ ও পণ্যের কাঁচামাল আমাদানির প্রয়োজনীয়তা এবং পরিবেশ তৈরি করা।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও সরকারের ব্যাংক নির্ভরতা : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনের অন্য কয়েকটি সূচকেও ব্যবসায়ী নেতাদের আশঙ্কার সত্যতা নিশ্চিত করে। যেমন দেশের মানুষ এখন ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতার কারণে জাতীয় সঞ্চয়পত্র কেনার চেয়ে আগের জমানো সঞ্চয়পত্র ভাঙছে বেশি। প্রতিবেদনে চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ঋণাত্মক হয়েছে ২৬৮৯.৮৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকার এই খাত থেকে কোনো ঋণ পাচ্ছে না, উল্টো আগের গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে। এর ফলে সরকারের বাজেট ঘাটতি মেটাতে সম্পূর্ণভাবে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এপ্রিল ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ নেওয়ার বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০.৩৭ শতাংশ। ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়াকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করায় (যা এমসিসিআই সভাপতিও উল্লেখ করেছেন) তাদের সিংহভাগ টাকা সরকারের ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করছে। ফলস্বরূপ বেসরকারি খাতে ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি কমে মাত্র ৪.৭৫ শতাংশে নেমে এসেছে। একে অর্থনীতির ভাষায় ‘ক্রাউডিং-আউট ইফেক্ট’ বলা হয়, যা বেসরকারি খাতের এলসি খোলার সক্ষমতাকে আরও সংকুচিত করে দিচ্ছে।
সমস্যা উত্তরণে ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা এবং জ্বালানি সমস্যার সমাধান : বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন এবং বিশিষ্টজনদের মন্তব্য থেকে এটি পরিষ্কার যে, রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে ডলারের রিজার্ভ সাময়িকভাবে বাড়লেও, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানিতে এই ধস দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের জন্য এক বড় বিপদের সংকেত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি যেখানে কমে ৩.৪৯শতাংশে নেমেছিল, সেখানে চলতি অর্থবছরে প্রাক্কলিত ৪.১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে শিল্পের চাকা ঘোরানো আবশ্যক।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এলসি পরিস্থিতি পুনরুদ্ধার করতে হলে কেবল ডলারের জোগান নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। সরকারকে অবিলম্বে দেউলিয়া বা দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করে পুরো ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চলে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে বন্ধ বা থমকে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলোকে পুনরায় সচল করার জন্য একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের মনে আস্থার পরিবেশ ফিরলে তবেই ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত ডলার এলসির মাধ্যমে আমদানিতে রূপান্তরিত হবে এবং দেশের অর্থনীতি প্রকৃত অর্থে গতিশীল হবে।
সময়ের আলো/আআ