আফ্রিকার ১৮ উটপাখি সাভারে সাবাড়

রফিকুল ইসলাম সবুজ

জাতীয়

দেশীয় পোলট্রি প্রজাতির উন্নয়ন, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং খামারিদের কাছে প্রযুক্তি হস্তান্তরের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নিয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ‘পোলট্রি গবেষণা ও

2026-06-25T01:12:11+00:00
2026-06-25T01:58:52+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬,
১১ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
জাতীয়
আফ্রিকার ১৮ উটপাখি সাভারে সাবাড়
রফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬, ১:১২ এএম  আপডেট: ২৫.০৬.২০২৬ ১:৫৮ এএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো
দেশীয় পোলট্রি প্রজাতির উন্নয়ন, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং খামারিদের কাছে প্রযুক্তি হস্তান্তরের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নিয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ‘পোলট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ প্রকল্প’ হাতে নিয়েছিল বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)। 

প্রকল্পের অন্যতম আকর্ষণ ছিল গরু ও খাসির বিকল্প মাংসের উৎস খুঁজে বের করতে আফ্রিকা থেকে উটপাখি এনে বাংলাদেশের আবহাওয়ায় খাপ খাওয়ানো এবং ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক খামার সম্প্রসারণের পথ তৈরি করা। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে গবেষণার নামে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও দেশীয় পরিবেশে উটপাখি পালন উপযোগী কোনো নতুন জাত বা প্রযুক্তি উদ্ভাবনের দৃশ্যমান ফল পাওয়া যায়নি। 
উটপাখির বাণিজ্যিক উৎপাদন মডেল উদ্ভাবনের তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। বরং গবেষণার জন্য আনা প্রাণীগুলোর ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ এবং হিসাব-নিকাশ নিয়েই দেখা দিয়েছে গুরুতর প্রশ্ন। সাভারে গবেষণার জন্য আনা ২২টি উটপাখির মধ্যে বর্তমানে মাত্র চারটি জীবিত রয়েছে। বাকি উটপাখিগুলোর অধিকাংশই জবাই করা হয়েছে। ১৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পের মেয়াদ আগামী ৩০ জুন শেষ হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। 

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিএলআরআই ২০২০ সালে প্রথম দফায় সাতটি এবং পরে আরও ১৫টি অপ্রাপ্তবয়স্ক উটপাখি আফ্রিকা থেকে আমদানি করে। সে সময় প্রকল্প পরিচালক ড. মো. সাজেদুল করিম সরকার সাংবাদিকদের বলেছিলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া উটপাখি পালনের জন্য উপযোগী এবং ভবিষ্যতে এটি দেশের মাংস উৎপাদনে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। একটি পূর্ণবয়স্ক উটপাখির ওজন ১০০ থেকে ১৫০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। একটি উটপাখি বছরে ২০ থেকে ২৫টি ডিম দেয় এবং একটি পাখি তিনটি দেশীয় গরুর সমপরিমাণ মাংস সরবরাহে সক্ষম। ২০২৩ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে উটপাখির মাংস বাজারজাতের সম্ভাবনার কথাও বলেছিলেন।

বিএলআরআই কর্তৃপক্ষ তখন আশা প্রকাশ করেছিল যে গবেষণা শেষে দেশের খামারিদের মধ্যে উটপাখি বিতরণ করা হবে এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে। কিন্তু বাস্তবে দেশের কোথাও এখনও উটপাখির বাণিজ্যিক খামার বা বাজারজাতকরণের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।

কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বর্তমানে গবেষণা শেডে মাত্র চারটি উটপাখি রয়েছে বলে জানা গেছে। উটপাখিগুলোর কোনো কার্যকর গবেষণা ফল পাওয়া যায়নি এবং প্রকল্প থেকে দেশীয় পরিবেশে পালন উপযোগী কোনো নতুন প্রযুক্তিও উদ্ভাবিত হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, গবেষণার জন্য আনা ১৮টি উটপাখি শেষ পর্যন্ত জবাই করা হয়েছে। শুধু উটপাখিই নয়, ২০২৩ সালে গবেষণাধীন ৩৮টি মোরগও জবাই করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রাণিসম্পদ খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি নতুন প্রজাতির অভিযোজন ও প্রজনন গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত জনসংখ্যা সংরক্ষণ অপরিহার্য। গবেষণার প্রায় সব প্রাণী জবাই করায় দীর্ঘমেয়াদি জিনগত উন্নয়ন বা জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্য অর্জন কতটা সম্ভব হয়েছে, সে প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।

উটপাখির পাশাপাশি প্রকল্পের আওতায় টার্কি, তিতির, কোয়েল ও আঁচিল মুরগি সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের কার্যক্রমও শুরু হয়েছিল। কিন্তু এসব পোলট্রির তথ্য-উপাত্ত নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেছে, অধিকাংশ টার্কি ও আঁচিল মুরগি প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন ও ফাইল নোট ছাড়াই জবাই করা হয়েছে। এমনকি তাদের মাংস বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। গবেষণার প্রাণী ব্যবস্থাপনায় কোনো স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয়নি।

প্রকল্পের আরেকটি বিতর্কিত অধ্যায় সৈয়দপুর আঞ্চলিক কেন্দ্রকে ঘিরে। প্রধান কার্যালয় থেকে ১ হাজার ২০০টি কোয়েল পাখি সৈয়দপুর কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছিল। পরে এসব কোয়েল মারা গেলেও মৃত্যুর তথ্য যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা হয়নি এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও অবহিত করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী ১ হাজার ২০০টি কোয়েলের মৃত্যুর তথ্য গোপন রেখেই পরে আরও ১ হাজার কোয়েল একই কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক (সাময়িক দায়িত্ব) ড. শাকিলা ফারুক সময়ের আলোকে বলেন, উটপাখি মূলত আমাদের দেশের পাখি নয়। আমরা এটিকে আমাদের দেশে এনে এর সংরক্ষণের পাশাপাশি কিছু গবেষণার কার্যক্রম পরিচালনা করেছি।

গবেষণার অগ্রগতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে উটপাখির অ্যাডাপ্টেশন (পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া), প্রোডাক্টিভ এবং রিপ্রোডাক্টিভ পারফরম্যান্স দেখা হয়েছে। এ ছাড়া পাখিটি কী ধরনের খাবার খায় এবং খাবারের মধ্যে প্রোটিন পারসেন্টেজ কতটুকু থাকলে ভালো হয়, সেই ডাটাগুলোও সংগ্রহ করা হয়েছে। এই গবেষণার ওপর ভিত্তি করে ইতিমধ্যে একজন পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। তিনি বলেন, উটপাখির ওজন অনেক বেশি হওয়ায় এটি যদি আমাদের দেশে সফলভাবে পালন করা যায়, তবে আমরা প্রচুর পরিমাণে মাংস পাব। তবে এটি ভিনদেশি পাখি হওয়ায় এর পেছনে অনেক সময় লেগে যায়।

গবেষণার জন্য আনা ২২টি পাখির মধ্যে ১৮টি কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, পাখির মাংসের কোয়ালিটি বা গুণমান পরীক্ষা করার জন্য কিছু পাখি জবাই করা হয়েছিল।

এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্যের জন্য তিনি প্রকল্প পরিচালক ড. মো. সাজেদুল করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। তবে প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

সময়ের আলো/আআ



  বিষয়:   আফ্রিকা  উটপাখি  সাভার  সাবাড় 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: