প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফর ঘিরে দুই দেশের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছে। মালয়েশিয়ায় জ্বালানি ও খনিজ খাতে বিনিয়োগ, শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণ এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। মালয়েশিয়া সফর শেষে চীনের দালিয়ানে ‘সামার ডাভোস’ সম্মেলনে অংশ নিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেইজিংয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ও বিনিয়োগ আকর্ষণসহ রাশিয়ার সাথে লেনদেনের বিষয়ে চীনের ব্যাংকিং সহায়তা নিয়ে আলোচনার পরিকল্পনা করেছেন। এই সফরগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে।
বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে মালয়েশিয়ার কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ বাংলাদেশের : মালয়েশিয়ার কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা। এর মধ্যে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, কয়লা ও চুনাপাথরসহ অনাবিষ্কৃত খনিজসম্পদ উত্তোলন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বৈঠক শেষে দুই পক্ষের সম্মতিতে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতি থেকে এসব তথ্য জানা যায়।
যৌথ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, উভয় পক্ষ আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। মালয়েশিয়া বাংলাদেশের কর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত প্রস্তাবকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ ছাড়া দুই দেশ যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউজি) গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপদ ও পারস্পরিক লাভজনক অভিবাসন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা যায়। বৈঠকে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) মূল্যায়ন এবং বর্তমান প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন ও হালনাগাদ এমওইউ প্রণয়নের বিষয়ে কাজ শুরুর সিদ্ধান্তও হয়।
যৌথ বিবরণীতে রাজনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, হালাল শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, এআই ও সেমিকন্ডাক্টর, শ্রম সহযোগিতা, শিক্ষা ও পর্যটন, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতাসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন ক্ষেত্র নিয়ে মোট ৩৩টি দফা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দৈনিক সময়ের আলোর পাঠকদের জন্য সেগুলো হুবহু তুলে ধরা হলো
১. মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ২২ জুন মালয়েশিয়ায় সরকারি সফরে যান।
২. এই সফরটি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের (১৭ ফেব্রুয়ারি) পর প্রথম বিদেশ সফর এবং মালয়েশিয়ায় তার প্রথম সফর। ১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর থেকে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্ব গড়ে উঠেছে, যা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অভিন্ন মূল্যবোধ এবং আঞ্চলিক শান্তি ও সমৃদ্ধির আকাক্সক্ষার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।
৩. সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পুত্রাজায়ার পেরদানা পুত্রা কমপ্লেক্সে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানো হয়। এরপর দুই দেশের নেতারা দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হয়ে মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ সম্পর্কের অগ্রগতি, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষ দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। পরবর্তীতে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী তার সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন এবং দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর প্রত্যক্ষ করা হয়।
৪. মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের নিয়োগের জন্য অভিনন্দন জানান এবং বলেন, এটি বাংলাদেশের জনগণের জন্য শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
রাজনৈতিক সহযোগিতা
৫. নেতৃবৃন্দ একমত হন যে, উচ্চ পর্যায়ের সফরসহ নিয়মিত সংলাপ ও বিনিময় দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রকে শক্তিশালী করেছে, যার মধ্যে শ্রম সহযোগিতাও রয়েছে। তারা দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংযোগ অব্যাহত রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
৬. নেতৃবৃন্দ বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে নিয়মিত সংলাপের গুরুত্ব স্বীকার করেন এবং এ প্রসঙ্গে দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন জয়েন্ট কমিশন মিটিং (জেসিএম) এবং বাইল্যাটারাল কনসালটেশন (বিসি) যত শিগগির সম্ভব পুনরায় শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা :
৭. উভয় নেতা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কের গুরুত্ব স্বীকার করেন এবং উল্লেখ করেন যে, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। নেতৃবৃন্দ দ্বিমুখী বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজ করতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
৮. নেতৃবৃন্দ মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এমবিএফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরুর অগ্রগতিকে স্বাগত জানান। উভয় পক্ষ ২০২৭ সালের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেন, যাতে বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্যিক অনুশীলনকে প্রতিফলিত করে একটি পারস্পরিক লাভজনক, বিস্তৃত ও ভবিষ্যৎমুখী চুক্তি হয়।
৯. দুই প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ জয়েন্ট বিজনেস কাউন্সিল (জেবিসি) প্রতিষ্ঠার অগ্রগতিকে স্বাগত জানান। এটি দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে কাঠামোবদ্ধ সংলাপ ও ধারণা বিনিময়ের মূল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে কাজ করবে এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক সম্প্রসারণ করবে।
১০. বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও টেকসই অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বৃদ্ধির গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে নেতৃবৃন্দ টেলিযোগাযোগ, জ্বালানি, অবকাঠামো (যেমন সড়ক, সেতু, উড়াল এক্সপ্রেসওয়ে ও ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার), বন্দর ও লজিস্টিকস, হালাল শিল্প, কৃষি-প্রক্রিয়াকরণ, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিংসহ অন্যান্য উচ্চমূল্যের শিল্পে অগ্রাধিকারমূলক সেক্টরে বৃহত্তর সহযোগিতার আহ্বান জানান।
১১. নেতৃবৃন্দ দুই দেশের সরকারি সংস্থা, বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা, শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে বিনিয়োগ সহজীকরণ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রতিভা উন্নয়ন, ব্যবসায়িক মিলনমেলা ও কৌশলগত অংশীদারত্বের মাধ্যমে নিবিড় সহযোগিতাকে উৎসাহিত করেন, যাতে শিল্প উন্নয়ন, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে অংশগ্রহণ শক্তিশালী হয় এবং উভয় দেশের জন্য পারস্পরিক লাভজনক বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
হালাল শিল্প
১২. নেতৃবৃন্দ বৈশ্বিক ইসলামি অর্থনীতির ব্যাপক বাণিজ্যিক সম্ভাবনা স্বীকার করেন। মালয়েশিয়ার হালাল ইকোসিস্টেম উন্নয়নে বিশেষজ্ঞতা ও বিস্তৃত অভিজ্ঞতাকে স্বীকৃতি দিয়ে তারা বাংলাদেশের হালাল খাতের উন্নয়নে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেন।
১৩. তারা হালাল ইকোসিস্টেম ক্ষেত্রে সহযোগিতাবিষয়ক নোট বিনিময়কে স্বীকৃতি দেন এবং মালয়েশিয়ার ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্ট (জাকিম) ও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের মধ্যে চলমান সহযোগিতাকে স্বাগত জানান। হালাল সার্টিফিকেশন, নিয়ন্ত্রণ কাঠামো উন্নয়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও উদ্ভাবন এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
ডিজিটাল অর্থনীতি, এআই ও সেমিকন্ডাক্টর
১৪. উভয় নেতা ডিজিটাল রূপান্তরকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতার চালিকাশক্তি হিসেবে স্বীকার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল অর্থনীতি, ফিনটেক, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, সাইবার নিরাপত্তা এবং অন্যান্য উদীয়মান প্রযুক্তিতে সহযোগিতা জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেন। এ প্রসঙ্গে দুই দেশের সরকারি সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি খাতের অংশীজনদের মধ্যে সহযোগিতা ও নিবিড় যোগাযোগকে স্বাগত জানান। নেতৃবৃন্দ ডিজিটাল উন্নয়নে মালয়েশিয়ার বিশেষজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সক্ষমতা বৃদ্ধি ও জ্ঞান বিনিময়কে উৎসাহিত করেন এবং বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে (ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার, টেকনোলজি পার্ক ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ) মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ বৃদ্ধির আহ্বান জানান।
১৫. মালয়েশিয়ার সেমিকন্ডাক্টর প্যাকেজিং, টেস্টিং এবং ওএসএটি সেবায় বৈশ্বিক অবস্থানকে স্বীকৃতি দিয়ে নেতৃবৃন্দ এই পরিপক্ব ইকোসিস্টেমকে বাংলাদেশের দ্রুত সম্প্রসারিত আইটি ও ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের সঙ্গে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। বাংলাদেশ একটি দ্বিপক্ষীয় ট্যালেন্ট সহযোগিতা কাঠামোর প্রস্তাব করে, যার মাধ্যমে উভয় দেশ যৌথভাবে বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েটদের স্ট্রাকচার্ড প্রোগ্রামের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি করবে। এই সহযোগিতা সাপ্লাই চেইনের স্থিতিস্থাপকতা ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে আঞ্চলিক সহযোগিতায় অবদান রাখবে।
শ্রম সহযোগিতা
১৬. নেতৃবৃন্দ জনগণের মধ্যে সংযোগের গুরুত্ব স্বীকার করেন এবং মালয়েশিয়ার উন্নয়নে বাংলাদেশি কর্মীদের অবদানকে স্বাগত জানান। তারা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশি প্রবাসী সম্প্রদায় দুই দেশের মধ্যে বিনিময় ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করে।
১৭. মালয়েশিয়া বাংলাদেশের কর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত প্রস্তাবকে স্বীকৃতি দেয়। মালয়েশিয়ার বর্তমান বিদেশি শ্রম নীতি অনুসারে, নতুন বিদেশি কর্মী কোটা অনুমোদন কেস-বাই-কেস ভিত্তিতে যাচাইকৃত নিয়োগকর্তার চাহিদা ও সেক্টরাল সিলিংয়ের ওপর নির্ভর করে। অনুমোদিত কোটার ক্ষেত্রে উভয় দেশ স্বচ্ছ, ন্যায্য, বৈষম্যহীন ও প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে, যেখানে শুধু বিশ্বস্ত ও যোগ্য নিয়োগ সংস্থা ব্যবহার করা হবে।
১৮. উভয় দেশ জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউজি) আহ্বানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে যাতে বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপদ ও পারস্পরিক লাভজনক অভিবাসন অব্যাহত থাকে। এই বৈঠকে বিদ্যমান এমওইউ মূল্যায়ন এবং বর্তমান প্রয়োজন অনুসারে নতুন আপডেটেড এমওইউ প্রণয়নের কাজ শুরু হবে।
শিক্ষা ও পর্যটন সহযোগিতা
১৯. মালয়েশিয়ায় প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর উপস্থিতি এবং তাদের একাডেমিক বিনিময়, সামাজিক-অর্থনৈতিক যোগসূত্র ও দেশে ফিরে অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে উভয় নেতা শিক্ষাক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেন, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়-টু-বিশ্ববিদ্যালয় অংশীদারত্ব ও যৌথ গবেষণা প্রোগ্রামের মাধ্যমে টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল এডুকেশনের (টিভিইটি) ওপর জোর দিয়ে।
২০. উভয় পক্ষ পারস্পরিক স্বীকৃত যোগ্যতা, যৌথ ডিগ্রি প্রোগ্রাম ও নমনীয় শিক্ষাপথ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। নেতৃবৃন্দ শ্রমবাজারের চাহিদা ও উভয় দেশের অগ্রাধিকার খাতের সঙ্গে শিক্ষা প্রোগ্রাম সামঞ্জস্যপূর্ণ করা, বিশেষ করে গ্র্যাজুয়েট মোবিলিটি ও দক্ষতা উন্নয়নের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
২১. উভয় নেতা ‘ভিজিট মালয়েশিয়া ২০২৬’ (ভিএম২০২৬) ও ‘মালয়েশিয়া ইয়ার অব মেডিকেল ট্যুরিজম ২০২৬’ (এমওয়াইএমটি২০২৬) ক্যাম্পেইনের আলোকে পর্যটন সহযোগিতা সম্প্রসারণে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। মালয়েশিয়া বাংলাদেশি পর্যটকদের স্বাগত জানায় এবং নেতৃবৃন্দ দুই দেশের মধ্যে পর্যটন প্রচার ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেন।
জ্বালানি সহযোগিতা
২২. উভয় পক্ষ জ্বালানি খাতে সহযোগিতা জোরদারকে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের মূল স্তম্ভ হিসেবে স্বীকার করে এলএনজি সরবরাহ, এলএনজি অবকাঠামো, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও এর অবকাঠামো বিষয়ক সমঝোতা স্মারকের পূর্ণ সদ্ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরেন যাতে পেট্রোনাস ও পেট্রোবাংলার মধ্যে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয়।
২৩. বাংলাদেশ পক্ষ মালয়েশিয়ার কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানায়, যার মধ্যে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, কয়লা, চুনাপাথরসহ অনাবিষ্কৃত খনিজসম্পদ উত্তোলন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর রয়েছে। উভয় পক্ষ জাতীয় জ্বালানি কোম্পানি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সহযোগিতাকে উৎসাহিত করে যাতে দীর্ঘমেয়াদি পারস্পরিক লাভজনক অংশীদারত্ব গড়ে ওঠে।
প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা
২৪. নেতৃবৃন্দ প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় বিদ্যমান চমৎকার দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের প্রশংসা করেন, যা উচ্চ পর্যায়ের সামরিক সফর, কর্মী প্রশিক্ষণ এবং নৌবাহিনীর সৌহার্দপূর্ণ পোর্ট কলের ওপর ভিত্তি করে। উভয় নেতা প্রতিরক্ষা সহযোগিতাবিষয়ক এমওইউ পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করে সামরিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও প্রতিরক্ষা শিল্প অংশীদারত্ব বিস্তৃত করার অঙ্গীকার করেন। তারা বাইল্যাটারাল জয়েন্ট কমিটি অন ডিফেন্স কো-অপারেশন (জেসিডিসি) আহ্বানের মাধ্যমে কাঠামোবদ্ধ প্রতিরক্ষা রোডম্যাপ প্রণয়নের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
২৫. উভয় নেতা জাতীয় প্রতিরক্ষা কলেজ ও কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজে পারস্পরিক সিট বরাদ্দসহ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির গুরুত্ব তুলে ধরেন। তারা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা অভিযানে যৌথ কৌশলগত অনুশীলন, প্রি-ডেপ্লয়মেন্ট প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন।
২৬. উভয় নেতা সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ ও সর্বোত্তম অনুশীলন বিনিময়ের মাধ্যমে সহযোগিতা জোরদার করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা
২৭. উভয় নেতা দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। মালয়েশিয়া রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানে বাংলাদেশের মানবিক প্রচেষ্টার প্রশংসা করে এবং সংহতি জানায়। মালয়েশিয়া মিয়ানমারে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের প্রচেষ্টায় সমর্থন অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করে। বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
২৮. প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আসিয়ান সেক্টোরাল ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক যুক্ত হওয়ার আকাক্সক্ষা পুনর্ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এই আগ্রহকে স্বাগত জানিয়ে আসিয়ান কাঠামোর মধ্যে বাংলাদেশকে সহায়তা করার প্রস্তুতি প্রকাশ করেন।
২৯. মালয়েশিয়া বাংলাদেশের আরসিপিইপিতে (আঞ্চলিক ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব) যোগদানের আকাক্সক্ষাকে সমর্থন করে। উভয় নেতা মনে করেন যে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক একীকরণকে শক্তিশালী করবে।
৩০. নেতৃবৃন্দ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন এবং ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য ন্যায়সংগত ও স্থায়ী শান্তির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
৩১. নেতৃবৃন্দ জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা, মানব পাচার ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধসহ ঐতিহ্যগত ও অপ্রচলিত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যৌথ প্রচেষ্টার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
৩২. তারা জাতিসংঘ ও ওআইসির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থায় সমন্বিত পদক্ষেপের গুরুত্ব স্বীকার করেন এবং বিশ্বব্যবস্থা, ন্যায়বিচার ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার উদ্যোগকে সমর্থন করার অঙ্গীকার করেন।
৩৩. প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও মালয়েশিয়া সরকারকে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আতিথেয়তার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
চীন সফরে যা করবেন তারেক রহমান : ২২ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত পাঁচ দিনের চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ‘সামার ডাভোস’ সম্মেলনে অংশ নেবেন। ২৩ জুন তিনি বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যালোইস জুইংগির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন এবং বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সুযোগ পাবেন। একই দিন ডালিয়ান আন্তর্জাতিক কনফারেন্স সেন্টারে ‘পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু নেতৃত্ব’ শীর্ষক অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়া কথা রয়েছে তার।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে অংশগ্রহণ : ২৩ জুন সকালে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও সিইও অ্যালোইস জুইংগির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের সম্ভাবনা রয়েছে। একই দিনে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সুযোগও রাখা হয়েছে।
বিকালে ডালিয়ান আন্তর্জাতিক কনফারেন্স সেন্টারে ‘পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু নেতৃত’ শীর্ষক অধিবেশনে বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। ‘ফিশ বোল’ ফরম্যাটের এ আলোচনায় প্রথম বক্তা হিসেবে অংশ নিতে পারেন তিনি। পরে চীনের স্টেট কাউন্সিলের প্রিমিয়ারের আয়োজিত স্বাগত সংবর্ধনায় যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।
সামার ডাভোসে বাংলাদেশ : ২৪ জুন ‘নিউ চ্যাম্পিয়ন্স’-এর ১৭তম বার্ষিক সভা বা ‘সামার ডাভোস’-এ অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পাশাপাশি চীনের রেলওয়ে, সড়ক, সেতু নির্মাণ ও যন্ত্র প্রকৌশল খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম ও বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ : ২৫ জুন বেইজিংয়ে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। প্রায় ১০০ বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়িক প্রতিনিধির উপস্থিতিতে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরা হবে। একই দিন চীনের বিভিন্ন শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তার বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে চেরি গ্রুপ, হান্ডা গ্রুপ এবং চায়নাটেক্স করপোরেশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
চীনের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক, হতে পারে ১০ এমওইউ : ২৫ জুন বিকালে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের স্টেট কাউন্সিলের প্রিমিয়ার লি চিয়াংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকের পর উভয় দেশের মধ্যে প্রায় ১০টি সমঝোতা স্মারক সই ও বিনিময়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর চীনা প্রধানমন্ত্রীর আয়োজিত রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় অংশ নেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে। আগামী ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক : ২৬ জুন সকালে ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে সাক্ষাতের পর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। এ বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন কৌশলগত বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যৌথ বিবৃতি বা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময়ের বিষয়টিও চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
এদিন তিনি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জাদুঘর পরিদর্শন করবেন। পরে বিকালে বেইজিং ড্যাক্সিং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়ে রাতেই দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
সফরসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির বাইরে সময় ও সুযোগসাপেক্ষে দালিয়ানের ভেনিস ওয়াটার সিটি, ডংগাং মিউজিক ফাউন্টেন স্কয়ার অথবা বেইজিংয়ের গ্রেট ওয়াল, ফরবিডেন সিটি ও টেম্পল অব হেভেনসহ কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শনের সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এসব কর্মসূচি সোমবার বিকাল পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি।