দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল নির্মাণের স্বপ্ন বাস্তবায়নে একের পর এক জটিলতায় আটকে আছে ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-১। প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ ৯ নম্বর কন্ট্রাক্ট প্যাকেজে চুক্তি সম্পাদন নিয়ে বড় ধরনের জট তৈরি হয়েছে। এই প্যাকেজে সর্বনিম্ন দরদাতা দরপত্রের বৈধতার মেয়াদ বাড়াতে রাজি হয়নি।
অন্যদিকে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতার দর সর্বনিম্ন দরদাতার চেয়ে প্রায় ৭১ শতাংশ বেশি হওয়ায় তাকে কাজ দেওয়া হলে প্রকল্প ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় দরপত্র বাতিল করে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের পরিবর্তে দরদাতার সঙ্গে নেগোসিয়েশনের উদ্যোগ নিয়েছে ডিএমটিসিএল।
বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১৯ দশমিক ৮৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাতাল রুটে ১২টি স্টেশনের পাশাপাশি পূর্বাচল রুটে আরও ১১ দশমিক ৩৬৯ কিলোমিটার উড়ালপথ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্মাণকাজ শুরু হলেও তিন বছরেরও বেশি সময়ে বড় অংশের মূল নির্মাণকাজ এখনও দরপত্র ও চুক্তি প্রক্রিয়ার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। অন্যদিকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজে দরপত্র মূল্যায়ন, জাইকার সম্মতি, প্রি-কন্ট্রাক্ট নেগোসিয়েশন কিংবা পুনঃদরপত্রের সিদ্ধান্ত নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা চলছে। ফলে দেশের প্রথম ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেলের নির্মাণ শুরুর পরও মূল সুড়ঙ্গ ও স্টেশন নির্মাণের গতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) সর্বশেষ অভ্যন্তরীণ অগ্রগতি প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, গত ৩০ জুন পর্যন্ত ১২টি প্যাকেজের মধ্যে শুধু ডিপোর ভূমি উন্নয়ন কাজ শেষ হয়েছে। কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ ৯-এর আওতায় ডিপো ও মূল মেট্রোরেল লাইনের ট্র্যাক নির্মাণের কাজ করার কথা।
২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর প্যাকেজটির আহ্বান করা দরপত্র পরের বছরের ৬ মার্চ খোলা হয়। কারিগরি মূল্যায়ন শেষে জাইকার সম্মতি পাওয়ার পর ২০২৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আর্থিক প্রস্তাব খোলা হয়। দরপত্রের আর্থিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন জাইকার সম্মতির জন্য ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর পাঠানো হয়। জাইকার পর্যবেক্ষণের পর ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি জবাব পাঠানোর পরে আবার জাইকার পর্যবেক্ষণ পাওয়ায় ৯ ফেব্রুয়ারি পুনরায় জবাব পাঠানো হয়।
এভাবে দরপত্র মূল্যায়ন ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় কয়েক দফা সময় পার হয়। এর মধ্যেই দেখা দেয় নতুন সংকট। দরপত্রের বৈধতার মেয়াদ প্রথমে ২০২৬ সালের ১ মার্চ পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। পরে সেটি ১৫ জুন পর্যন্ত বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে দুই দরদাতার মধ্যে একজন মেয়াদ বাড়াতে সম্মতি দিলেও সর্বনিম্ন দরদাতা মেয়াদ বাড়াতে অসম্মতি জানায়।
এ নিয়ে ২৩ ফেব্রুয়ারি ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে নথি উপস্থাপন করা হলে বিষয়টি পুনঃপর্যালোচনার জন্য তা ফেরত দেওয়া হয়। পরে ১১ মার্চ বিড ইভাল্যুয়েশন কমিটির সভায় বিষয়টি আলোচনা করে সিদ্ধান্ত ২৯ মার্চ জাইকাকে জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়।
দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতার দর সর্বনিম্ন দরদাতার চেয়ে প্রায় ৭১ শতাংশ বেশি। তাই সর্বনিম্ন দরদাতা আগের দরপত্রের মেয়াদ বাড়াতে রাজি না হওয়ায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে দিয়ে কাজ করাতে গেলে প্রকল্পের ব্যয় এক ধাক্কায় বড় অঙ্কে বেড়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ডিএমটিসিএল সরাসরি দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেওয়ার পথে যাচ্ছে না।
ডিএমটিসিএলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মন্ত্রিসভা কমিটি ও ডিএমটিসিএলের পরিচালনা পর্ষদের নির্দেশনা অনুযায়ী দরদাতার সঙ্গে নেগোসিয়েশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ দরপত্রের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া ও প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা চলছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এই প্যাকেজে দরপত্র আহ্বানের পর থেকে চুক্তি সম্পাদনের পর্যায়ে পৌঁছাতে প্রায় দেড় বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে দরপত্র আহ্বান করা হলেও ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্যাকেজটির চুক্তি সম্পাদনের বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়নি।
এর মধ্যে কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন, জাইকার একাধিক পর্যবেক্ষণ এবং দরপত্রের মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। দরপত্র প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণেই কি এখন সর্বনিম্ন দরদাতাকে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে প্রশ্ন উঠছে। কারণ দরপত্র খোলা ও মূল্যায়নের সময়ের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের সময়ের ব্যবধান বাড়লে নির্মাণসামগ্রীর মূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং ঠিকাদারের অন্যান্য ব্যয় পরিবর্তিত হতে পারে।
একাধিক সূত্র জানায়, সর্বনিম্ন দরদাতা শেষ পর্যন্ত চুক্তিতে না এলে এবং দ্বিতীয় দরদাতার সঙ্গে সমঝোতা সম্ভব না হলে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করতে হতে পারে। এতে সময় আরও বাড়ার পাশাপাশি নতুন দর আগের তুলনায় কতটা বাড়বে, সেটিও অনিশ্চিত।
তবে ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা আপাতত সরাসরি নতুন দরপত্রে যেতে চান না। বিদ্যমান দরদাতার সঙ্গে নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে।
এর আগে কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ-৫ নিয়েও একই ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এ প্যাকেজে নর্দ্দা থেকে নতুন বাজার হয়ে বিমানবন্দরমুখী অংশের গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণকাজের সর্বনিম্ন দরদাতা দরপত্রের বৈধতার মেয়াদ বাড়াতে রাজি না হওয়ায় প্যাকেজটি পুনঃদরপত্রের পথে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
ডিএমটিসিএলের অগ্রগতি প্রতিবেদনে এ বিষয়ে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব পরবর্তী বোর্ড সভায় উপস্থাপনের কথা বলা হয়েছে। জানা গেছে, জাপানের কাজিমা করপোরেশন দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় আগের দর অনুযায়ী কাজ করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েও প্রতিযোগিতা থেকে সরে গেছে। কোম্পানিটির প্রস্তাবিত দর ছিল প্রায় ৫,০৫৫ কোটি টাকা।
অন্যদিকে কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ-২-এ চুক্তি সম্পাদনের প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে এগিয়েছে। জাইকা ২০২৫ সালের মে মাসে প্রি-কন্ট্রাক্ট নেগোসিয়েশন ও খসড়া চুক্তিতে সম্মতি দেওয়ার পর গত ১৭ জুন সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য প্রস্তাবটি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে পাঠানো হয়। দীর্ঘ প্রস্তুতির পর এখন এ প্যাকেজ সরকারি অনুমোদনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপে রয়েছে।
তবে কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ-৩-এ আবার উল্টো চিত্র। দরপত্র আহ্বানের পর কোনো প্রি-কোয়ালিফায়েড দরদাতা দরপত্র জমা না দেওয়ায় পুনঃদরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুনঃদরপত্রের খসড়া জাইকার সম্মতির জন্য গত ৯ মার্চ পাঠানো হয়। এ ছাড়া কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ-৪-এ সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে প্রি-কন্ট্রাক্ট নেগোসিয়েশন চলছে।
কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ-৬-এও নেগোসিয়েশন শেষ করে খসড়া চুক্তির বিষয়ে গত ৪ জুন জাইকার সম্মতির জন্য পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে অগ্রগতি থাকলেও এসব প্যাকেজে এখনও কার্যাদেশ পর্যায়ে পৌঁছানো যায়নি বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ-৭ ও কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ-৮-এও দরপত্র মূল্যায়ন ও জাইকার সম্মতিনির্ভর প্রক্রিয়া চলমান। আর কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ-১১-এর দরপত্র খোলার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ১২ অক্টোবর। এ ছাড়া কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ-১২-এর দরপত্র ইতিমধ্যে খোলা হলেও মূল্যায়ন চলছে।
শুধু এমআরটি লাইন-১ নয়, একই ধরনের দরপত্র ও ব্যয়-সংক্রান্ত সংকটে পড়েছে এমআরটি লাইন-৫-এর নর্দার্ন রুটও। এ কারণে সরকার ও ডিএমটিসিএল এখন মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর ক্রয়প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৫-এর কয়েকটি প্যাকেজে দরপত্রের দর মূল অনুমোদিত প্রকল্প ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি এসেছিল।
অন্যদিকে এমআরটি লাইন-১-এর প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় যত গড়াচ্ছে, ততই ব্যয় পুনর্মূল্যায়নের চাপ বাড়ছে। পুরোনো দরপত্রের দর ধরে চুক্তি করা যাচ্ছে না; আবার নতুন করে দরপত্র আহ্বান করলে সময় আরও বাড়বে। ফলে সরকারকে এখন দুটি কঠিন সিদ্ধান্তের মধ্যে ভারসাম্য করতে হচ্ছে একদিকে দ্রুত কাজ শুরু করা, অন্যদিকে অস্বাভাবিক বেশি দরে সরকারি অর্থ ব্যয় না করা।
ডিএমটিসিএলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পের মূল সুড়ঙ্গ, স্টেশন, ট্র্যাক, সিগন্যালিং ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের বড় অংশ এখনও চুক্তি ও দরপত্র প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রস্তুতি শেষ হলেও বাস্তব নির্মাণে কাক্সিক্ষত গতি আসছে না। দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্পে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে সাত হাজার ৩৫০ কোটি টাকা, যা বিগত অর্থবছরের তুলনায় ৯ গুণ। বিগত অর্থবছরে সংশোধিত বরাদ্দ ছিল মাত্র ৮০১ কোটি টাকা।
ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাওগাতুল আলম জানিয়েছেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী মেট্রোরেলের প্রকল্পগুলোর কাজ এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছেন তারা। ইতিমধ্যে প্রকল্পের ডিপো ভূমি উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক কাজও অনেক দূর এগিয়েছে। প্রকল্পের স্টাডি, সার্ভে, বেসিক ডিজাইন, ডিটেইলড ডিজাইন এবং পিতলগঞ্জ ডিপোর ভূমি অধিগ্রহণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। চলতি অর্থবছর এমআরটি লাইন-১-এর অবশিষ্ট আটটি আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনের জায়গার পরিষেবা স্থানান্তর, বিমানবন্দর সড়ক ও প্রগতি সরণি অংশে আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশন তৈরি এবং পূর্বাচল রুটে ভায়াডাক্টের পাইলিং কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে