জ্বালানির দামের চাপ আমদানি-রফতানিতে

সাইফুদ্দিন তুহিন, চট্টগ্রাম

জাতীয়

ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধির জেরে বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে। প্রাইভেট আইসিডিতে কনটেইনার হ্যান্ডেলে বাড়তি চার্জ আরোপের নোটিস দেওয়া

2026-09-26T02:17:05+00:00
2026-09-26T02:17:05+00:00
 
  শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১১ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
পোশাক শিল্পে উৎকণ্ঠা
জ্বালানির দামের চাপ আমদানি-রফতানিতে
সাইফুদ্দিন তুহিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:১৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধির জেরে বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে। প্রাইভেট আইসিডিতে কনটেইনার হ্যান্ডেলে বাড়তি চার্জ আরোপের নোটিস দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরে কনটেইনার হ্যান্ডেলে বেশি চার্জ আরোপের দাবি করেছেন বার্থ অপারেটররা। লাইটার জাহাজ মালিক সমিতিও পরিবহন ভাড়া বেশি নেওয়ার চাপ দিচ্ছে ব্যবসায়ীদের। পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির দাবি তুলেছেন ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, প্রাইম মুভার, লরি মালিকরাও। একযোগে ব্যয় বৃদ্ধির চাপে অস্থির হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, ব্যয় বৃদ্ধির কারণে টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডেল, জাহাজে পণ্য ওঠানামায় ব্যবহার করা হয় ডিজেলচালিত ভারী যন্ত্রপাতি। বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থের পাশাপাশি অন্য টার্মিনালেও এসব ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে আছে কি-গ্যান্ট্রি ক্রেন, রাবার-টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন, স্ট্র্যাডাল ক্যারিয়ার, মোবাইল হারবার ক্রেন, রিচ স্ট্যাকার, ফর্কলিফট, টপ হ্যান্ডলার, প্রাইম মুভার। 

আবার বন্দর থেকে আইসিডিতে কনটেইনার পরিবহন, আইসিডি থেকে বন্দরে পরিবহন হয় ডিজেলচালিত ট্রাক কাভার্ড ভ্যান, লরিতে। আমদানি-রফতানি পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহনেও ব্যবহার হয় ডিজেল চালিত যানবাহন। চট্টগ্রাম বন্দর বহির্নোঙরে পণ্যবাহী বড় জাহাজ থেকে আমদানি পণ্য খালাস করা হয় ডিজেলচালিত ছোট লাইটার জাহাজ করে। 

পণ্য লাইটার করা ও লাইটার করা পণ্য বিভিন্ন গন্তব্যে ছোট জাহাজে পরিবহনেও প্রয়োজন ডিজেলের। শুধু প্রাইভেট আইসিডিতে কনটেইনার হ্যান্ডেলে প্রতিদিন ৭০ হাজার থেকে ৭২ হাজার লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। লাইটার জাহাজ চলাচলেও দৈনিক অন্তত কয়েক হাজার লিটার ডিজেল ব্যবহার করা হয়। পণ্য পরিবহন ও পণ্য হ্যান্ডেলে যুক্ত সেবা প্রদানকারী সব পক্ষ বাড়তি ব্যয় আদায় করে আমদানি-রফতানিকারকদের কাছ থেকে। বার্থ অপারেটররা বন্দর থেকে জ্বলানি খাতের বাড়তি ব্যয় আদায় করবে। 

জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির পর দিনই তৎপর হয়ে উঠে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে সেবা প্রদানকারী সব সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান। দাম বাড়ায় চট্টগ্রাম বন্দরের বার্থ অপারেটিং কার্যক্রমে ব্যয় বাড়ার দাবি করেছেন বার্থ অপারেটররা। তাদের মতে, এতে তৈরি হয়েছে আর্থিক সংকট। এ জন্য বর্ধিত জ্বালানি তেলের মূল্যের সঙ্গে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের চুক্তি দর সমন্বয় করা জরুরি। 

দর সমন্বয়ের দাবিতে ইতিমধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়েছে বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনের পক্ষ থেকে গেল ২১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর দেওয়া একটি চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে চুক্তিতে উল্লেখিত দর সমন্বয়ের দাবি জানানো হয়েছে। চিঠিতে স্বাক্ষর করেন সংগঠনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী। তবে বন্দরের পক্ষ থেকে এখনও সাড়া মেলেনি।

এ ব্যাপারে সংগঠনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে হ্যান্ডলিং চার্জ খাতে ব্যয় বেড়েছে। এ অবস্থায় বন্দরের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব। তাই দ্রুত চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়ে যৌক্তিক হারে চুক্তি দর সমন্বয় করতে হবে। 

অফডকে ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ চার্জ বৃদ্ধি : চট্টগ্রাম বন্দরে জট কমানো এবং নানা সমস্যা এড়াতে শতভাগ আমদানি পণ্য প্রাইভেট আইসিডিতে হ্যান্ডলিং করা হয়। রফতানি কনটেইনারও শতভাগ প্রাইভেট আইসিডিতে হ্যান্ডলিং করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর এলাকার আশপাশে গড়ে উঠেছে ২১টি প্রাইভেট আইসিডি। 

এসব আইসিডিতে হ্যান্ডেল কাজে ব্যবহার করা হয় রিচ স্ট্যাকার, ফর্কলিফট থেকে নানা ধরনের ভারী ক্রেন। যন্ত্রপাতিগুলো ব্যবহার করা হয় ডিজেলে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর প্রাইভেট আইসিডিতে সেবার চার্জ ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। 

ডিপো মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোটস অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা) ইতিমধ্যে বাড়তি চার্জের নোটিস জারি করেছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা কিংবা সমঝোতা ছাড়াই বাড়তি চার্জ আদায় শুরু হয়েছে। ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা হওয়ায় ২১ সেপ্টেম্বর থেকেই চার্জ বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে বিকডা।
 
২১ সেপ্টেম্বর জারি করা এক সার্কুলারে বিকডা জানায়, ডিজেলের দাম ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ায় বেসরকারি অফডকগুলোর বিভিন্ন কার্যক্রমে জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সর্বশেষ পর্যালোচিত হারের ওপর ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ হারে জ্বালানি সারচার্জ যুক্ত করা হবে। নতুন এই হার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে।

এ ব্যাপারে বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, প্রাইভেট আইসিডিতে কনটেইনার হ্যান্ডেল হয় ডিজেল নির্ভর যন্ত্রপাতির মাধ্যমে। প্রতিদিন গড়ে ৭০ হাজার থেকে ৭২ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয় আইসিডিতে। বিপুল ডিজেলের ব্যয় বহন করে আইসিডি মালিকরা। ডিজেলের দাম বাড়লে সেবা গ্রহণকারীদের কাছ থেকেই তা আদায় করতে হবে। তাই বির্ধত চার্জ আদায় শুরু করা হয়েছে। আমাদের বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই। 

বাড়ছে লাইটার জাহাজ পরিবহন ভাড়া : চট্টগ্রাম বন্দর বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে আমদানি পণ্য লাইটার করা বা খালাস করা হয়। এসব জাহাজ লাইটার জাহাজ নামে পরিচিত। ছোট জাহাজে ভর্তি করা আমদানি পণ্যের একটি অংশ চট্টগ্রাম নগরীর বাংলাবাজার এলাকায় ১৬ ঘাটে খালাস করা হয়। আবার বিপুল পণ্য নিয়ে যাওয়া হয় দেশের বিভিন্ন নৌবন্দরের উদ্দেশে। এসব জাহাজে পরিবহন ভাড়া বাবদ অর্থ আদায় করা হয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। 

লাইটার জাহাজের সবই চলে ডিজেলে। দৈনিক গড় হিসাবে ১৫০টি লাইটার জাহাজ চলাচল করে। ডিজেলের দাম বাড়লে লাইটার জাহাজ পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে লাইটার জাহাজ মালিকরাও পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির দাবি তুলেছে।

এ ব্যাপারে লাইটার জাহাজ পরিচালনাকারী সংগঠন ডব্লিওটিসির মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ বলেন, দৈনিক দেড় শতাধিক লাইটার জাহাজ বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে যুক্ত থাকে। খালাস করা পণ্য ঘাটে নিয়ে আসা থেকে দেশের বিভিন্ন নৌবন্দরে পরিবহন করা হয় লাইটার জাহাজে করে। লাইটার জাহাজগুলো ডিজেলনির্ভর। ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন ভাড়াও বেড়ে গেছে। এই বর্ধিত ভাড়া ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেই তা আদায় করতে হবে।

বেড়েছে ট্রাক কাভার্ড ভ্যান লরি ভাড়া : ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে আমদানি-রফতানি পণ্য পরিবহন সেক্টরেও। ইতিমধ্যে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, লরি, প্রাইম মুভার মালিকরা বাড়তি ভাড়া আদায়ের তোড়জোড় শুরু করেছেন। অনেকে বাড়তি ভাড়া আদায়ও শুরু করেছেন।

বাংলাদেশ কাভার্ড ভ্যান-ট্রাক-প্রাইম মুভার পণ্য পরিবহন মালিক অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানান, কনটেইনার বা আমদানি-রফতানি পণ্য পরিবহনে যুক্ত ট্রাক কাভার্ড ভ্যান প্রাইম মুভার লরি ডিজেলনির্ভর। তাই ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে এসব পরিবহনে বাড়তি ভাড়া নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। চট্টগ্রাম-ঢাকা পথে আগে প্রতি যাত্রায় ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা ভাড়ায় প্রাইম মুভার চালানো হতো। এখন প্রতি ট্রিপের জন্য অন্তত চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা বেশি দিতে হবে। অন্তত আসা যাওয়ার ট্রিপ প্রতি ২৬ হাজার টাকার কমে কনটেইনার বা মালামাল পরিবহন করা যাবে না। ড্রাইভার ও হেলপারের বেতন হিসাব করলে আগের চেয়ে ব্যয় বেড়ে প্রতি ট্রিপে ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকায় পৌঁছে গেছে।

পোশাক শিল্প মালিকরা উদ্বিগ্ন : জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির জেরে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে তৈরি পোশাক শিল্পে। রফতানিকারকরা বলছেন, বর্তমানে পোশাক শিল্প কঠিন সময় পার করছে। এ অবস্থায় ডিজেলের দাম বৃদ্ধি মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে। মূল্য বৃদ্ধির জেরে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এতে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হবে। তাতে বিদেশি বায়ারদের অর্ডার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক ও পোশাক রফতানিকারক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, নানা কারণে পোশাকশিল্প সংকটময় সময় পার করছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক পোশাক কারখানা জেনারেটর নির্ভর হয়ে গেছে। এতে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। অনেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে। আবার অনেকের কারখানা বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এখন ডিজেলের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে পোশাক শিল্পে ব্যয় আরও বেড়েছে। বলতে গেলে রফতানি খাত ঝুঁকিতে পড়েছে। 

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও
  বিষয়:   জ্বালানির দাম  আমদানি  রফতানি  পোশাক শিল্প  উৎকণ্ঠা 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: