মাদকমুক্তির লড়াইয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছাই বড় শক্তি

সময়ের আলো ডেস্ক

জাতীয়

জীবনকে অনিরাপদ ও অসুস্থ করার জন্য যতগুলো হাতিয়ার আছে, তার মধ্যে মাদক সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক। এইসব অপহাতিয়ার থেকে নাগরিক জীবনকে

2026-06-23T18:23:38+00:00
2026-06-23T18:23:38+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
জাতীয়
মাদকমুক্তির লড়াইয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছাই বড় শক্তি
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬, ৬:২৩ পিএম 
বাংলাদেশে মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ছবি : প্রতীকী
জীবনকে অনিরাপদ ও অসুস্থ করার জন্য যতগুলো হাতিয়ার আছে, তার মধ্যে মাদক সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক। এইসব অপহাতিয়ার থেকে নাগরিক জীবনকে নিরাপদ ও সুস্থ রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিপন্ন হয়েছেন অনেক রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান। আবার অনেকেই এই দায়িত্ব পালন করে হয়েছেন পুরস্কৃত। রাষ্ট্র ও নাগরিক জীবনকে করেছেন গৌরবান্বিত। 

এমনভাবে পুরস্কৃত হওয়া একজন রাষ্ট্র নায়ক আধুনিক সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ। তিনি মাদককে একসময় ‘সব অপরাধের জননী’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল, মাদকের বিস্তার রোধ করা গেলে একটি দেশকে নিরাপদ ও অপরাধমুক্ত সমাজে রূপান্তর করা সম্ভব। সেই বিশ্বাস থেকেই ১৯৭৩ সালে সিঙ্গাপুরে প্রণয়ন করা হয় ‘মিসইউজ অব ড্রাগস অ্যাক্ট’। এতে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি মাদক রাখা কিংবা পাচারের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধানসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়। তিনি আন্তর্জাতিক সমালোচনা উপেক্ষা করেও মাদক নির্মূলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অটল ছিলেন। তার সেই অবদানে সিঙ্গাপুর আজ বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ ও মাদকমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

শুধু সিঙ্গাপুর নয়, বিশ্বের বহু দেশ মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন ও শাস্তির পথ বেছে নিয়েছে। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতারসহ বিভিন্ন দেশে মাদক পাচারের জন্য মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হয়। মাদক সেবন বা সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড এবং অন্যান্য কঠোর শাস্তি।


মাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় যুদ্ধের অন্যতম উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন মাদককে ‘পাবলিক এনিমি নম্বর ওয়ান’ ঘোষণা করে যে অভিযান শুরু করেছিলেন, তা ইতিহাসে ‘ওয়ার অন ড্রাগস’ নামে পরিচিত। অন্যদিকে, ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের বিতর্কিত মাদকবিরোধী অভিযান আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত হলেও দেশটির একটি বড় অংশের জনগণ এখনও মনে করে, তার পদক্ষেপে মাদকের বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছিল।

বাংলাদেশে মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন থাকলেও এর কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চললেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদক কারবারিদের নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকের বিস্তার কেবল জনস্বাস্থ্য নয়, সামাজিক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে তরুণ ও কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর একটি অংশ মাদকের সংস্পর্শে আসছে। এর ফলে পরিবার, সমাজ এবং অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি, নারী নির্যাতন, কিশোর গ্যাংসহ নানা অপরাধের সঙ্গে মাদকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। মাদক ব্যবসাকে ঘিরে গড়ে ওঠে অস্ত্র, চোরাচালান ও মানবপাচারের মতো অপরাধচক্রও।


বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মাদকবিরোধী অভিযান জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন। সেই নির্দেশনার আলোকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশব্যাপী অভিযান পরিচালনা করছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দেশে ৩০ হাজার ৭৪৪টি মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৯ হাজার ২৫১টি মামলা দায়ের এবং ৯ হাজার ৬৮৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ছাড়া, শীর্ষ মাদক কারবারিদের তালিকা প্রস্তুতের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, শতাধিক গডফাদার এবং কয়েক হাজার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে অতীতে এমন তালিকা প্রস্তুত হলেও তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি বলে সমালোচনা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন নতুন প্রজন্মের সিনথেটিক বা কৃত্রিম মাদক। প্রচলিত ইয়াবা, হেরোইন কিংবা গাঁজার পাশাপাশি দেশে ছড়িয়ে পড়ছে এমডিএমএ, এলএসডি, আইস, ফেন্টানাইল, কেটামিন, ম্যাজিক মাশরুম, কুশসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক।


আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেছেন, এসব মাদক দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। নতুন এসব মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে পরিবার কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পর্যাপ্তভাবে অবগত নয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশে মাদক নিয়ন্ত্রণের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিচারিক প্রক্রিয়ার দুর্বলতা। মাদক মামলার অনেকগুলোই শেষ পর্যন্ত টেকে না। সাক্ষীর অভাব, দীর্ঘসূত্রতা এবং বিভিন্ন আইনি জটিলতায় অনেক আসামি জামিনে বেরিয়ে আসে।

অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবের কারণে অনেক মাদক কারবারি আইনের আওতার বাইরে থেকে যায়। অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় মাদক ব্যবসায়ীদের অবস্থান নেওয়ার ঘটনাও আলোচিত হয়েছে। ফলে অভিযান পরিচালিত হলেও সিন্ডিকেট ভাঙা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধও। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।


বিশ্লেষকদের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণ কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষার প্রশ্ন। যে দেশগুলো মাদকের বিরুদ্ধে সফল হয়েছে, তারা কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে।

বাংলাদেশেও মাদকবিরোধী অভিযান চলছে। তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বড় মাদক সিন্ডিকেট ও গডফাদারদের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায় তার ওপর। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ, বিচারিক কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক সচেতনতা জোরদার করা গেলে মাদক নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান অগ্রগতি সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

বর্তমান সরকার মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন। এই ঘোষণা কার্যকরের সেই সুযোগ এবং জনসমর্থন তাদের আছে। তারা যদি সেই চ্যালেঞ্জ নেয়, তবে মাদক নির্মূল মোটেও অসম্ভব নয়।

সময়ের আলো/মহু


  বিষয়:   মাদক  নির্মূল  অভিযান  সরকার  স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: