সন্ধ্যা নামলেই বাড়তে থাকে বখাটেদের আড্ডা, আর রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটি পরিণত হয় মাদকের অভয়ারণ্যে। এমন উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে নোয়াখালী পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের নোয়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকের টাকার জোগান দিতে বিদ্যালয়ের ফ্যান, লাইট, চেয়ার-টেবিল পর্যন্ত বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির নামকরণ করা হয় জেলার নাম অনুসারে। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়ালেও বর্তমানে নানা সংকটে জর্জরিত। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও বাড়েনি অবকাঠামোগত সুবিধা। জরাজীর্ণ ভবনে গাদাগাদি করে চলছে পাঠদান।
সরেজমিন নোয়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের টিনশেড ভবনের বেশ কয়েকটি কক্ষে নেই জানালা-দরজা। অনেক কক্ষে ফ্যান ও লাইট নেই। এমনকি বৈদ্যুতিক সংযোগের তারও কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ভবনের সিলিংয়ের কিছু অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে, যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।
এছাড়া অনেক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের বসার মতো পর্যাপ্ত চেয়ার-টেবিল নেই। ফলে চরম দুর্ভোগের মধ্যেই চলছে শিক্ষা কার্যক্রম।
স্থানীয়রা জানান, সন্ধ্যার পর বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বখাটে ও মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। তারা সেখানে আড্ডা দেয়, মাদক সেবন করে এবং বিদ্যালয়ের আসবাবপত্র নষ্ট করে। কয়েক দফায় বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সামগ্রী চুরির ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নতুন ভবন নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা না হলে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়বে।
এ বিষয়ে নোয়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলে, গরমের সময় আমাদের খুবই কষ্ট হয়। শ্রেণিকক্ষে ফ্যান নেই, ঠিকমতো বসার বেঞ্চও নেই। অনেক সময় জায়গা না থাকায় দাঁড়িয়ে ক্লাস করতে হয়। এতে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা গোলাম হোসেন বলেন, বিদ্যালয়টি আমাদের এলাকার একটি পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বহু শিক্ষার্থী এখান থেকে পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে বিদ্যালয়ের অবস্থা খুবই খারাপ। সন্তানদের নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশে পড়াতে পারছি না, যা অভিভাবকদের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।
বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী শাকিল আহমেদ বলেন, এই স্কুলে আমার বাবা-মা শিক্ষকতা করেছেন। আমরা তিন ভাই-বোনও এখানেই পড়াশোনা করেছি। যে প্রতিষ্ঠান থেকে আমাদের শিক্ষা জীবনের শুরু, সেই স্কুলের এমন দুরবস্থা দেখে খুব কষ্ট লাগে। দ্রুত ভবন সংস্কার, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সরবরাহ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
সমস্যার বিষয়ে নোয়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামীমা আফরোজ সময়ের আলোকে বলেন, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার অবহিত করেছি। ভবন সংস্কার, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সরবরাহ, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানিয়েছি। আশা করছি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানার জন্য নোয়াখালী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ইশরাত নাসিমা হাবীবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়গুলো অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। এ ক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সামনে কোনো প্রকল্প এলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সময়ের আলো/জেডি