একটি রাজকীয় বিয়ের সব প্রস্তুতিই সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু চার হাত এক হওয়ার আগেই এক মর্মান্তিক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হলো হবু বরকে। মহারাষ্ট্রের এক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর তরুণ ছেলের মৃত্যুর ঘটনাটি প্রথমে স্রেফ দুর্ঘটনা মনে হলেও, পুলিশের তদন্তে এখন তা এক লোমহর্ষক খুনের রূপ নিয়েছে। লোহাগড় দুর্গে ছবি তোলার সময় পা পিছলে নয়, বরং হবু স্ত্রী এবং তার প্রেমিক মিলে তাকে পাহাড়ের গভীর খাদে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে ভারতের পুনের কাছে ঐতিহাসিক লোহাগড় দুর্গে। নিহত তরুণ কেতন আগরওয়াল, মহারাষ্ট্রের পিম্পরি-চিঞ্চওয়াড়ের বিশিষ্ট আবাসন ব্যবসায়ী (কনস্ট্রাকশন ব্যবসায়ী) বিশাল আগরওয়ালের ছেলে। এই ঘটনায় তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তারাও স্তব্ধ। এক পুলিশ কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মানুষ এতটা নির্মম ও নিষ্ঠুর কীভাবে হতে পারে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
গত ১৮ জুন ছিল কেতন আগরওয়ালের হবু স্ত্রী সিয়া গোয়েলের জন্মদিন। দিনটি উদযাপন করতে এবং হবু স্ত্রীর আবদার মেটাতে কেতন তাকে নিয়ে লোহাগড় দুর্গে ট্র্যাকিংয়ে গিয়েছিলেন। আগামী নভেম্বরেই তাদের বিয়ের তারিখ চূড়ান্ত ছিল।
ঘটনাস্থলে কেতনের মৃত্যুর পর প্রথমে সিয়া পুলিশকে জানায়, ছবি তোলার জন্য পোজ দেওয়ার সময় অসাবধানতাবশত পা পিছলে কেতন গভীর খাদে পড়ে যান। পরে প্রায় তিন ঘণ্টার এক দীর্ঘ উদ্ধার অভিযান চালিয়ে কেতনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু লোনাভালা রুরাল পুলিশ ঘটনাটিকে সাধারণ দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নেয়নি। কেতনের পরিবারের সন্দেহ এবং পারিপার্শ্বিক তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হলে বেরিয়ে আসে আসল সত্য। সিয়ার মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, ডিজিটাল ডেটা এবং ঘটনাস্থলে থাকা অন্যান্যদের জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে পুলিশের মনে তীব্র সন্দেহের দানা বাঁধে। এরপরই পুলিশ সিয়া এবং তার প্রেমিক চেতন চৌধুরীকে আটক করে জেরা শুরু করে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আগামী নভেম্বর মাসে রাজস্থানের উদয়পুরে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে কেতন ও সিয়ার বিয়ের আয়োজন করা হয়েছিল। জয়পুরের একটি বিলাসবহুল রাজপ্রাসাদ (প্যালেস) বুক করা হয়েছিল প্রায় ১৭ কোটি রুপি খরচ করে। শুধু তাই নয়, আমন্ত্রিত অতিথিদের আনা-নেওয়ার জন্য দুটি চার্টার্ড বিমানের (প্রাইভেট প্লেন) ব্যবস্থাও করেছিল পরিবার। দুই পরিবারেই যখন বিয়ের আনন্দ আর প্রস্তুতি তুঙ্গে, ঠিক তখনই এই বজ্রপাত।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা তাদের অপরাধ স্বীকার করেছে। এসএসপি সন্দীপ সিং গিল জানান, সিয়া গোয়েল মূলত এই বিয়েতে রাজি ছিলেন না। তিনি চেতন চৌধুরী নামের এক যুবকের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িত ছিলেন, যার সাথে তিনি আগে একসাথে চাকরি করতেন। কেতনকে চিরতরে পথ থেকে সরিয়ে দিতেই সিয়া তার জন্মদিনের দিনটিকে বেছে নেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী কেতনকে দুর্গে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সুযোগ বুঝে প্রেমিকের সহায়তায় তাকে পাহাড়ের গভীর খাদে ধাক্কা দিয়ে ফেলে নিশ্চিত মৃত্যু ডেকে আনা হয়।
তদন্তে জানা গেছে, ঘটনার সময় প্রেমিক চেতনও গোপনে সেই দুর্গে উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ বর্তমানে এই দুই আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। এই হত্যাকাণ্ডে আর কেউ সাহায্য করেছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। স্বপ্নের মতো এক বিয়ের আয়োজন যে এমন এক নৃশংস অপরাধের মাধ্যমে রক্তে রঞ্জিত হবে, তা এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না দুই পরিবার।
সময়ের আলো/কহু