চীন সফরে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মালয়েশিয়ায় ১৮ ঘণ্টার সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী ২১ সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে গতকাল চীনের দালিয়ানে পৌঁছান। সেখানে চীন সরকারের পক্ষ থেকে তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা ও সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের মাধ্যমে বরণ করে নেওয়া হয়।
দালিয়ান থেকে বুধবার দুপুরে হাইস্পিড ট্রেনে বেইজিং যাবেন। প্রধানমন্ত্রীর মূল চীন সফর শুরু হবে তখন। বেইজিং সফরে চীনের সঙ্গে ১৫ থেকে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সইয়ের সম্ভাবনা আছে।
এ ছাড়া সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনার মধ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা থাকবে আলোচনার একটি বড় অংশজুড়ে। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রেসিডেন্ট ও সিইও আলোইস জভিংগি। বুধবার সকালে ১৭তম বার্ষিক ‘সামার দাভোসের’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
সাক্ষাৎকালে আলোইস জভিংগি সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের মতো অন্যান্য ডেল্টা রাষ্ট্র এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর সহযোগিতায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামকে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ আগামী পাঁচ বছরে ২৫০ মিলিয়ন বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল পুনঃখননের মাধ্যমে পানির প্রবাহ পুনরুদ্ধার, বন্যার ঝুঁকি হ্রাস এবং পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
আলোইস জভিংগি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অভিজ্ঞতা ও উদ্যোগ বৈশ্বিক পরিসরে কাজে লাগানোর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
মাহদী আমিন : প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, বিশ্বদরবারে দেশের মর্যাদা, সম্মান ও দৃঢ় অবস্থান নিশ্চিত করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মালয়েশিয়া সফর শেষে চীনের দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সম্মেলনে তার সরব উপস্থিতি ও বিশ্বনেতাদের সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়া দেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। মঙ্গলবার চীনের দালিয়ানে প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
তিনি জানান, মালয়েশিয়ার সফল সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী ২১ সদস্যের সংক্ষিপ্ত প্রতিনিধি দল নিয়ে চীনের দালিয়ানে পৌঁছান। সেখানে চীন সরকারের পক্ষ থেকে তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা ও সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের মাধ্যমে বরণ করে নেওয়া হয়। মাহদী আমিন বলেন, ডব্লিউইএফ আয়োজিত সামার দাভোসে (২০২৬) অংশগ্রহণ করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সরকারপ্রধান হিসেবে দেশের বাইরে এটিই তার প্রথম কোনো বৈশ্বিক সম্মেলনে যোগদান। এ সম্মেলনে অংশগ্রহণের মূল লক্ষ্য- দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ‘বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত’- এই বার্তার মাধ্যমে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আস্থাশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা।
ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, সন্ধ্যায় ডব্লিউইএফের ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন অ্যা শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’ সেশনে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন-পুনঃখনন, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ২০ শতাংশে উন্নীত করার নির্বাচনি অঙ্গীকার তুলে ধরেন। পাশাপাশি ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’-এর কার্যকর বাস্তবায়ন এবং পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়নের আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে মাহদী আমিন বলেন, জলবায়ু কার্যক্রম কোনো ব্যয় নয়; এটি আমাদের সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অপরিহার্য বিনিয়োগ।
এ ছাড়া এদিন সন্ধ্যায় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে নৈশভোজে সস্ত্রীক অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে দক্ষিণ কোরিয়া, মঙ্গোলিয়া, গিনি, মন্টিনিগ্রো এবং কাজাখস্তানের সরকারপ্রধানরাও উপস্থিত ছিলেন। এর আগে তিনি ডব্লিউইএফ প্রেসিডেন্ট আলোইস জভিংগির সঙ্গেও ফলপ্রসূ বৈঠক করেন।
কর্মসূচি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র জানান, বুধবার সকালে ডব্লিউইএফের ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্স’-এ অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের উদ্দেশ্যে হাইস্পিড ট্রেনে দালিয়ান থেকে বেইজিংয়ের উদ্দেশে যাত্রা করবেন তিনি।
মাহদী আমিন বলেন, দীর্ঘদিন পর বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করছেন এমন একজন ‘স্টেটসম্যান’, যিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত। তিনি বিশ্বের প্রতিটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব কার্যকরভাবে ধারণ করছেন।
দালিয়ানে প্রধানমন্ত্রীর এই অংশগ্রহণ একদিকে যেমন নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ করছে, অন্যদিকে জাতীয় সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করছে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
চুক্তি আলোচনায় ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা : বেইজিং সফরে চীনের সঙ্গে ১৫ থেকে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সইয়ের সম্ভাবনা আছে। সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনার মধ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা থাকবে আলোচনার একটি বড় অংশজুড়ে।
তিস্তা নদী ঘিরে উন্নয়ন পরিকল্পনার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং চীনের পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন অব চায়না বা পাওয়ার চায়নার মধ্যে ২০১৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। মহাপরিকল্পনায় পূর্ব চীনের জিয়াংসু প্রদেশের সুকিয়ান সিটির আদলে তিস্তার দুই পাড়ে পরিকল্পিত স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকার চীনের সেই প্রস্তাবনার আলোকেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা বলেছে।
চীনের প্রস্তাবিত এই ‘তিস্তা প্রকল্প’ বাস্তবায়ন হলে বদলে যাবে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলার মানুষের ভাগ্যের চাকা।
সময়ের আলো/এসএকে