সব বাজারেই কমছে পোশাক রফতানি

এসএম আলমগীর

অর্থনীতি

অর্থনীতির অধিকাংশ সূচকেই নেতিবাচক ধারা চলছে। ভালো অবস্থা ছিল শুধু রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ে। এর মধ্যে রেমিট্যান্সে ভালো অবস্থা এখনও

2026-06-24T01:42:55+00:00
2026-06-24T01:42:55+00:00
 
  বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬,
১০ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
অর্থনীতি
সব বাজারেই কমছে পোশাক রফতানি
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬, ১:৪২ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
অর্থনীতির অধিকাংশ সূচকেই নেতিবাচক ধারা চলছে। ভালো অবস্থা ছিল শুধু রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ে। এর মধ্যে রেমিট্যান্সে ভালো অবস্থা এখনও ধরে রাখা গেছে, কিন্তু রফতানি আয়ের ইতিবাচক ধারা ধরে রাখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাক রফতানি কমছে আশঙ্কাজনক হারে। ইউরোপ-আমেরিকার মতো বড় বাজার থেকে নতুন বাজার- সব বাজারেই কমছে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি। যা অর্থনীতির জন্য শঙ্কার বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে মত অর্থনীতিবিদ ও এ খাতের উদ্যোক্তাদের।

খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু পোশাক রফতানি কমছে তা নয়, বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের পোশাকের মূল্যও কমিয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া নতুন করে রফতানি আদেশ দেওয়া কমাচ্ছে, এমনকি আগের অনেক রফতানি আদেশ বাতিলও করছে। এ কারণে আগামী মাসগুলোতে পোশাক রফতানি আরও কমে যেতে পারে বলে মনে করছেন রফতানিকারকরা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সময়ের আলোকে বলেন, বিগত কয়েক মাস ধরেই কমছে পোশাক রফতানি। প্রধান দুই বাজার ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রফতানি যেমন কমছে, তেমনই পোশাকের মূল্যও কমছে। এই বিষয়টি নিয়েই আমাদের দুশ্চিন্তা বেশি। 

আমরা উদ্যোক্তারা খুব চাপে পড়ে গেছি। একদিকে যেমন রফতানি আয় কমছে, অন্যদিকে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। এ জন্য উদ্যোক্তাদের এখন ব্যবসায় টিকে থাকতে রীতিমতো লড়াই করতে হচ্ছে। অনেকে টিকে থাকতে না পেরে গত দেড়-দুই বছরে অনেক কারখানা মালিক কারখানা বন্ধও করে দিয়েছেন। গত কুরবানির ঈদের পরও বেশ কয়েকটি কারখানাবন্ধ হয়ে গেছে। ঈদের ছুটির পর মালিকরা আর কারখানা খোলেননি। এভাবে গত দেড়-দুই বছরে কয়েক লাখ শ্রমিক বেকার হয়েছে।

পোশাক রফতানি কমার পেছনে বেশ কয়কটি কারণ উল্লেখ করে মোহাম্মদ হাতেম সময়ের আলোকে বলেন, প্রধান কারণ হচ্ছে বৈশ্বিক অস্থিরতা। যুদ্ধসহ নানা কারণে ইউরোপ-আমেরিকার ক্রেতারা সাশ্রয়নীতি গ্রহণ করেছে। এ কারণে বড় বড় চেইনশপগুলো ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো পোশাক কেনা কমিয়েছে। মূলত মূল্যস্ফীতি আর যুদ্ধের কারণে ইউরোপের ক্রেতারা কম কিনছে। জার্মানি এবং যুক্তরাজ্যের মতো বড় বাজারে খুচরা বিক্রি কমেছে। আর আমেরিকায় সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় মানুষ বিলাসী পণ্যে খরচ কমিয়েছে। ওয়ালমার্ট, টার্গেটের মতো বড় বায়াররা পণ্য কেনা কমাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে আমাদের পোশাক রফতানিতে।

বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) ইউরোপীয় ইউনিয়নে পোশাক রফতানি হয়েছে ১৭ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৪০ মিলিয়ন ডলার কম।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি কমেছে। মে মাসে শক্তিশালী পুনরুদ্ধার হলেও মোটের ওপর হিসাব করলে এ বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইইউতে বাংলাদেশের রফতানি ভালো ছিল। ওই বছর রফতানি ৯ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১৯ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।

তবে শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই প্রবৃদ্ধি মূলত বেশি দামের কারণে হয়েছে, ক্রয়াদেশের পরিমাণ বাড়ার কারণে নয়। মে মাসের পুনরুদ্ধারেও সামগ্রিক ধীরগতি কাটেনি। এপ্রিলের ১ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার থেকে মে মাসে রফতানি বেড়ে ১ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। এতে মাসভিত্তিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ। জানুয়ারির ১ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলারের পর এটি চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাসিক আয়।

তবে এ পুনরুদ্ধার সত্ত্বেও বছরের বড় অংশজুড়ে রফতানি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম ছিল। জুলাইয়ে ১ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার থেকে সেপ্টেম্বরে রফতানি কমে ১ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারে নামে। পরে ফেব্রুয়ারি ও মার্চে তা আবার কমে যথাক্রমে ১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ও ১ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।

অন্যদিকে এপ্রিলের ৩১৬ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার থেকে মে মাসে জার্মানিতে রফতানি বেড়ে ৪০৯ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে রফতানি এখনও জুলাইয়ের সর্বোচ্চ ৪৭১ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলারের নিচে রয়েছে, এতে বোঝা যায় চাহিদা এখনও আগের পর্যায়ে ফেরেনি।

মে মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের মোট পোশাক রফতানির প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশই গেছে জার্মানিতে। স্পেন দ্বিতীয় বৃহত্তম গন্তব্য হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। মে মাসে দেশটিতে ৩০০ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছে, যা এপ্রিলের ২৮৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় কিছুটা বেশি।

তবে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে আলাদা করে পর্যালোচনা করলে দেখা যাচ্ছে, ক্রোয়েশিয়ায় ৮২ শতাংশ, রোমানিয়ায় ২৩ শতাংশ, আয়ারল্যান্ডে ১২ শতাংশ, জার্মানিতে ১২ শতাংশ, ফ্রান্সে ১০ শতাংশ পোশাক রফতানি কমেছে। ইউরোপের আরেক বড় বাজার যুক্তরাজ্যেও বাড়ছে না পোশাক রফতানি। দেশটিতে কমেছে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ। 

অন্যদিকে এককভাবে প্রধান বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও পোশাক রফতানির চিত্র ইতিবাচক না। চলতি বছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রফতানি কমেছে ১১ দশমিক ২৪ শতাংশ। দেশটিতে ইউনিট প্রাইজ কমেছে ২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। আর ভলিউমের হিসাবে এই সময়ে মার্কিন বাজারে পোশাক রফতানি কমেছে ৯ শতাংশ। 


এ ছাড়া নতুন বাজারগুলোতেও পোশাক রফতানি কমেছে। নতুন বাজারের মধ্যে রাশিয়ায় কমেছে ৩০ দশমিক ৩৬ শতাংশ, তুরস্কে কমেছে ১৬ শতাংশ, মেক্সিকোতে কমেছে ১২ শতাংশ, ভারতে কমেছে ১১ দশমিক ১৩ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় কমেছে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ায় কমেছে ১০ শতাংশ। এভাবে নতুন বাজারের প্রায় সবগুলো দেশেই পোশাক রফতানি কমেছে।

কেন কমছে পোশাক রফতানি
পোশাক রফতানি কমার পেছনে প্রধান কারণ চাহিদা কমে যাওয়া। এরপর বাজারে দামের প্রতিযোগিতার প্রভাবেও কমছে। বিশেষ করে ভিয়েতনাম, ভারত এবং কম্বোডিয়া কম দামে অর্ডার নিচ্ছে, এতে ক্রেতারা ওই বাজারের দিকে ঝুঁকছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে মজুরি বেড়েছে, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বেশি। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে।

আবার অর্ডার ডাইভারশনও হচ্ছে। অনেক বায়ার এখন চায়না+১ পলিসি নিচ্ছে। চীনের পাশাপাশি অন্য দেশে সোর্সিং করছে। কিন্তু বাংলাদেশের বিগত দিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, শ্রম অসন্তোষের কারণে কিছু অর্ডার ভিয়েতনাম-ভারতে চলে গেছে। এ ছাড়া নতুন নিয়ম-কানুনের প্রভাবও রয়েছে। বিশেষ করে ইইউর ডিউ ডিলিজেন্স আইনে বলা হয়েছে, পরিবেশ ও মানবাধিকার মানতে না পারলে ইউরোপে রফতানি কঠিন হবে।

আমেরিকার টঋখচঅ, জিনজিয়াংয়ের তুলা নিয়ে কড়াকড়ি। বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ কাঁচামাল চীন থেকে আসে, তাই সাপ্লাই চেইন প্রমাণ করা ঝামেলা।

বাংলাদেশের এখন করণীয় কী
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংকটের সময় বাজার বহুমুখীকরণ দরকার। বিশেষ করে জাপান, কোরিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতে রফতানি বাড়ানোর চেষ্টা করা দরকার। এ ছাড়া ম্যান-মেইড ফাইবার বা তুলার বদলে কৃত্রিম তন্তুর পোশাকে জোর দেওয়া দরকার। কারণ ইউএস-ইইউতে এর চাহিদা বেশি।

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   বাজার  পোশাক  রফতানি  অর্থনীতি 


Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: