‘আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছিলাম, তারপর যত দ্রুত সম্ভব নিচে নেমে দৌড়ে বেরিয়ে যাই’—ভয়াবহ ভূমিকম্পের সেই মুহূর্ত স্মরণ করতে গিয়ে এভাবেই আতঙ্কের কথা বর্ণনা করেছেন ভেনেজুয়েলার বাসিন্দারা।
বুধবার (২৪ জুন) কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে দেশজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি হয়েছে। হাজারো মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রাজধানী কারাকাস সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি। ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকারীরা নিখোঁজদের খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছেন।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে, প্রধান বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্রুত হাসপাতালে যোগ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কারাকাসের ৩৮ বছর বয়সী প্রকৌশলী জেসুস আলেহান্দ্রো পিনা জানান, ভূমিকম্পের সময় তিনি একটি সাততলা ভবনের সর্বোচ্চ তলায় ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘কম্পন ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। ঠিক কতক্ষণ স্থায়ী হয়েছিল জানি না, তবে আমার কাছে প্রায় এক মিনিটের মতো মনে হয়েছে।’
‘কাচ ভেঙে যায়, দেয়ালে ঝোলানো ছবিও পড়ে ভেঙ্গে যায়, টেলিভিশনও পড়ে যায়। ঘরের সবকিছু কাঁপছিল। বাতি, কাচের তৈরি সব জিনিসপত্র, এমনকি ভবনের কলাম ও বিম থেকেও বিকট শব্দ আসছিল।’
প্রকৌশলী হিসেবে তিনি বুঝতে পারছিলেন ভবনটির ওপর কী ধরনের চাপ তৈরি হয়েছিল।
পিনা বলেন, কলাম ও বিমের নড়াচড়া ভূমিকম্পের হাত থেকে বাঁচায়। কিন্তু কম্পন যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তা ভেঙে পড়তে পারে। তখনই ভবন ধসে পড়ে।
কম্পন থেমে যাওয়ার পর হাজার হাজার আতঙ্কিত মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। চারদিকে দেখা যায় ধ্বংসস্তূপ, আহত মানুষ এবং উদ্ধার তৎপরতা।
তিনি বলেন, সবাই রাস্তায়, খোলা জায়গায় এবং নিজেদের বাড়ির বাইরে অবস্থান করছিল। মানুষ আতঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন ছিল। অসংখ্য আহতকে দেখা গেছে। দমকলকর্মী ও উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মানুষ বের করে আনছিলেন।
তিনি আরও বলেন, এখন মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে, তবুও মানুষ ঘরে ফেরেনি। সবাই বাইরে অবস্থান করে সংবাদ দেখছে। কারণ, আরও আফটারশকের আশঙ্কা রয়েছে।
‘যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের মতো লাগছিল’
কারাকাসের এল প্যারাইসো এলাকার ২৫ বছর বয়সী বাসিন্দা লুইস আলেহান্দ্রো রুইজ গার্সিয়া জানান, ভূমিকম্পের কয়েক মুহূর্ত আগে তার মোবাইল ফোনে গুগলের ভূমিকম্প সতর্কবার্তা আসে।
তিনি বলেন, আমার মা ও বোন ভয় পেয়ে বিছানা থেকে উঠে পড়েন। আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরি এবং যত দ্রুত সম্ভব নিচে নেমে ভবন থেকে বেরিয়ে যাই।
বাইরে এসে তিনি দেখতে পান, তার বাসা থেকে তিন ব্লক দূরে একটি আবাসিক ভবন ধসে পড়েছে এবং বাতাসে কমলা রঙের ধুলার মেঘ ছড়িয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, প্রায় ১০ মিনিট অপেক্ষা করার পর আমরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও কিছু কাপড় নেওয়ার জন্য আবার বাসায় ফিরি, তারপর আবার বেরিয়ে যাই।
দাদির খোঁজ নিতে যাওয়ার পথে তিনি দেখেন, রাস্তাজুড়ে মানুষ স্বজনদের খুঁজতে ব্যস্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবন থেকে প্রতিবেশীদের বের করে আনার চেষ্টা করছেন।
রুইজ গার্সিয়া বলেন, রাস্তার ওপারের ভবনটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। দৃশ্যটি ছিল যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো দেশের ছবি। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে মানুষকে সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে শোনা যাচ্ছিল।
তিনি জানান, অর্থনৈতিক সংকটের কারণে যেসব পরিবারের সন্তানরা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, সেইসব একাকী বয়স্ক মানুষদের অনেকেই ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন।
মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে
সারারাত উদ্ধার অভিযান চললেও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এখনও স্পষ্ট নয়।
ভেনেজুয়েলার কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত অন্তত ৩২ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ৪৪ শতাংশ এবং ১ লাখের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা ৩৩ শতাংশ।
এদিকে কয়েকটি অঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা এখনও বিপর্যস্ত রয়েছে। ফলে বহু পরিবার স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না, যা ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণে কর্তৃপক্ষের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ