ইসলামি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো হিজরি সন। এটা কেবল সময়ের হিসাব নয়, বরং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সেই ঐতিহাসিক ত্যাগের মহিমা ও ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্মারক।
মুসলমানদের ইবাদত ও দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ- রোজা, রমজান, ঈদ, কুরবানি, জাকাত, হজ থেকে শুরু করে তালাক বা মৃত্যুর ইদ্দত পালন পর্যন্ত সবই হিজরি বর্ষপঞ্জির ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘তিনিই সূর্যকে দীপ্তিময় এবং চাঁদকে আলোকময় করেছেন এবং তার জন্য নির্ধারণ করেছেন বিভিন্ন মঞ্জিল, যাতে তোমরা জানতে পারো বছরের গণনা ও সময়ের হিসাব’ (সুরা ইউনুস : ৫)।
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘লোকেরা তোমাকে নতুন চাঁদ সম্পর্কে জিগ্যেস করে। তুমি বলো, এটা মানুষের সময় নির্ধারণ এবং হজের জন্য’ (সুরা বাকারা : ১৮৯)।
এই নির্দেশনার আলোকে ইসলামি বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করা কেবল একটি অভ্যাসের বিষয় নয়, বরং প্রতিটি মুসলমানের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও শরিয়তের অংশ। হিজরি সন কেবল একটি তারিখের নাম নয়, বরং এটি ইসলামের আদর্শ ও চেতনার এক ধারক।
হিজরি সন গণনার সূচনা হয়েছিল এক অবিস্মরণীয় প্রেক্ষাপটে। রাসুল (সা.) এবং তাঁর সাহাবিগণের মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনাকে অমর করে রাখতেই মূলত এই ক্যালেন্ডার প্রবর্তনের চিন্তা আসে। আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে তথা দ্বীন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে পবিত্র মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের বছর থেকেই হিজরি সনের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
খলিফা হজরত ওমর ফারুক (রা.)-এর শাসনামলে ১৬ হিজরি সনে প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) ইরাক এবং কুফার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে একটি প্রশাসনিক সমস্যার মুখোমুখি হন। তিনি খলিফা ওমরের (রা.) খেদমতে একটি পত্রে নিবেদন করেন যে, আপনার পক্ষ থেকে পাঠানো নির্দেশ সংবলিত চিঠিগুলোতে দিন, মাস বা তারিখের উল্লেখ না থাকায় সেগুলো কোন সময়ের তা নির্ধারণ করা আমাদের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছে। চিঠিপত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে না পারায় অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক কার্যক্রমে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.)-এর এই যৌক্তিক আবেদন পেয়ে হজরত ওমর (রা.) জরুরিভিত্তিতে একটি পরামর্শ সভার আহ্বান করেন। ওই সভায় হজরত উসমান (রা.), হজরত আলিসহ (রা.) বিশিষ্ট সাহাবিগণ উপস্থিত ছিলেন। সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি স্বতন্ত্র ইসলামি তারিখ প্রবর্তন করা। বর্ষের সূচনা কোন মাস থেকে হবে তা নিয়ে সাহাবিদের মধ্যে বিভিন্ন মত ও পরামর্শ উঠে আসে। কেউ কেউ মত দেন রাসুল (সা.)-এর জন্মের মাস ‘রবিউল আউয়াল’ থেকে বর্ষ শুরু করার। আবার কারও মতে, রাসুলের ওফাতের মাস থেকে এটি শুরু করা হোক। অন্যান্যের মতে, নবীজি (সা.)-এর মদিনায় হিজরতের মাস থেকেই বর্ষ গণনা শুরু করা উচিত।
আলোচনা শেষে হজরত ওমর (রা.) এক ঐতিহাসিক ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তে উপনীত হন। তিনি বলেন, রাসুল (সা.)-এর জন্মের মাস থেকে হিজরি সনের গণনা শুরু করা যাবে না। কারণ খ্রিস্টান সম্প্রদায় হজরত ঈসা (আ.)-এর জন্মের মাস থেকেই খ্রিস্টাব্দের গণনা শুরু করেছিল। সুতরাং জন্মের মাস থেকে সূচনা করলে তাদের অনুসরণ বা সাদৃশ্যতা হয়ে যায়, যা ইসলামি স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে পরিপন্থী।
অন্যদিকে নবীজি (সা.)-এর ওফাত দিবসের মাস থেকেও গণনা শুরু করা সমীচীন নয়, কারণ এতে নবীজি (সা.)-এর মৃত্যুবেদনাই বারবার মনে পড়বে এবং অজ্ঞ যুগের শোক পালনের ইসলামবিরোধী কোনো কুপ্রথার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।
পরিশেষে হজরত ওমর (রা.)-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হিজরতের বছর থেকেই ইসলামি দিনপঞ্জি গণনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় হিজরতের ১৬ বছর পর ১০ জুমাদাল উলা, ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে। এভাবেই আমিরুল মুমিনিন হজরত ওমর ফারুক (রা.)-এর শাসনামলে হিজরি সনের পথচলা শুরু হয়।
মুসলিম জীবনে হিজরি সনের গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে গণনার মাস হলো বারোটি।’ হিজরি সনের প্রথম মাস হলো মহররম। এটি অত্যন্ত তাৎপর্যমণ্ডিত ও বরকতময় মাস।
ইসলামি ইতিহাসে এই মাসটি বিভিন্ন কারণে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। কুরআন মাজিদে এই মাসটিকে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘চারটি মাস রয়েছে যেগুলো সম্মানিত মাস। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো মহররম’ (সুরা তওবা : ৩৬)। আর এই মাসেই রয়েছে ফজিলতপূর্ণ ‘আশুরা’।
মহররমের দশম তারিখেই ঐতিহাসিক কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। এ ছাড়া আদিকাল থেকে এই দিনে বহু গুরুত্বপূর্ণ ও অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে, যা মুসলিম উম্মাহর বিশ্বাস ও ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই কেবল সন গণনার খাতিরে নয়, বরং ইসলামি চেতনা ও ঐতিহ্যের সুরক্ষায় প্রতিটি মুসলমানের হিজরি সনের যথাযথ চর্চা ও অনুসরণ করা একান্ত কাম্য।
সময়ের আলো/প্রিন্টি/এসএকে