যুদ্ধের ধরন বদলাচ্ছে এমন মূল্যায়ন থেকে নিজেদের সামরিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া।
দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, সেনাবাহিনীর সব সদস্যকে ধাপে ধাপে ড্রোন পরিচালনায় দক্ষ করে তোলা হবে, যাতে প্রত্যেক সৈন্য ব্যক্তিগত অস্ত্র ব্যবহারের মতো স্বাভাবিকভাবে ড্রোনও পরিচালনা করতে পারেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, শুক্রবার (২৬ জুন) সিউলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রধান আন গিউ-ব্যাক বলেন, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন এমন একটি সক্ষমতা হয়ে উঠছে, যা প্রতিটি সৈন্যের মৌলিক যুদ্ধদক্ষতার অংশ হওয়া প্রয়োজন।
এই পরিকল্পনার আওতায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও মেরিন বাহিনীর মোট ৫ লাখ অনুমোদিত সদস্যকে ‘ড্রোন যোদ্ধা’ হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই কর্মসূচি দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক আধুনিকীকরণের অন্যতম বৃহৎ উদ্যোগ।
আন গিউ-ব্যাক বলেন, ইউক্রেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত দেখিয়েছে যে ড্রোন এখন যুদ্ধক্ষেত্রের ‘গেমচেঞ্জার।’
তার ভাষায়, স্বল্পমূল্যের বিপুল সংখ্যক ড্রোন যুদ্ধ পরিচালনার প্রচলিত ধারণাকেই বদলে দিচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, উত্তর কোরিয়া ধারাবাহিকভাবে নিজেদের অস্ত্র সক্ষমতা বাড়িয়ে যাচ্ছে। এর ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হুমকি বাড়ছে।
নতুন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী এ বছরের শেষ নাগাদ প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় ১১ হাজার বাণিজ্যিক ড্রোন সংগ্রহ করবে। ২০২৯ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বাড়িয়ে ৬০ হাজারে নেওয়া হবে। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ হাজারের বেশি স্বল্পমূল্যের একবার ব্যবহারযোগ্য যুদ্ধ ড্রোন সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সিউল আরও জানিয়েছে, দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি দীর্ঘপাল্লার লয়টারিং মিউনিশন ‘কে-লুকাস’ দ্রুত উন্নয়ন ও কার্যক্রমে আনা হবে। এই ড্রোন ব্যবস্থার নাম ও ধারণা নেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের লুকাস (লো কস্ট আনক্রুড কমব্যাট অ্যাটাক সিস্টেম) প্ল্যাটফর্ম থেকে। আর ওই মার্কিন প্ল্যাটফর্মটি ইরানের শাহেদ-১৩৬ আত্মঘাতী ড্রোনের রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া ব্যাপকভাবে শাহেদ-১৩৬ ব্যবহার করছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় শুধু আক্রমণ নয়, প্রতিরোধ সক্ষমতাও বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। এর মধ্যে ড্রোন প্রতিহত করতে লেজার এবং উচ্চক্ষমতার মাইক্রোওয়েভভিত্তিক অস্ত্র ব্যবস্থার সম্প্রসারণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই ঘোষণার পেছনে উত্তর কোরিয়ার ড্রোন সক্ষমতা নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে ২০২২ সালের একটি ঘটনায় দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ্যে আসে।
সে সময় উত্তর কোরিয়ার পাঁচটি ছোট ড্রোন দক্ষিণ কোরিয়ার আকাশসীমায় প্রবেশ করে। এর মধ্যে একটি সিউলে প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের ওপরের উড্ডয়ন-নিষিদ্ধ এলাকায় ঢুকে পড়ে। জবাবে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী যুদ্ধবিমান ও আক্রমণ হেলিকপ্টার মোতায়েন করে এবং প্রায় ১০০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। তবে শেষ পর্যন্ত একটি ড্রোনও ভূপাতিত করা সম্ভব হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার সঙ্গে ক্রমশ গভীর হওয়া সামরিক সহযোগিতার কারণে উত্তর কোরিয়ার ড্রোন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে পিয়ংইয়ং যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য, অভিজ্ঞতা ও কৌশলগত শিক্ষা পাচ্ছে, যা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অর্জন করতে আরও বহু বছর সময় লাগত। ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে অংশ নিতে উত্তর কোরিয়া হাজার হাজার সেনা পাঠিয়েছে। এর মাধ্যমে তাদের বাহিনী বৃহৎ পরিসরে ড্রোন যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করছে।
এদিকে, শুক্রবার উত্তর কোরিয়া জানিয়েছে, দেশটির নেতা কিম জং-উন কৌশলগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৯০ কিলোমিটার পাল্লার উন্নত রকেট আর্টিলারি ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ পর্যবেক্ষণ করেছেন। পিয়ংইয়ংয়ের দাবি, দক্ষিণ সীমান্ত এলাকায় অগ্নিশক্তি বাড়ানোর লক্ষ্যে এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
অন্যদিকে কিম জং-উন উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার ‘সূচকীয় হারে’ সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
তিনি বলেছেন, ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে ওঠা আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধি হচ্ছে সবচেয়ে সঠিক ও একমাত্র কার্যকর পথ।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ