ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব জমা না দেওয়ায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), আমার বাংলাদেশ পার্টিসহ (এবি পার্টি) সাতটি রাজনৈতিক দলকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ ঘটনার পর নতুন করে সামনে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব জমা দেওয়া কেন বাধ্যতামূলক, আর তা না দিলে কী হতে পারে?
কেন হিসাব জমা দিতে হয়?
নির্বাচন মানেই বিপুল অর্থের লেনদেন। প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রচার-প্রচারণা, জনসভা, কর্মী ব্যবস্থাপনা, পরিবহন, পোস্টার-লিফলেট, ডিজিটাল প্রচারণাসহ নানা খাতে অর্থ ব্যয় করতে হয়। এসব অর্থ কোথা থেকে এলো এবং কীভাবে ব্যয় হলো, তা জনগণ ও রাষ্ট্রের কাছে স্পষ্ট করতেই নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এর প্রধান উদ্দেশ্য। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনো রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে চাইলে তার অর্থের উৎস ও ব্যয়ের বিষয়ে স্বচ্ছ থাকা জরুরি। অন্যথায় অঘোষিত অর্থ, অস্বচ্ছ লেনদেন কিংবা অবৈধ অর্থ ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
কত দিনের মধ্যে হিসাব দিতে হয়?
জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে তাদের নির্বাচনী আয়-ব্যয়ের হিসাব নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হয়। এই সময়সীমা নির্ধারণের উদ্দেশ্য হলো, নির্বাচনের পরপরই দলগুলো যেন তাদের ব্যয়ের তথ্য সঠিকভাবে সংকলন করে কমিশনের কাছে উপস্থাপন করতে পারে।
নির্বাচনী হিসাবের মধ্যে সাধারণত অর্থের উৎস, বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের পরিমাণ, অনুদান বা চাঁদার তথ্য এবং প্রচার-প্রচারণার ব্যয়ের বিবরণ অন্তর্ভুক্ত থাকে। অর্থাৎ, নির্বাচন ঘিরে আর্থিক কর্মকাণ্ডের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র এই হিসাবের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের কাছে তুলে ধরতে হয়।
হিসাব না দিলে প্রথম পদক্ষেপ কী?
কোনো রাজনৈতিক দল নির্ধারিত ৯০ দিনের মধ্যে হিসাব জমা না দিলে নির্বাচন কমিশন প্রথমেই কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। অর্থাৎ, কেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হিসাব জমা দেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে দলটির কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
এ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট দল তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পারে। কোনো প্রশাসনিক জটিলতা, তথ্য সংগ্রহে বিলম্ব বা অন্য কোনো কারণ থাকলে তা কমিশনের কাছে তুলে ধরার সুযোগ পায়। অর্থাৎ, হিসাব জমা না দিলেই তাৎক্ষণিকভাবে শাস্তি দেওয়া হয় না; বরং প্রথমে দলটিকে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেওয়া হয়।
এরপর কী হতে পারে?
যদি কোনো দল সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হয় বা দীর্ঘ সময়েও হিসাব জমা না দেয়, তাহলে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়। তখন কমিশন প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পায়।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের জবাবদিহি ও আইন মেনে চলার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল যদি আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক আর্থিক হিসাবই সময়মতো জমা দিতে না পারে, তাহলে তার সাংগঠনিক সক্ষমতা ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।
কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব জমা দেওয়ার বিধানকে কেবল প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি গণতান্ত্রিক জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়ন স্বচ্ছ না হলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অঘোষিত অর্থের ব্যবহার, অস্বচ্ছ লেনদেন এবং প্রভাব খাটানোর সুযোগ বাড়তে পারে।
তাই নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা মূলত জনগণের জানার অধিকার ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি ব্যবস্থা। এনসিপি, এবি পার্টিসহ সাত দলের প্রতি ইসির নোটিশ তাই শুধু হিসাব জমা না দেওয়ার একটি ঘটনা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর আর্থিক জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও বটে।
সময়ের আলো/কেএইচও