ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পের ক্ষত শুকানোর আগেই লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় আবারও নতুন করে আঘাত হেনেছে মাঝারি মাত্রার এক ভূমিকম্প। শুক্রবার (২৬ জুন) দেশটির উত্তর উপকূলে আঘাত হানা এই নতুন কম্পনটির মাত্রা রিখটার স্কেলে ছিল ৪.৯। গত বুধবারের প্রলয়ংকরী জোড়া ভূমিকম্পের পর শুক্রবারের এই নতুন কম্পন দেশটির মানুষের মনে চরম আতঙ্ক তৈরি করেছে।
ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় ভূকম্পন কেন্দ্র (ইএমএসসি) এক সোশ্যাল মিডিয়া বার্তায় জানিয়েছে, শুক্রবারের এই নতুন ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলীয় শহর মারাকাই থেকে প্রায় ৬১ কিলোমিটার (৩৬ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, নতুন এই কম্পনটি মারাকাই ও রাজধানী কারাকাসের বিস্তীর্ণ এলাকায় অনুভূত হয়েছে। তবে এতে নতুন করে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
ভেনেজুয়েলা মূলত গত বুধবার (২৪ জুন) সন্ধ্যার সেই জোড়া প্রলয়ের ধাক্কা এখনও সামলে উঠতে পারেনি। ওই দিন মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে রিখটার স্কেলে ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল উত্তর-কেন্দ্রীয় ভেনেজুয়েলায়, যা গত ১২৫ বছরের মধ্যে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী। এই জোড়া ভূমিকম্পে রাজধানী কারাকাস ও তার আশেপাশের এলাকা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত অন্তত ৯২০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছে, ধ্বংসযজ্ঞের যে ভয়াবহতা, তাতে মোট প্রাণহানির সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ভেনেজুয়েলা সরকারের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পে আহত মানুষের সংখ্যা ৩ হাজার ৩৬০ জন ছাড়িয়ে গেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অন্তত ১৭২ জন মানুষ জীবিত আটকে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত নিখোঁজের সংখ্যা ৫১ হাজার পার হয়ে গেছে। নিখোঁজদের সন্ধানে স্বজনদের অপেক্ষা আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাতাস।
এদিকে শুক্রবার দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো এক ঘোষণায় জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা রাজ্যের কিছু এলাকায় সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়েছে, যাতে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত না হয়।
উদ্ধারকারী দলের জন্য অপেক্ষা না করে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেরাই কোদাল ও খালি হাতে স্বজনদের খুঁজতে ধ্বংসস্তূপে নেমে পড়েছেন। উদ্ধার হওয়া আহতদের হাসপাতালে নিতে অনেকে নিজেদের ব্যক্তিগত গাড়িকে তাৎক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে ব্যবহার করছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে পাঁচ আত্মীয়সহ নিজের ৬ বছরের সন্তান আটকে থাকা ২৫ বছর বয়সী জেনিফার পালাসিওস কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, এখানকার সাধারণ মানুষই মূলত নিজেদের চেষ্টায় এ পর্যন্ত অনেককে জীবিত উদ্ধার করেছে। আমাদের এখন বড় স্ল্যাবগুলো সরানোর জন্য ক্রেন দরকার। ভেতরে এখনও মানুষ আটকে আছে।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর থেকে ভেনেজুয়েলায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) ব্লক করে রাখা হয়েছিল। তবে এই জাতীয় সংকটের মুহূর্তে নিখোঁজ স্বজনদের তথ্য ও সন্ধান দ্রুত আদান-প্রদানের সুবিধার্থে সরকার সেই নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করেছে। ফলে স্থানীয় মানুষজন এখন সহজেই নিখোঁজদের তথ্য শেয়ার করতে পারছেন।
সময়ের আলো/কহু