বিশ্বকাপ বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া মঞ্চ। আর সেই মঞ্চ যখন বসেছে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সবার ধারণা ছিল স্টেডিয়ামের ভিআইপি বক্সে নিয়মিত দেখা যাবে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে প্রকাশ্য উচ্ছ্বাস এবং বড় ক্রীড়া আসরে উপস্থিত থাকার দীর্ঘ অভ্যাস, সব মিলিয়ে এমন প্রত্যাশা ছিল খুবই স্বাভাবিক।
কিন্তু বাস্তবতা ঠিক উল্টো। টুর্নামেন্ট অর্ধেকের বেশি গড়িয়ে গেলেও একটি ম্যাচেও দেখা যায়নি ট্রাম্পকে। স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত করলেও প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতি এখন বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত ইস্যু। প্রশ্ন উঠছে, কেন স্টেডিয়াম থেকে দূরে রয়েছেন ট্রাম্প! তিনি কি শেষ পর্যন্ত ফাইনালেই প্রথমবারের মতো হাজির হবেন।
বিশ্বকাপের আয়োজক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের মাঠে উপস্থিত থাকা নতুন কিছু নয়। ১৯৯৪ সালে প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হলে শিকাগোর সোলজার ফিল্ডে উদ্বোধনী ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। উদ্বোধনী ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এই মহৎ আয়োজনের স্বাগতিক হতে পেরে গর্বিত। বিশ্বের সব দেশ ও মহাদেশ থেকে আসা মানুষকে আমরা স্বাগত জানাই।’
৩২ বছর পর আবারও বিশ্বকাপ ফিরেছে যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু এবার দৃশ্যপট পুরোপুরি ভিন্ন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন পর্যন্ত কোনো ম্যাচে স্টেডিয়ামে যাননি। অথচ টুর্নামেন্ট শুরুর আগে বিশ্বকাপ নিয়ে তার আগ্রহের কোনো ঘাটতি ছিল না। চলতি মাসের শুরুতেই ফিফার টিকেট বিক্রির সাফল্যের প্রশংসা করে তিনি বলেছিলেন, ‘এটি সম্ভবত ফিফার ইতিহাসের সবচেয়ে সফল বিশ্বকাপ।’
এরও আগে গত ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর হাত থেকে সংস্থার প্রথম ‘পিস প্রাইজ’ গ্রহণ করেছিলেন তিনি।
ইনফান্তিনো ও ট্রাম্পের সম্পর্কও বেশ উষ্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফিফা সভাপতি একাধিকবার হোয়াইট হাউস এবং ট্রাম্পের ফ্লোরিডার মার-আ-লাগো রিসোর্টে গেছেন। ট্রাম্পও দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর সুপার বোল, ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনাল, রাইডার কাপসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বড় ক্রীড়া আসরে নিয়মিত উপস্থিত ছিলেন।
তাই ১২ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বোধনী ম্যাচে তার অনুপস্থিতি অনেককেই বিস্মিত করেছে। তার পরিবর্তে ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। জানা যায়, দুদিন পর হোয়াইট হাউসের লনে আয়োজিত একটি ইউএফসি অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিকেই অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন ট্রাম্প। সেই অনুষ্ঠানটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উদযাপনের অংশ।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি ট্রাম্পের স্বভাবের সঙ্গেই মানানসই। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মিডিয়া পরিচালক ও রাজনৈতিক কৌশলবিদ ফেদেরিকো দে জেসুস বলেন, ‘ইউএফসিই ট্রাম্পের সবচেয়ে প্রিয় খেলা। তিনি সবসময় সবচেয়ে বড় মঞ্চ বেছে নেন। সুপার বোলে গেছেন, কিন্তু সাধারণ ম্যাচে যাননি। বিশ্বকাপের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো ফাইনাল। সম্ভবত এবারও সেটাই দেখা যাবে।’
ট্রাম্পের অনুপস্থিতির পেছনে রাজনৈতিক হিসাবও থাকতে পারে বলে মত অনেকের। সম্প্রতি এনবিএ ফাইনালে উপস্থিত হয়ে দর্শকদের দুয়োধ্বনির মুখে পড়েছিলেন তিনি। বিশ্বকাপে আন্তর্জাতিক দর্শকের উপস্থিতি আরও বেশি হওয়ায় এমন পরিস্থিতি এড়াতেই হয়তো সতর্ক অবস্থান নিয়েছে তার প্রশাসন। বিশেষ করে লস অ্যাঞ্জেলেস ও সিয়াটলের মতো ডেমোক্র্যাট-সমর্থক শহরগুলোতে অভিবাসন ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, ট্রাম্প বিশ্বকাপ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ম্যাচের আগের দিন তিনি জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের ফোন করে শুভকামনা জানিয়েছেন। এ ছাড়া হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি মার্কওয়েইন মুলিন, স্বাস্থ্য সচিব রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র এবং পরিবহন সচিব শন ডাফি বিভিন্ন ম্যাচে উপস্থিত থেকে প্রশাসনের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
তুরস্কের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচে ছিলেন সেকেন্ড লেডি উষা ভ্যান্সও। এদিকে হোয়াইট হাউস বিশ্বকাপ টাস্কফোর্সের প্রধান অ্যান্ড্রু জুলিয়ানি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ফাইনালের আগেই ট্রাম্পকে দেখা যেতে পারে। তার ভাষ্যে, ‘আমার বসকে আমি প্রায় ৩০ বছর ধরে চিনি। তিনি মানুষকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষায় রাখতে ভালোবাসেন। তাই সবাই অপেক্ষা করুন, নিশ্চয়ই কিছু চমক দেখা যাবে।’
ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো অবশ্য জানিয়েছেন, ১৯ জুলাই নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপ ফাইনালে উপস্থিত থেকে ট্রফি তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ট্রাম্পের। প্রেসিডেন্ট নিজেও নিশ্চিত করেছেন, এ জন্য তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
অবশ্য ট্রাম্পের ব্যস্ত কর্মসূচিকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ম্যাচের সময় তিনি জি-৭ সম্মেলনে যোগ দিতে ফ্রান্স সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। একই সময়ে ইরানের সঙ্গে শান্তি চুক্তি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনায় ব্যস্ত ছিলেন, যার ঘোষণা আসে ১৮ জুন।
লিগ পর্ব শেষে বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত অনুপস্থিতি এখন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে ফিফা কর্মকর্তারা সবাই একটি বিষয়েই একমত, ট্রাম্প যদি কোথাও হাজির হন, তা হলে সেটি হবে সবচেয়ে বড় মঞ্চে। তাই নিউজার্সির ফাইনালের রাতেই হয়তো শেষ হবে এই অপেক্ষা। আর তার আগে যদি হঠাৎ করেই কোনো ম্যাচে তাকে দেখা যায়, সেটিও ট্রাম্পের চিরচেনা নাটকীয় উপস্থিতির সঙ্গে একেবারেই মানানসই হবে।
সময়ের আলো/জেডি