স্নায়ুযুদ্ধ শেষে ‘সেরা তৃতীয়’ দল। সংগৃহীত ছবি২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু ভৌগোলিক দিক থেকে নয়, কাঠামোগত দিক থেকেও ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ১৬টি ভেন্যুতে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই মহাযজ্ঞ। নতুন ফরম্যাটে ১২টি গ্রুপের প্রতিটি থেকে শীর্ষ দুদল সরাসরি শেষ ৩২ পর্বে উঠছে। তাদের সঙ্গে যোগ দেবে ১২টি গ্রুপের মধ্যে সেরা আটটি তৃতীয় স্থানে থাকা দল।
শুনতে সহজ মনে হলেও এই ‘সেরা তৃতীয়’ নিয়মই তৈরি করেছে এক অভূতপূর্ব স্নায়ুযুদ্ধ। কারণ এখন আর শুধু জিতলেই হয় না, হারলেও কত ব্যবধানে হারল, কয়টি গোল করল কিংবা কতগুলো হলুদ কার্ড দেখল। সবকিছুই হয়ে উঠেছে নকআউটে উঠার সমীকরণের অংশ। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষে তার প্রমাণ মিলেছে। ইতিমধ্যে তৃতীয় স্থান থেকে শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে বসনিয়া হার্জেগোভিনা এবং সুইডেন। কিন্তু তাদের যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না।
বসনিয়া নিজেদের গ্রুপে এক জয়, এক ড্র এবং এক হার নিয়ে চার পয়েন্ট পেয়েছে। শেষ ম্যাচে কাতারকে হারিয়ে তাদের গোল পার্থক্য কিছুটা উন্নত হয়, আর সেটিই শেষ পর্যন্ত নকআউটের টিকেট এনে দেয়। যদি তারা আরেকটি গোল কম করত, তবে হয়তো শেষ ৩২-এর স্বপ্ন ভেঙে যেত।
একইভাবে ইকুয়েডরের গল্প আরও নাটকীয়। প্রথম দুই ম্যাচে মাত্র এক পয়েন্ট পাওয়া দলটি শেষ ম্যাচে শক্তিশালী জার্মানিকে হারিয়ে চার পয়েন্টে পৌঁছে যায়। সেই জয়ের পাশাপাশি গোল পার্থক্যও ইতিবাচক হওয়ায় তারা সেরা তৃতীয় দলের তালিকায় জায়গা করে নেয়।
সুইডেনের পরিস্থিতি ছিল আরও বেশি উদ্বেগের। নেদারল্যান্ডসের কাছে বড় ব্যবধানে হার তাদের গোল পার্থক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। ফলে জাপানের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে শুধু ড্র করলেই হবে কি না তা নিয়েও ছিল সংশয়। শেষ পর্যন্ত পয়েন্ট, গোল পার্থক্য এবং করা গোলের হিসাব মিলিয়ে তারা শেষ ৩২ নিশ্চিত করে। এই নতুন ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে শেষ রাউন্ডের ম্যাচগুলোর কৌশলে।
আগে কোনো দল গ্রুপে তৃতীয় হয়ে গেলেই প্রায় নিশ্চিত বিদায় নিতে হতো। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। একটি দল শেষ ম্যাচে ১-০ ব্যবধানে হেরে গেলেও আশা বেঁচে থাকে, কিন্তু ৩-০ ব্যবধানে হারলে সেটিই হতে পারে বিদায়ের কারণ। হয়েছেও তাই।
তাই এখন কোচরা শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত আক্রমণে যাওয়ার আগে দুইবার ভাবছেন। একটি অতিরিক্ত গোল হজম করাও পুরো টুর্নামেন্টের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। আবার অনেক দল শেষ দিকে মরিয়া হয়ে গোলের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ছে, কারণ একটি বাড়তি গোল তাদের গোল পার্থক্য কিংবা মোট গোলের হিসাবে এগিয়ে দিতে পারে।
এমনকি শৃঙ্খলাও এখন বড় ফ্যাক্টর। বিশ্বকাপের নিয়ম অনুযায়ী দুদলের পয়েন্ট, গোল পার্থক্য ও করা গোল সমান হলে ‘ফেয়ার প্লে’ পয়েন্ট বিবেচনায় আসে। অর্থাৎ হলুদ ও লাল কার্ডের সংখ্যাও শেষ পর্যন্ত নকআউটের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।
২০১৮ বিশ্বকাপে জাপান ও সেনেগালের মধ্যকার ভাগ্য নির্ধারণ হয়েছিল ফেয়ার প্লে পয়েন্টে। সেই স্মৃতি এখনও ফুটবলপ্রেমীদের মনে তাজা। ২০২৬ বিশ্বকাপের নতুন ফরম্যাটে এমন ঘটনা আরও বেশি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে গ্রুপ পর্বের শেষ দিনগুলো এখন যেন বিশাল এক গণিতের পরীক্ষাকেন্দ্র।
মাঠে খেলা চললেও ডাগআউটে কোচিং স্টাফের হাতে থাকে ক্যালকুলেটর, সাংবাদিকদের ল্যাপটপে খোলা থাকে বিভিন্ন সম্ভাবনার তালিকা, আর সমর্থকরা প্রতি মিনিটে খোঁজ রাখেন অন্য গ্রুপের স্কোরলাইনের।
৪৮ দলের বিশ্বকাপের উদ্দেশ্য ছিল আরও বেশি দেশকে বৈশ্বিক মঞ্চে সুযোগ দেওয়া। সেই লক্ষ্য পূরণ হলেও নতুন ফরম্যাট এনে দিয়েছে এক ভিন্ন নাটকীয়তা। এখানে শুধু জয়-পরাজয় নয়, একটি গোল, একটি সেভ, এমনকি একটি হলুদ কার্ডও হয়ে উঠতে পারে নকআউটের টিকেট কিংবা বিদায়ের কারণ।
সময়ের আলো/জেডি