২০২২ সালের জুলাই মাসে উদ্বোধন করা হয় রাজশাহী বিসিক শিল্পনগরী-২-এর। প্রায় চার বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও এই শিল্পনগরী এখনও ফাঁকা পড়ে আছে। এখানে মাত্র ২০ শতাংশ প্লট বরাদ্দ হয়েছে। এখনও ফাঁকা আছে ৮০ শতাংশ প্লট। তবে ওই ২০ শতাংশ প্লটেও সেভাবে গড়ে ওঠেনি কারখানা।
ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা বলছেন, বিসিক-২ এ নেই কোনো গ্যাস সংযোগ। এখানে পয়োনিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। আর প্লটের দামও তুলনামূলক বেশি। বিসিক কর্তৃপক্ষ বলছে, সমস্যার সমাধান করে এই শিল্পাঞ্চলকে উদ্যোক্তাবান্ধব করে তুলতে কাজ চলছে।
রাজশাহী মহানগরীর সপুরা এলাকায় বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের সমাধান না করেই ২০২২ সালে ১৫০ বিঘা জমিতে চালু করা হয় বিসিক শিল্পনগরী-২। গত চার বছরে ২৮৬টি প্লটের বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৭১টি। এর মধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে ৯টি। প্লট নেওয়ার পর বিভিন্ন সংকটের মুখোমুখি শিল্পোদ্যোক্তারা।
রাজশাহী বিসিকের দেওয়া তথ্যমতে, প্রায় ১৫০ কোটি টাকার এ প্রকল্পে ২৮৬টি শিল্প প্লট রয়েছে। এর মাধ্যমে ১০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উন্নয়নের লক্ষ্য ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত মাত্র ৭১টি প্লট বরাদ্দ হয়েছে। তবে শিল্প কার্যক্রম শুরু হয়েছে মাত্র তিনটি প্লটে। বরাদ্দপ্রাপ্ত প্লটগুলোর বেশিরভাগই পড়ে আছে ফাঁকা। সেখানে গজিয়ে উঠেছে জঙ্গল।
বিসিক কর্তৃপক্ষ বলছে, বড় উদ্যোক্তা বা মাঝারি উদ্যোক্তা যারা রয়েছেন তাদের এখানে বিনিয়োগ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। প্লটগুলো বুকিং হয়ে গেলে এখানে গ্যাস সংযোগসহ সব ধরনের সুবিধা দেওয়া হবে। অর্ধেক বুক করা হলেও আমরা আমাদের কার্যক্রম শুরু করতে পারি। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা আসছেন না।
ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সমিতির সদস্য সচিব সৈয়দ আহমেদ জাকী বলেন, প্রকল্পটি অপরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পুঁজি কম। তাই তারা বিনিয়োগেও আগ্রহী না।
ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন বা বিসিক কর্তৃপক্ষ বলছে, জেলায় দুই শিল্প অঞ্চলকে ব্যবসায়ীদের জন্য সহায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে। বিসিক আঞ্চলিক পরিচালক জাফর বায়েজীদ বলেন, এখন পর্যন্ত যে প্লটগুলো ফাঁকা রয়েছে দ্রুত সেগুলো কীভাবে বরাদ্দ দেওয়া যায় তা নিয়ে কাজ চলছে। উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আমরা নিজেরাও কাজ করছি। আশা করা যায়, দ্রুত এই কাজ শেষ করা হবে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের পাশাপাশি এখানে প্লটের জন্য আবেদন করতে পারবেন ৫০ কোটি মূলধনের মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তারাও।
রাজশাহী উইমেন চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি রোসেটি নাজনীন বলেন, প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য যে পরিমাণ পুঁজি দরকার তা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব না। ব্যাংকগুলোও এ প্রকল্পে ঋণ দিতে অনিচ্ছুক। ফলে এখানে কেউ আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সেখানে নারী উদ্যোক্তাদের কথা বলা হলেও কেউ আগ্রহী না। কারণ নারীদের পুঁজি একেবারে কম।
বিসিক-১-এর সমস্যা সমাধান না করেই বিসিক-২ চালু করা হয়েছে যা অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রাজশাহী জেলা সভাপতি আহমেদ শফি উদ্দিন। তিনি বলেন, রাজশাহীতে প্রকৃতপক্ষে একটি রফতানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) প্রয়োজন যা শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে পারে।
সরেজমিন বিসিক শিল্পনগরী ঘুরে দেখা গেছে, বিসিক-২ প্রধান ফটক পেরিয়েই রাখা হয়েছে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্লট। তবে সেখানে কোনো কার্যক্রম নেই। একটু সামনে এগুতেই দেখা মিলছে সারি সারি গাছের। প্রতিটি গাছে ফুটেছে ফুল। নেই কোনো কর্মচাঞ্চল্য। দূর থেকে দেখে বোঝার উপায় এটি শিল্পাঞ্চল নাকি বনভূমি!
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিসিকের যে সুবিধাগুলো থাকা দরকার সেগুলো কিছুই নেই এখানে। বলা হচ্ছে গ্যাস সংযোগ দেবে, কিন্তু কবে নাগাদ দিতে পারবে তাও আশ্বস্ত করতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। বিসিকে জমির যে দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে সেটির তুলনায় বাইরে কম দামে জমি পাওয়া যাচ্ছে।
ব্যবসায়ী মোহায়মিনুল হক বলেন, এখনও গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হয়নি। পানির লাইন আছে, কিন্তু সংযোগ নেওয়া যাচ্ছে না। আবেদন করলে তারা বলছেন, দেড় মাসের ভেতরে দিয়ে দেবেন। কিন্তু ৪৫ কার্যদিবসের জায়গায় বছর পার হয়ে গেলেও পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
আরেক ব্যবসায়ী জহিরুল ইসলাম বলেন, বিসিক-২ এ প্রতিষ্ঠান তৈরি করার জন্য সুযোগ-সুবিধা নেই। এখানে জমির দামও বেশি। এর ফলে ঢাকার বড় ব্যবসায়ীরা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। রাজশাহীতে আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে কোনো বড় উদ্যোক্তা এখানে আসতে আগ্রহী নন। এখানে কার্গো বিমান নামার মতো এয়ারপোর্টের ব্যবস্থা নেই। তাই এখানে বিনিয়োগে কেউ আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
সময়ের আলো/জেডি