স্টারমারের পতনের নেপথ্যে থাকা গোপন তথ্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

কিয়ার স্টারমার দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে বাধ্য হলেন। প্রচলিত পশ্চিমা গণমাধ্যমের বক্তব্য অনুযায়ী তিনি একজন

2026-06-28T04:33:39+00:00
2026-06-28T04:33:39+00:00
 
  রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬,
১৪ আষাঢ় ১৪৩৩
রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক
আরটির প্রতিবেদন
স্টারমারের পতনের নেপথ্যে থাকা গোপন তথ্য
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ২৮ জুন, ২০২৬, ৪:৩৩ এএম 
যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। সংগৃহীত ছবি
কিয়ার স্টারমার দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে বাধ্য হলেন। প্রচলিত পশ্চিমা গণমাধ্যমের বক্তব্য অনুযায়ী তিনি একজন ‘সৎ ও ভদ্র মানুষ’ ছিলেন, কিন্তু রাজনীতির কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারেননি। তবে তার পতনের নেপথ্যে থাকা সত্য আরও অন্ধকারময়। 

তার রাজনৈতিক জীবনের পেছনে লুকিয়ে আছে এমন কিছু ঘটনা ও সিদ্ধান্ত, যা তাকে একেবারে ভিন্ন চরিত্রে প্রকাশ করে। সেখানে সত্য লুকিয়ে রাখা, ক্ষমতাধরদের অপরাধ ঢেকে দেওয়া এবং সত্যপ্রকাশকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই ছিল তার মূল কাজ।

রুশ গণমাধ্যম আরটি ডটকমের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন স্টারমারের গোপন অধ্যায়গুলো সামনে এনেছে। স্টারমারের পরিচিতি তৈরি হয়েছিল মূলত ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিস বা সিপিএসের প্রধান হিসেবে কাজ করার সময়। সে সময় পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো বলেছিল, এখানে এসে তিনি এক সময়ের সংস্কারবাদী আইনজীবী থেকে পরিণত হন একজন সংযত ও সতর্ক প্রশাসকে। কিন্তু এই বর্ণনায় কখনোই উল্লেখ করা হয়নি যে, তার নেতৃত্বেই সংস্থাটি দেশের অনেক কুৎসিত ও কলঙ্কজনক ঘটনাকে আড়াল করে রেখেছে।

জিমি সাভাইলের অপরাধ ঢাকার দায় কার : 

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা ওঠে বিখ্যাত এবং একই সঙ্গে কুখ্যাত সেলিব্রিটি জিমি সাভাইলের ঘটনা নিয়ে। তিনি ছিলেন ব্রিটেনের তথাকথিত ‘জাতীয় সম্পদ’ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু মৃত্যুর পর প্রকাশ পায় যে কয়েক দশক ধরে তিনি অসংখ্য নাবালিকা ও দুর্বল নারীর ওপর যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণ করেছেন। সাভাইল জীবিত থাকাকালীনই পুলিশের কাছে বহু সাক্ষী বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ দাখিল করলেও সিপিএস কখনোই তার বিরুদ্ধে মামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি।

এই সময়টাতেই সিপিএসের প্রধান ছিলেন কিয়ার স্টারমার। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন সংসদে স্পষ্টভাবে স্টারমারকে দোষারোপ করে বলেছিলেন, তিনি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন, কিন্তু জিমি সাভাইলের মতো অপরাধীর (পেডোফাইল) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন না।

এই মন্তব্যের পর গোটা ব্রিটেনের রাজনৈতিক মহল ও মিডিয়া একযোগে জনসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে। তার নিজের দলের প্রধান উপদেষ্টাও পদত্যাগ করেন। চাপের মুখে মাত্র তিন দিনের মধ্যে জনসনকে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো জনসন যা বলেছিলেন, তা ছিল সম্পূর্ণ সত্য।

স্টারমার নিজেই ২০১২ সালে সাভাইলের ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দেন। ওই তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় যে, সিপিএসের একজন আইনজীবী শুরুতেই পুলিশকে বলেছিলেন এই অভিযোগগুলো ‘তেমন গুরুতর নয়’, তাই মামলা করার প্রয়োজন নেই। তিনি পুলিশের কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত তথ্যও জানতে চাননি।

তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান স্পষ্টভাবে বলেছে, যৌন নির্যাতন কখনোই সামান্য বিষয় নয়। সাভাইলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ছিল অত্যন্ত গুরুতর ও বিশ্বাসযোগ্য, যা বছরের পর বছর ধরে দুর্বল শিশু ও নারীদের ওপর চালানো হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যদি পুলিশ ও সিপিএস সঠিকভাবে তদন্ত ও মামলা তৈরি করত, তবে সাভাইলের বিরুদ্ধে মামলা করা সম্ভব ছিল।

কিন্তু এরপরই আরও চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ পায়। ২০১০ সালের অক্টোবর মাসেই সিপিএসের কাছে সাভাইল সম্পর্কে থাকা সমস্ত নথি ও প্রমাণপত্র ধ্বংস করে ফেলা হয়। প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী কোনো মামলা না হলেও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র অন্তত পাঁচ বছর সংরক্ষণ করার কথা থাকলেও, এখানে তা একেবারে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়। ফলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, সাভাইলের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তির অপরাধকে পুরোপুরি ঢেকে দেওয়ার জন্যই এই নথি ধ্বংস করা হয়েছিল।

সত্য দমনে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা : 

শুধু সাভাইলের ঘটনাই নয়, স্টারমারের নেতৃত্বে সিপিএসের আরেকটি কলঙ্কজনক কাজ হলো সত্যপ্রকাশক সংস্থা উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে মামলা ও হয়রানি। ২০১৭ সালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, স্টারমারের সময়কার সিপিএস ২০১৪ সালে সুইডিশ প্রসিকিউটরদের সঙ্গে অ্যাসাঞ্জ সম্পর্কে যেসব গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ ইমেইল আদান-প্রদান করেছিল, সেগুলোও মুছে ফেলা হয়। তখন অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে মামলা চলমান ছিল, ফলে এই নথি ধ্বংস করা আইনবিরোধী।


২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত এই যোগাযোগ চলেছিল, যার পর অ্যাসাঞ্জ ইকুয়েডরের লন্ডন দূতাবাসে আশ্রয় নেন। সেখানে প্রায় সাত বছর তাকে নজরদারিতে রাখা হয়, এমনকি সিআইএর হত্যার হুমকির মুখেও পড়তে হয়। অবশেষে ২০১৯ সালে ব্রিটিশ পুলিশ তাকে জোর করে দূতাবাস থেকে বের করে নিয়ে যায় এবং বেলমার্শ কারাগারে পাঠায়। সেখানে প্রায় পাঁচ বছর তাকে প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা হয়, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্পষ্ট উদাহরণ।

স্টারমারের পতনের পেছনে থাকা অন্ধকার অধ্যায় : 

এই সব ঘটনা একত্রিত করলে স্পষ্ট হয় যে, স্টারমারের রাজনৈতিক জীবন ছিল মূলত ক্ষমতাশালী শ্রেণির স্বার্থরক্ষায় নিয়োজিত। তিনি যখন সিপিএসের প্রধান ছিলেন, তখন তার কাজ ছিল প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষা করা এবং প্রভাবশালীদের অপরাধ প্রকাশ পেতে না দেওয়া।

পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তার পূর্বের এই ভূমিকাই তার পদের ভিতকে দুর্বল করে দেয়। প্রচলিত পশ্চিমা মিডিয়া তাকে ‘সৎ’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করলেও দলের ভেতর ও বাইরে ধীরে ধীরে সত্য প্রকাশ পেতে শুরু করে। দলের সদস্যরা বুঝতে পারেন যে, তিনি কোনো পরিবর্তন আনার মতো মানসিকতার নন। বরং তিনি পুরোনো ব্যবস্থার অংশ ছিলেন, যেখানে ন্যায়বিচারের চেয়ে ক্ষমতার স্বার্থ বেশি গুরুত্ব পায়।

সাম্প্রতিক সময়ে যখন তার নেতৃত্বের ব্যর্থতা প্রকাশ্যে আসে, তখন পেছনের এই কলঙ্কজনক ঘটনাগুলোও আবার সামনে চলে আসে। ফলে দলের ভেতর থেকে তার বিরুদ্ধে চাপ তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে। আরটির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটির শেষে বলা হয়, স্টারমারের পতন শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়। 

এটি প্রমাণ করে যে, ক্ষমতার শীর্ষে থাকলেও যারা সত্যকে লুকিয়ে রাখেন, অপরাধীদের রক্ষা করেন এবং নির্দোষ সত্যপ্রকাশকদের শাস্তি দেন, তাদের ভুয়া ভাবমূর্তি একদিন না একদিন ভেঙে পড়ে। প্রচারমাধ্যম যতই চেষ্টা করুক, মানুষের চোখ থেকে সত্যকে চিরদিন লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না।

সময়ের আলো/জেডি 



  বিষয়:   স্টারমার  পতন  নেপথ্যে  গোপন তথ্য 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: