ইউরোপে বাড়ছে মৃত্যুর হার, কতটা ঝুঁকিতে বাংলাদেশ?

খন্দকার ওবায়দুল্লাহ

জাতীয়

প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে যে জলবায়ুগত পরিবর্তন তৈরি হয়, সেটিই ‘এল নিনো’। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা

2026-06-28T18:00:15+00:00
2026-06-28T18:00:15+00:00
 
  শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬,
৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
এল নিনো
ইউরোপে বাড়ছে মৃত্যুর হার, কতটা ঝুঁকিতে বাংলাদেশ?
খন্দকার ওবায়দুল্লাহ
প্রকাশ: রোববার, ২৮ জুন, ২০২৬, ৬:০০ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে যে জলবায়ুগত পরিবর্তন তৈরি হয়, সেটিই ‘এল নিনো’। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, চলতি বছরের জুন থেকে আগস্টের মধ্যে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা প্রায় ৮০ শতাংশ। আর এরইমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে শুরু করেছে।

এরইমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া) নিশ্চিত করেছে, নতুন এল নিনো পর্ব শুরু হয়েছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বাকি সময়জুড়ে এর প্রভাব আরও শক্তিশালী হতে পারে এবং এটি ১৯৫০ সালের পর রেকর্ড হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোগুলোর একটি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নোয়ার হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান এল নিনো ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা ৬৩ শতাংশ। অনেক বিজ্ঞানী মনে করছেন, এটি অন্তত ২০২৭ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনো শুধু একটি আবহাওয়াগত অবস্থা নয়; এটি বৈশ্বিক তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, কৃষি, জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান বাস্তবতায় এল নিনোর প্রভাব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও জটিল ও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


ইউরোপে তাপপ্রবাহের নতুন সংকট

ইতোমধ্যে পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপ ভয়াবহ তাপপ্রবাহের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপের প্রায় ৮৫০টি বড় শহরের প্রায় অর্ধেকই ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ‘হিট স্ট্রেস’-এর মধ্যে রয়েছে। যুক্তরাজ্যের সমারসেটে জুন মাসেই রেকর্ড ৩৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।

চলমান তাপপ্রবাহে মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগজনক। ফ্রান্সের জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ হিসাবে, জুনের শেষ সপ্তাহে তীব্র গরমে দেশটিতে হাজার খানেক মৃত্যু হয়েছে। এর আগে স্পেনে একই তাপপ্রবাহে ৩২৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এর পাশাপাশি বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, একদিনেই ইউরোপে অন্তত ১০ কোটি মানুষ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার মুখোমুখি হয়েছেন। উল্লেখ্য, ২০২২ সালের গ্রীষ্মেও অতিরিক্ত গরমে ইউরোপে ৬০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

তবে গবেষকেরা বলছেন, এই তাপপ্রবাহের জন্য সরাসরি এল নিনো দায়ী নয়। এর প্রধান কারণ মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ পৃথিবীকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হচ্ছে। এল নিনো সেই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাওলো বলেছেন, ‘শক্তিশালী এল নিনো খরা ও অতিবৃষ্টির পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করবে এবং স্থলভাগ ও সমুদ্রে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়াবে।’


বাংলাদেশে কী হতে পারে?

ভৌগোলিক অবস্থান, ঘনবসতি এবং জলবায়ু ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশ এল নিনোর প্রভাবের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ইতোমধ্যে দেশে বৃষ্টিপাতের অস্বাভাবিক ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। জুন মাসকে বছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের মাস হিসেবে ধরা হলেও এবার মাসটির বেশিরভাগ সময় পর্যন্ত স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ বলেন, এল নিনোর প্রভাবে এ মৌসুমে বৃষ্টিপাত কিছুটা কমতে পারে এবং তাপমাত্রা বাড়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। তবে আগামী মাসগুলোতে তাপমাত্রা বা বৃষ্টিপাতের সুনির্দিষ্ট চিত্র এখনই বলা সম্ভব নয়।

জলবায়ুবিজ্ঞানীদের মতে, এল নিনোর প্রভাব বাংলাদেশে কতটা পড়বে তা নির্ভর করবে এর সময় ও শক্তির ওপর।

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. রাশেদ চৌধুরী বলেন, ২০২৬ সালের মৌসুমি বৃষ্টিপাতে এর প্রভাব মাঝারি মাত্রার হতে পারে। তার মতে, এল নিনো যদি গ্রীষ্মের শুরুতে নয়, বরং পরে শক্তিশালী হয়, তাহলে বাংলাদেশের ওপর এর প্রচলিত তীব্র প্রভাব— যেমন ভয়াবহ খরা বা বড় ধরনের মৌসুমি ব্যর্থতা আগের মতো নাও দেখা যেতে পারে।

তবে দীর্ঘ সময় বৃষ্টির ঘাটতি থাকলে খরা, তাপপ্রবাহ, পানির সংকট এবং কৃষিতে উৎপাদন হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র গরম ও বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়ে যেতে পারে।

ঢাকাভিত্তিক জলবায়ু থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের পরিচালক গোলাম রব্বানী বলেন, ‘অভিজ্ঞতা বলছে, এল নিনো থাকলে দেশের কিছু এলাকায় তাপপ্রবাহ ও খরাসদৃশ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি হয়ে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক এবং বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রাজিব কুমার সাহা বলেন, ‘এল নিনো থামানো সম্ভব নয়, কিন্তু এর অভিঘাত ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব।’

তিনি আরও বলেন, ‘দুর্বল মৌসুমি বৃষ্টি, দীর্ঘ খরা, তীব্র তাপপ্রবাহ এবং গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র–মেঘনা অববাহিকায় পানিপ্রবাহ কমে গেলে দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়ে যেতে পারে এবং নদীবাহিত সমতলভূমির স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।’


স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এল নিনোর প্রভাব শুধু আবহাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে জনস্বাস্থ্যের ওপরও। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে হিটস্ট্রোক, তীব্র পানিশূন্যতা এবং হৃদরোগসহ নানা শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

অন্যদিকে, কিছু এলাকায় অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার কারণে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হলে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ডায়রিয়া ও কলেরার মতো রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্যের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আগে নির্দিষ্ট বয়সভিত্তিক কিছু রোগ এখন বয়সের সীমা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে।

এদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে নতুন কোনো ভাইরাসেরও উৎপত্তি হতে পারে। এমনকি কিছু ভাইরাস ভবিষ্যতে মহামারি আকার ধারণ করতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।


ভারতের অবস্থা কী?

এল নিনোর প্রভাব ইতোমধ্যে ভারতের অর্থনীতিতেও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু, যা বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৭০ শতাংশ সরবরাহ করে, তা দুর্বল হয়ে পড়ছে।

ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জুনের প্রথম তিন সপ্তাহে দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় প্রায় ৪২ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। জুলাই দেশটির কৃষি মৌসুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হলে ধান, ডাল, তৈলবীজ ও তুলাসহ গুরুত্বপূর্ণ ফসলের উৎপাদন কমে যেতে পারে।

কৃষি ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১৫ শতাংশে অবদান রাখে এবং দেশের ৪০ শতাংশেরও বেশি মানুষের জীবিকা এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে কৃষি উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


এল নিনো কি বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে আরও বাড়িয়ে দেবে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনো নিজে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ নয়; এটি পৃথিবীর প্রাকৃতিক জলবায়ুগত চক্রের অংশ। সাধারণত একটি এল নিনো পর্ব শেষ হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে এবং কখনও কখনও এর বিপরীত অবস্থা ‘লা নিনা’ দেখা দেয়।

তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা আগের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে এল নিনো তৈরি হলে তার প্রভাবও আগের তুলনায় আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে। অনেক বিজ্ঞানীর ধারণা, মানবসৃষ্ট উষ্ণায়নের সঙ্গে মিলিত হয়ে ২০২৭ সাল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বিশ্ববাসীকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘এল নিনোর পরিস্থিতি উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীর আগুনে আরও জ্বালানি ঢালবে। এর প্রভাব আরও কঠিনভাবে আঘাত হানবে, আরও দূরে পৌঁছাবে এবং ভয়াবহ গতিতে সীমান্ত অতিক্রম করবে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনোকে একটি সাময়িক আবহাওয়াগত ঘটনা হিসেবে দেখলেও এর প্রভাব মোকাবিলায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে এল নিনোর প্রতিটি পর্ব আগের চেয়ে আরও বেশি অনিশ্চয়তা ও নতুন ঝুঁকি নিয়ে হাজির হচ্ছে।

সূত্র : জাতিসংঘ, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি


  বিষয়:   এল নিনো  ইউরোপ  মৃত্যুর হার  বাংলাদেশ  তাপমাত্রা 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: