আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল বা পর্তুগালের ম্যাচ হলেই ফিফার অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে খাঁটি বাংলায় পোস্ট দেখা যায়। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার ফেসবুক পেজে এমন পোস্ট দেখে হয়তো অনেকের মনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খায়।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, বিশ্ব ফুটবলের সদর দফতর বুঝি বাংলা ভাষা কিংবা বাংলা ট্রল পেজের ভাষা রপ্ত করে ফেলেছে কিংবা বাংলাদেশ ও এই অঞ্চলের ফুটবল উন্মাদনাকে ফিফা হয়তো কোনো বিশেষ বা বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে এই আবেগের নেপথ্যে রয়েছে এক বিশাল পেশাদার দল এবং আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধন।
ফিফার এই ‘বাংলা’ পোস্টগুলো আসলে বিশ্বজুড়ে তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পরিচালনার এক সুদূরপ্রসারী ও পরিকল্পিত কৌশলের অংশ। ফিফার পেজে এই বাংলা পোস্টগুলো কিন্তু বিশ্বজুড়ে সবার টাইমলাইনে প্রদর্শিত হয় না।
এটি মূলত ‘জিও-টার্গেটিং’ বা ‘কাস্টম পোস্ট’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে করা হয়। ফিফা যখন বাংলায় কোনো পোস্ট বা গ্রাফিক্স শেয়ার করে, তা মূলত বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা রাজ্যসহ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলা ভাষাভাষী দর্শকদের নির্দিষ্ট করেই পোস্ট করা হয়।
একইভাবে, ল্যাটিন আমেরিকার দর্শকদের জন্য স্প্যানিশ, মধ্যপ্রাচ্যের জন্য আরবি কিংবা আফ্রিকার নির্দিষ্ট অঞ্চলের জন্য তাদের স্থানীয় ভাষায় ভিন্ন ভিন্ন কনটেন্ট তৈরি করে ফিফা। ফলে, পর্তুগাল বা ব্রাজিলের একজন সমর্থক তার টাইমলাইনে নিজের ভাষার পোস্টটিই দেখতে পান, যা তার মনে গভীর আবেগ তৈরি করে।
সুইজারল্যান্ডের জুরিখে অবস্থিত ফিফার সদর দফতরে এই পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করার জন্য রয়েছে একটি বিশাল এবং দক্ষ সোশ্যাল মিডিয়া টিম। এই দলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের, বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষদের যুক্ত করা হয়েছে, যারা নিজ নিজ অঞ্চলের দর্শকদের মনস্তত্ত্ব, চলতি ট্রেন্ড ও ভাষার মারপ্যাঁচ খুব ভালো বোঝেন।
বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এর যুগে যেকোনো ভাষায় রূপান্তর বা কনটেন্ট তৈরি করা আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে গেছে। তবে কেবল যান্ত্রিক অনুবাদ নয়, স্থানীয় দর্শকদের আবেগকে ছুঁয়ে যেতে ফিফার এই টিমটি নিয়মিত বিভিন্ন দেশের ফুটবল ফেডারেশনের সোশ্যাল মিডিয়া উইংয়ের সঙ্গেও সমন্বয় বা কোলাবরেশন করে কাজ করে থাকে।
ফিফার এই আঞ্চলিক প্রচারণায় বাদ যায়নি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনও (বাফুফে)। বর্তমান সময়ে ফিফা বেশ কিছু কনটেন্ট বাফুফে’র সঙ্গে কোলাবরেশনে তৈরি করেছে।
এই বিষয়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের মিডিয়া ম্যানেজার সাদমান সাকিব জানান, আসলে ফিফার সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল করার জন্য একটি দক্ষ টিম আছে। তারাই সাধারণত এই ধরনের বৈচিত্র্যময় পোস্টগুলো করে থাকে। আর বর্তমান এআইয়ের যুগে বিভিন্ন ভাষায় পোস্ট করা বা কনটেন্ট তৈরি করাটা খুব কঠিন কিছুও না। তবে এবারের বিশ্বকাপে ফিফা কয়েকটা কাজ আমাদের সঙ্গে যৌথভাবে করেছে। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থাটি এমন অনেক সময়ই বিভিন্ন দেশের ফেডারেশনের সঙ্গে মিলে কাজ করে থাকে।
বিশ্বকাপ বা বড় টুর্নামেন্টগুলোতে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল উন্মাদনা এখন আর বিশ্বমঞ্চে অজানা নয়। ফিফা খুব ভালো করেই জানে, কীভাবে এই বিপুল দর্শকশ্রেণিকে তাদের প্ল্যাটফর্মে যুক্ত রাখতে হবে। তাই তো কখনো ‘ওস্তাদ হাজির’ কিংবা কখনো ‘মায়া লাগাইছে’র মতো শতভাগ দেশি ক্যাপশনে পোস্ট হয় ফিফার অফিশিয়াল পেজে। পর্দার পেছনের এই বিপণন কৌশল যেমন ফুটবলপ্রেমীদের বাড়তি আনন্দ দিচ্ছে, তেমনি ডিজিটাল মাধ্যমে ফুটবলের বৈশ্বিক আবেদনকেও নিয়ে যাচ্ছে এক অনন্য উচ্চতায়।
ফিফার এই বিপণন কৌশল যে শতভাগ সফল, তার প্রমাণ মেলে পোস্টগুলোর কমেন্ট বক্সে নজর দিলেই। বাংলায় পোস্ট হওয়া মাত্রই সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়েন হাজার হাজার বাংলাদেশি ফুটবলপ্রেমী। মুহূর্তের মধ্যেই লাইক, কমেন্ট আর শেয়ারের বন্যা বয়ে যায়। একেকটি পোস্টে রিঅ্যাকশনের সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় লাখের ঘর, আর শেয়ার হয় হাজার হাজার।
বাঙালি দর্শকদের এই বিপুল ‘অর্গানিক এনগেজমেন্ট’ ফিফার পেজের রিচ এক ধাক্কায় অনেক বাড়িয়ে দেয়। কমেন্ট বক্সে দর্শকরা যেমন ফিফাকে ধন্যবাদ জানান, তেমনি মজার মজার ট্রল ও মিম শেয়ার করে নিজেদের ভালো লাগা প্রকাশ করেন। বিশ্বমঞ্চে নিজের ভাষার এমন মূল্যায়ন বাংলাদেশি দর্শকদের প্রতিনিয়ত এই পেজটির প্রতি আরও বেশি আকৃষ্ট করে রাখছে।
সময়ের আলো/আআ