পদ্মাপাড়ের শান্ত ও স্নিগ্ধ শহর রাজশাহী। শিক্ষানগরী হিসেবে পরিচিত এই জনপদে এখন এক অদৃশ্য ও নীরব ঘাতকের থাবা ক্রমেই চওড়া হচ্ছে। লোকচক্ষুর অন্তরালে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গোপন নেটওয়ার্কে আর রাতের আঁধারে এখানে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে এইচআইভি (এইডস) সংক্রমণ। আর এই সংক্রমণের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন তরুণ সমাজ, যাদের একটি বড় অংশ সমকামী ও অনিরাপদ যৌন আচরণে অভ্যস্ত।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল, সিভিল সার্জন কার্যালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক নথি থেকে উঠে এসেছে এক শিউরে ওঠার মতো পরিসংখ্যান। ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত শুধু রাজশাহী জেলাতেই ১৩৯ জন এইচআইভি আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এদের মধ্যে ৯২ জনই সমকামী— যা মোট আক্রান্তের ৬৬ দশমিক ১৮ শতাংশ! চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, আক্রান্তদের বেশির ভাগের বয়স মাত্র ১৮ থেকে ২৬ বছরের মধ্যে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এইচআইভি সংক্রমণের এই উল্লম্ফনের পেছনে রয়েছে এক জটিল সামাজিক মনস্তত্ত্ব ও প্রযুক্তির ব্যবহার। শুধু অফলাইন বা মাঠপর্যায়ে নয়, ডিজিটাল দুনিয়াতেও ছড়িয়ে পড়েছে এই গোপন যোগাযোগের জাল। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন গ্রুপ। এই প্রযুক্তিনির্ভর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সদস্য সংগ্রহ ও ব্যক্তিগত যোগাযোগ চলে, যার ফলে আক্রান্তদের শনাক্ত করা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
ডিজিটাল দুনিয়া পেরিয়ে বাস্তবতার চিত্র আরও অন্ধকার। রাজশাহী নগরীর সি অ্যান্ড বি মোড় (শিমলা), কোর্ট স্টেশন, ডিঙাডোবা, ফুলতলাসহ পদ্মাপাড়ের বেশ কিছু নির্জন ও অন্ধকার এলাকায় রাতে সমকামীদের নিয়মিত জমায়েত ও গোপন কার্যক্রম চলে বলে স্থানীয়ভাবে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। অথচ প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে সচেতন মহলে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে ১২ হাজার ৮৫২ জন ব্যক্তি এইচআইভি পরীক্ষা করিয়েছেন, যার মধ্যে ১১৫ জনের পজিটিভ এসেছে। এর বাইরে সিভিল সার্জন কার্যালয় আরও ৩৪ জন সমকামী আক্রান্তের তথ্য দিয়েছে। দুই প্রতিষ্ঠানের তথ্য মেলালে দেখা যায়, সমকামী পুরুষদের পাশাপাশি তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর সদস্যরাও এই মরণব্যাধির ঝুঁকিতে রয়েছেন।
রামেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মো. মেহেদী হাসান ভূঁইয়া এই সংক্রমণের বৈজ্ঞানিক কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, পুরুষ সমকামীদের মধ্যে, বিশেষ করে রিসিভটিভ পার্টনারদের ক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক অনেক বেশি। এতে পায়ুপথে ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে, যা ভাইরাসটিকে সহজেই শরীরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। তবে শুধু সমকামিতা বা অনিরাপদ যৌন আচরণই নয়; পরীক্ষা ছাড়া রক্ত গ্রহণ, একই সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তির ব্যবহার কিংবা মাদকসেবীদের মাধ্যমেও এই ব্যাধি ছড়াচ্ছে।
এইচআইভির এই বিস্তৃতি কেবল রাজশাহী জেলাতেই সীমাবদ্ধ নেই; পুরো রাজশাহী বিভাগ জুড়েই বাজছে বিপৎসংকেত। বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, আট জেলায় মোট এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৯৪ জনে। এর মধ্যে- সিরাজগঞ্জে সর্বোচ্চ ৩১০ জন আক্রান্ত; রাজশাহীতে ১৩১ জন (মে মাস পর্যন্ত তথ্যে তা ১৩৯); বগুড়াতে ১০৯ জন; পাবনাতে ৭৮ জন; নওগাঁ ৬৫ জন; নাটোর ৪৩ জন; জয়পুরহাটতে ৩৭ জন; চাঁপাইনবাবগঞ্জ সর্বনিম্ন ২১ জন।
গত বছরের ডিসেম্বরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বহুল প্রতীক্ষিত অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) সেন্টার চালু হলেও রোগীদের ভোগান্তি পুরোপুরি কমেনি। পুরোনো অনেক রোগীর ফাইল এখনো বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রয়ে গেছে। ফলে ওষুধ ও নিয়মিত ফলোআপের জন্য অসুস্থ শরীর নিয়ে দূরপাল্লার যাতায়াত করতে হচ্ছে অনেককে, যা তাদের মানসিক ও আর্থিক অবস্থাকে আরও ভঙ্গুর করে তুলছে।
যদিও রামেক হাসপাতালের ফোকাল পারসন ডা. ইব্রাহিম মো. শরফ আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, পুরোনো রোগীদের ফাইল স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলছে এবং দ্রুতই সব রোগীকে রাজশাহী থেকে পূর্ণাঙ্গ সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
সময়ের আলো/কহু