মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ছেলে ও নাতির ছবি। আর সেই ছবির দিকে তাকিয়ে বারবার বিলাপ করেন এক অসহায় মা ‘আল্লাহ, আমার নাতি আর সন্তানকে কেন নিলে?’ চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার মরিয়মনগর ইউনিয়নের একটি পরিবারের প্রতিটি দিন এখন কাটছে শোক, কান্না আর স্মৃতির ভার বয়ে।
নাতি হারানোর শোক তখনও কাটেনি। এরই মধ্যে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তান, প্রবাসী মোহাম্মদ তানভীর (৩০), চিরবিদায় নিলেন। পরিবারের দাবি, মিথ্যা অপবাদ ও সামাজিক অপমানের মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিয়ের কিছুদিন পর তানভীরের ঘরে জন্ম নেয় এক পুত্রসন্তান। সন্তানের মুখ দেখতে তিনি প্রবাস থেকে দেশে ছুটে আসেন। কিন্তু সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। অসুস্থ হয়ে একমাত্র সন্তান মারা গেলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তানভীর। ছুটি শেষ হলেও তিনি বিদেশে ফিরে যেতে রাজি হননি। পরিবারের অনুরোধে ছুটি বাড়ানো হলেও সন্তানের মৃত্যুজনিত শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি।
পরিবার জানায়, ঘটনার আগের দিন একটি পারিবারিক অনুষ্ঠান শেষে রাত হয়ে যাওয়ায় তানভীর শ্বশুরবাড়িতে থেকে যান। পরদিন সকালে মাথাব্যথা অনুভব করলে তিনি শাশুড়ি পারভিন সুলতানাকে মাথায় বাম লাগিয়ে দিতে বলেন। এ সময় তার চাচা শ্বশুর জসীম উদ্দীন বিষয়টি নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। তানভীর বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেও এক পর্যায়ে বাকবিতণ্ডা হয় এবং তিনি নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন।
পরে বিকেলে ওই ঘটনাটি তানভীরের স্ত্রী ও মায়ের সামনে তুলে ধরা হলে তিনি নিজেকে চরম অপমানিত মনে করেন বলে দাবি পরিবারের। ঘটনার প্রত্যক্ষ বিবরণ দিতে গিয়ে তানভীরের শাশুড়ি পারভিন সুলতানা বলেন, ও আমাকে ‘আম্মু’ বলে মাথায় বাম দিতে বলেছিল। আমি নিজের সন্তানের মতোই মাথায় বাম দিচ্ছিলাম। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করা হয়।
পরিবারের এক আত্মীয় সাকিব জানান, ওই দিন বিকেলে তানভীর নিজের ফেসবুকে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন। পরে স্থানীয়দের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে পরিবারের সদস্যরা তাকে খুঁজতে শুরু করেন। কিন্তু তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে নদীর তীরবর্তী একটি গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এখন সেই ফেসবুক পোস্টই পরিবারের কাছে তানভীরের শেষ স্মৃতি। আর প্রতিদিন সেই পোস্ট ও ছবিগুলো দেখেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তার মা। তানভীর ছিলেন পরিবারের বড় ছেলে এবং একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার বাবা রফিক একটি বিদ্যালয়ের কেরানির চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। পুরো পরিবারের দায়িত্ব ছিল তানভীরের কাঁধে।
অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তানভীরের বাবা রফিক বলেন, আমার ছেলেকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আজ আমার ছেলে পৃথিবীতে নেই। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিচার চাই। প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেব।
প্রসঙ্গত, একমাত্র সন্তানকে হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে না পারা প্রবাসী মোহাম্মদ তানভীর (৩০) গত ২৭ জুন সামাজিক অপমান ও মানসিক চাপের অভিযোগের মধ্যে নিজের ফেসবুকে শেষ স্ট্যাটাস দেওয়ার কিছু সময় পর আত্মহত্যা করেন বলে দাবি পরিবারের।
এ বিষয়ে রাঙ্গুনিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহির উদ্দীন বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে চাচা শ্বশুর জসীম উদ্দীনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। ঘটনাটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। আলামত ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমানে অভিযুক্ত পলাতক রয়েছেন।
সময়ের আলো/জোই