যে হাতে পরম মমতায় অন্ধ বোনের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার কথা ছিল, যে কাঁধের ওপর ভর দিয়ে এক অসুস্থ বাবা বেঁচে থাকার স্বপ্নে দিন গুনছিলেন—সেই হাত, সেই শক্ত কাঁধ আজ নিথর, নিস্তব্ধ। পরিবারের সব আশা-ভরসার আলো জ্বালিয়ে রাখা ২০ বছরের টগবগে তরুণ মতিউর রহমান সাজ্জাদ আজ শুধুই এক অতীত নাম। ভাটিয়ারীর শিপইয়ার্ডের বিষাক্ত বাতাস এক নিমেষেই কেড়ে নিল একটি পরিবারের শেষ আশাটুকুও।
গত শুক্রবার সকালে ভাটিয়ারীর ‘ফেরদৌস স্টিল শিপ ইয়ার্ডে’ যখন হঠাৎ ছড়াল মরণঘাতী বিষাক্ত গ্যাস, তখন সেখান থেকে ভেসে আসছিল মৃত্যু ভয়ে কাতর কিছু মানুষের আর্তনাদ। এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ৯ জন অভাগা মানুষের একজন সাজ্জাদ।
অথচ এই শিপইয়ার্ড সাজ্জাদের নিজের কর্মস্থল ছিল না। পাশের এক অক্সিজেন প্ল্যান্টে সামান্য বেতনে কাজ করতেন তিনি। সেদিন সকালে সিলিন্ডার পৌঁছে দিতে এসেছিলেন ইয়ার্ডে। কিন্তু জাহাজের ভেতর থেকে বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার শুনে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি। নিজের প্রাণ বাঁচানোর কথা চিন্তা না কর, কেবল অন্য মানুষদের রক্ষা করতে নাভীর টানে ছুটে গিয়েছিলেন জাহাজের অন্ধকার পেটে। আর সেই বীরত্ব ও সহমর্মিতাই কাল হলো—অন্যদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসের তীব্র থাবায় নিজের শেষ নিঃশ্বাসটি ত্যাগ করলেন সাজ্জাদ।
সীতাকুণ্ডের দক্ষিণ সোনাইছড়ি ইউনিয়নের অসুস্থ মো. হানিফের একমাত্র প্রদীপ ছিলেন এই সাজ্জাদ। ঘরে জন্মপ্রতিবন্ধী বড় বোন আর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছোট্ট বোন শান্তা—কাউকে কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ না দিয়েই সাজ্জাদ পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে।
সাজ্জাদের এমন আকস্মিক আর মর্মান্তিক বিচ্ছেদে আজ ভারী হয়ে উঠেছে সীতাকুণ্ডের বাতাস। তার বাড়িতে এখন শুধুই কান্নার রোল। বাকরুদ্ধ বাবা আর দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বোনের আহাজারিতে ইটের দেওয়ালগুলোও যেন কেঁদে উঠছে।
কীভাবে মেনে নেবে এই পরিবার যে, সবাইকে বাঁচানো সেই চেনা মানুষটি আর কখনোই হাসিমুখে ঘরে ফিরবে না? সাজ্জাদ হয়তো বীরের মতো চলে গেলেন, কিন্তু এক নিমেষেই চিরতরে আঁধারে তলিয়ে দিয়ে গেলেন তার পুরো পরিবারটিকে।
সময়ের আলো/জোই