চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে শিপ ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর যখন চারপাশে আতঙ্ক ও শোকের ছায়া, তখন এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল গনি। বিষাক্ত গ্যাসের কারণে উদ্ধারকারীরা যেখানে ভেতরে ঢোকার সাহস পাননি, সেখানে নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে একে একে ৭টি মরদেহ উদ্ধার করে এনেছেন তিনি।
গত শুক্রবার সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন একাধিক শ্রমিক। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে সাইফুল গনি দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে শোনেন তার পরিচিত ও প্রতিবেশী কয়েকজন শ্রমিকের মরদেহ ট্যাংকের ভেতরে পড়ে আছে।
চারদিকে বিষাক্ত গ্যাসের আতঙ্ক থাকলেও সাইফুল স্থির থাকতে পারেননি। শিপইয়ার্ডের গেটের বাধা উপেক্ষা করে তিনি ভেতরে প্রবেশ করেন। কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন কর্মকর্তা মামুনের মতে, দুর্ঘটনাস্থল থেকে ক্রমাগত বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হওয়ায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ছাড়া তাদের পক্ষে ভেতরে ঢোকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কিন্তু সাইফুল গনি বিষাক্ত গ্যাসের চরম ঝুঁকি এবং কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা ছাড়াই স্থানীয় গ্রামবাসীদের সহায়তায় একে একে সাতজন শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসেন।
উদ্ধারকাজ শেষে সাইফুল অভিযোগ করেন, দুর্ঘটনার সময় শিপইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের কাউকেই ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। এমনকি উদ্ধারকাজ জোরদার করার জন্য কোনো অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি উদ্ধার সরঞ্জামের ব্যবস্থাও ছিল না।
এদিকে দুর্ঘটনাস্থলে চট্টগ্রাম বিস্ফোরক অধিদফতর ও ফায়ার সার্ভিসের তথ্যে কিছুটা ভিন্নতা পাওয়া গেছে। ফায়ার সার্ভিস ‘কার্বন মনোক্সাইড’ গ্যাসের কথা বললেও, বিস্ফোরক অধিদফতরের মতে ‘টক্সিক বিষাক্ত গ্যাস’-এর কারণে শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ট্যাংকে শ্রমিকদের নামানোর আগে ট্যাংক গ্যাসমুক্ত করা হয়েছিল কিনা এবং পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা ছিল কিনা—এসব নিয়ে নিরাপত্তা ঘাটতির প্রশ্ন তুলেছেন ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা।
সাইফুল গনির এই অসামান্য সাহসিকতার ঘটনা এখন পুরো এলাকায় প্রশংসিত হচ্ছে। গত শনিবার রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক আসলাম চৌধুরী এফসিএ। এ সময় সাইফুল তার জীবনবাজি রাখা উদ্ধার অভিযানের বর্ণনা দেন, যা শুনে উপস্থিত জনতা ও নিহতের স্বজনরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
স্বজন হারানোর এই গভীর বেদনার মাঝে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব না থাকা সত্ত্বেও প্রতিবেশীর প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে সাইফুল গনির এমন মানবিকতা সীতাকুণ্ডবাসীর হৃদয়ে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
সময়ের আলো/জোই