একটি ভোটকেন্দ্র, দুটি গ্রাম, আর দুই পক্ষের দুই রকম দাবি। একদল বলছেন, কেন্দ্র যেখানে আছে সেখানেই থাকুক। অন্যদল বলছেন, কেন্দ্র সরাতে চান না, তবে তাদের এলাকায় একটি উপকেন্দ্র চান। গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ৪ নম্বর জামালপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে এই টানাপড়েনে এখন উত্তেজনা বিরাজ করছে। মানববন্ধন, বিক্ষোভ, লিখিত আবেদন ও স্মারকলিপির পর বিষয়টি সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে এলাকায় গেছেন নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা।
বিরোধের কেন্দ্রে আছে আরাজী জামালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান ভোটকেন্দ্র। কেন্দ্রটি বহাল রাখার দাবি আরাজী জামালপুর গ্রামের ভোটারদের। ওয়ার্ডের চিকনি এলাকার বাসিন্দারা চান ভোটারদের যাতায়াতের দুর্ভোগ কমাতে চিকনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন একটি সাব-সেন্টার (উপকেন্দ্র) স্থাপন করা হোক।
দুই গ্রামের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানে স্থানীয় পর্যায়ে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। সেই মতবিরোধ কীভাবে দুই এলাকার সম্পর্কে ছায়া ফেলছে, তা ইতোমধ্যে স্পষ্ট।
বিষয়টি তদন্ত করতে সম্প্রতি ভোটকেন্দ্র এলাকা পরিদর্শন করেছেন রংপুরের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা দেলওয়ার হোসেন, গাইবান্ধার জেলা অতিরিক্ত নির্বাচন কর্মকর্তা শাহীনুল আলম ও সাদুল্লাপুরের উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা শাহারিয়ার প্রামাণিক। পরিদর্শনের সময় জামালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহিদ হাসান শুভ, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড সদস্য এবং স্থানীয় ভোটার ও সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে গত ১৭ আগস্ট গাইবান্ধার জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলামও এলাকাটি সরেজমিনে দেখে যান।
স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে দেলওয়ার হোসেন বলেন, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আরাজী জামালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে একটি ভোটকেন্দ্র আছে। চিকনি এলাকার ভোটাররা সেখানে নতুন একটি সাব-সেন্টার চেয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা সরেজমিনে এসে কেন্দ্র পরিদর্শন করেছি। কেন্দ্রটির অবকাঠামোগত বিষয় দেখা হয়েছে এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কথা বলে তাদের মতামত নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হবে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অর্থাৎ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। সেটি নির্ভর করছে কমিশনের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনের ওপর।
চিকনিতে সাব-সেন্টার স্থাপনের দাবি ওঠার পর আরাজী জামালপুর গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দেয়। এর প্রতিবাদে গত মঙ্গলবার দুপুরে এলাকার পাকা সড়কে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন স্থানীয় ভোটাররা।
তাদের বক্তব্য, আরাজী জামালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কেন্দ্রটি আরাজী জামালপুর, চিকনি এবং বড় জামালপুর কুটিপাড়ার আংশিক এলাকার ভোটারদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই কেন্দ্রে প্রায় ২ হাজার ৬০৯ জন ভোটার ভোট দেন। তাই কেন্দ্র বিভক্ত করে চিকনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন উপকেন্দ্র করার প্রয়োজন নেই বলে তাদের মত।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, একটি মহল নিজেদের স্বার্থে বর্তমান কেন্দ্রটি বিভক্ত করার চেষ্টা করছে।
চিকনি এলাকার ভোটারদের ভাষ্য ভিন্ন। তারা বলছেন, বর্তমান কেন্দ্র সরিয়ে নেওয়ার কথা তারা বলছেন না। তাদের দাবি, এলাকার ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুবিধার জন্য সেখানে একটি সাব-সেন্টার স্থাপন করা হোক। এ দাবিতে তারা ইতোমধ্যে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের কাছে লিখিত আবেদন ও স্মারকলিপি দিয়েছেন।
আবেদনে বলা হয়েছে, আরাজী জামালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কেন্দ্র থেকে চিকনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় আড়াই থেকে তিন কিলোমিটার। অনেক ভোটারকে কাঁচা ও নর্দমাযুক্ত গ্রামীণ রাস্তা দিয়ে কেন্দ্রে যাতায়াত করতে হয়। এতে বিশেষ করে বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, নারী ও গর্ভবতী ভোটারদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।
চিকনি এলাকার বাসিন্দাদের পক্ষে কেন্দ্র স্থাপনের আবেদনকারী মো. সেলিম সরকার মানিক ভোটার সংখ্যার একটি হিসাব তুলে ধরেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বড় জামালপুর কুটিপাড়া ও আরাজী, এই দুই এলাকা মিলিয়ে মোট ভোটার প্রায় ১ হাজার ২৫৪ জন। অন্যদিকে শুধু চিকনি এলাকাতেই ভোটার রয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৩৫৫ জন। অর্থাৎ একা চিকনিরই ভোটার সংখ্যা বাকি দুই এলাকার মিলিত সংখ্যার চেয়ে বেশি।
তিনি বলেন, ভোটার সংখ্যা ও যাতায়াতের দূরত্ব বিবেচনায় চিকনিতে সাব-সেন্টার হলে বিপুলসংখ্যক ভোটারের ভোটাধিকার প্রয়োগ আরও সহজ, নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন হবে।
সেলিম সরকার আরও জানান, এ দাবিতে আগেও উপজেলা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। সম্প্রতি জেলা নির্বাচন অফিস ও রংপুর আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ের কর্মকর্তারা এলাকা ও সম্ভাব্য কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। তার দাবি, এতে কর্মকর্তারা স্থানীয় ভোটারদের দুর্ভোগ ও বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন।
সেলিম সরকার মানিক অভিযোগ করেন, ভোটারদের সুবিধার জন্য সাব-সেন্টারের দাবি জানানো হলেও জামালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহিদ হাসান শুভ এতে বাধা দিচ্ছেন। তার দাবি, চেয়ারম্যান নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন এবং স্থানীয়দের ভুল বুঝিয়ে দাবিটি নস্যাৎ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চেয়ারম্যান মো. জাহিদ হাসান শুভ। তদন্তের সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘জামালপুর ইউনিয়নে নয়টি ওয়ার্ড রয়েছে। ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও ভোটার হিসেবে কারও প্রতি পক্ষপাতিত্ব করার সুযোগ নেই। স্থানীয় এলাকাবাসীসহ যারা কেন্দ্রের দাবি করছেন, তাদের সঙ্গে বসে আলোচনা করে বিষয়টির সমাধান করতে চেয়েছিলাম। তাদের আলোচনায় বসার জন্য ডাকলেও সাড়া পাইনি।’
তার ভাষ্য, ‘একটি মহল ভোটকেন্দ্র স্থানান্তরের চেষ্টা করছে। অথচ অতীতে চিকনি এলাকার ভোটাররা আরাজী জামালপুর কেন্দ্রেই সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিয়েছেন।’
এক পক্ষ চাইছে নতুন সাব-সেন্টার, অন্য পক্ষ চাইছে বর্তমান কেন্দ্র অটুট থাকুক। এই পাল্টাপাল্টি দাবিতে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ও গ্রহণযোগ্য সমাধান না হলে যেকোনো সময় দুই এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে বড় ধরনের সংঘাত বেধে যেতে পারে।
জামালপুর ইউনিয়নের বাসিন্দারা চান, ভোটারদের সুবিধা, যাতায়াতের দূরত্ব, কেন্দ্রের অবকাঠামো, স্থানীয় বাস্তবতা এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিক। আপাতত সবার দৃষ্টি রংপুরের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার পাঠানো প্রতিবেদনের দিকে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই ঠিক হবে, দুই গ্রামের এই বিরোধ কোন পথে গড়ায়।
সময়ের আলো/আতা