গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের জের ধরে সৃষ্ট উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পৌর শহরের চৌমাথা থেকে ৫০০ মিটার এলাকায় ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১৪৪ ধারা জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন। মঙ্গলবার (৩০ জুন) বিকেল ৪টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শেখ জাবের আহমেদ স্বাক্ষরিত একটি বিজ্ঞপ্তি মঙ্গলবার বিকেলে নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেন। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নির্ধারিত এলাকায় পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তির সমাবেশ, যেকোনো ধরনের অস্ত্র, লাঠি বা আগ্নেয়াস্ত্র বহন, স্লোগান বা মিছিল এবং শব্দবর্ধক যন্ত্র ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। তবে ১৪৪ ধারা চলাকালে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক থাকবে বলেও জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, পলাশবাড়ী উপজেলার বরিশাল ইউনিয়নে দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংঘটিত সংঘর্ষ এবং পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে চৌমাথা এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তাহানির আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এলাকায় ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার (২৯ জুন) রাতে উপজেলার বরিশাল ইউনিয়নের জুনদহ এলাকায় বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ বাধে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে রয়েছেন পলাশবাড়ী উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুস সামাদ মণ্ডল, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য মিল্লাত সরকার মিলন এবং পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শামিম রেজাসহ আরও কয়েকজন। প্রাথমিকভাবে তাদের পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হলেও পরে কয়েকজনের অবস্থার অবনতি হওয়ায় বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
সংঘর্ষের ঘটনায় উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা, ভাঙচুর ও আহত করার অভিযোগ তুলেছে। বিএনপির দাবি, তাদের নেতাকর্মীদের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়ে একাধিক নেতাকে গুরুতর আহত করা হয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সংঘর্ষের পর গভীর রাতে তাদের কয়েকজন নেতাকর্মীর বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়, যাতে তাদের পক্ষেরও কয়েকজন আহত হন। তবে কোনো পক্ষের অভিযোগই তাৎক্ষণিকভাবে স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এই সংঘর্ষের প্রতিবাদে মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় পলাশবাড়ী চৌমাথায় বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশের ঘোষণা দেয় উপজেলা বিএনপি। একই দিন, একই স্থানে পৃথক কর্মসূচির ডাক দেয় উপজেলা জামায়াতে ইসলামীও। দুই দলের কর্মসূচি একই সময়ে একই স্থানে হওয়ার খবরে এলাকাজুড়ে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ দেখা দেয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় মঙ্গলবার দুপুরেই বিষয়টি নিয়ে তৎপর হয় প্রশাসন। এ প্রসঙ্গে গাইবান্ধার অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার (প্রশাসন) শরীফ আল রাজীব (পিপিএম) বলেন, দুটি রাজনৈতিক দল একই স্থানে সমাবেশের ঘোষণা দেওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা অক্ষুণ্ণ রাখতেই প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারির সিদ্ধান্ত নেয়।
একই বিষয়ে পলাশবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সরোয়ার আলম খান বলেন, জামায়াত-বিএনপির সংঘর্ষের পর সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে চৌমাথা এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বক্ষণিক নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
১৪৪ ধারা চলাকালীন চৌমাথা থেকে ৫০০ মিটার এলাকায় যেকোনো ধরনের সভা, সমাবেশ, মিছিল ও গণজমায়েত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকলেও যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখা হয়েছে। সংঘর্ষের পর থেকে পলাশবাড়ী উপজেলাজুড়ে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন ও পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
সময়ের আলো/আতা