৬ বছরেও ফেরেনি সাইরেনের ডাক, জং ধরছে স্বপ্নে

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

এক সময় ভোর হতো এই মাটিতে সাইরেনের ডাকে। সেই ডাক শুনেই ঘুম ভাঙত মহিমাগঞ্জের, ছুটত আখ বোঝাই ট্রাক-ট্রলির সারি, চিমনি

2026-08-15T14:45:57+00:00
2026-08-15T14:57:45+00:00
 
  শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬,
৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
৬ বছরেও ফেরেনি সাইরেনের ডাক, জং ধরছে স্বপ্নে
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ২:৪৫ পিএম  আপডেট: ১৫.০৮.২০২৬ ২:৫৭ পিএম
রংপুর চিনিকল। ছবি : সময়ের আলো
এক সময় ভোর হতো এই মাটিতে সাইরেনের ডাকে। সেই ডাক শুনেই ঘুম ভাঙত মহিমাগঞ্জের, ছুটত আখ বোঝাই ট্রাক-ট্রলির সারি, চিমনি থেকে উঠত অবিরাম ধোঁয়া, বাতাসে ভাসত দেশীয় চিনির গন্ধ। আজ ছয় বছর হতে চলেছে, সেই সাইরেন আর বাজে না। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জে ঢুকতেই তাই চোখে পড়ে এক অদ্ভুত নীরবতা- বিশাল ফটক, দীর্ঘ প্রাঙ্গণ, সারি সারি পুরোনো স্থাপনা যেন থমকে আছে হারিয়ে যাওয়া এক সময়ে।

প্রায় ছয় বছর ধরে বন্ধ রংপুর চিনিকলের সঙ্গে স্তব্ধ হয়ে আছে হাজারো পরিবারের জীবিকার চাকা। যন্ত্র থেমেছে, কিন্তু থেমে যায়নি সময়ের ক্ষয়- প্রতিদিন একটু একটু করে জং ধরছে এখানকার স্বপ্নে।


১৯৫৪ থেকে ১৯৫৭ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত রংপুর চিনিকলে ১৯৫৭-৫৮ মৌসুমে শুরু হয় উৎপাদন। ১ হাজার ৯২৫ দশমিক ৩৫ একর জমির এই প্রতিষ্ঠান ছিল উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক হৃৎস্পন্দন। বার্ষিক ১৫ হাজার মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনক্ষম এই মিলকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল কৃষি, ব্যবসা, পরিবহন ও জনজীবনের পূর্ণাঙ্গ বলয়। সাতটি উপজেলার হাজার হাজার কৃষক আখ চাষ করতেন, মৌসুম এলেই মাঠে মাঠে শুরু হতো আখ কাটার উৎসব। ২০২০ সালের ২ ডিসেম্বর সেই স্পন্দনে হঠাৎ থেমে যায় ছন্দ- তৎকালীন সরকার আখ মাড়াই স্থগিত ঘোষণা করে, আর ফেরেনি চেনা সাইরেনের ডাক। এর আগে রংপুর চিনিকলে প্রথম লে-অফ বা উৎপাদন স্থগিত ঘোষণা করা হয় ২০০৪ সালের মার্চ মাসে। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের আগস্টে মিলটি পুনরায় চালু করা হয়েছিল।

আজ চিনিকলের মূল প্রাঙ্গণের ৩৫ একর কারখানা এলাকা আগাছা আর জঙ্গলের দখলে। খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা আখ পরিবহনের গাড়িগুলো মরিচায় ক্ষয়ে যাচ্ছে, কারখানার ভেতরে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি নিঃশব্দে অকেজো হয়ে পড়ছে দিনের পর দিন। এই জং শুধু লোহায় ধরেনি-ধরেছে মানুষের স্বপ্নেও।


মিল বন্ধ হওয়ার পর চুক্তিভিত্তিক ও মৌসুমি শ্রমিকদের জীবনে নেমে এসেছে নির্মম বাস্তবতা। অনেকে এখন ভ্যান চালান, দিনমজুরি করেন, কেউ কাজের সন্ধানে জেলা ছেড়েছেন। বহু পরিবারে সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ হয়েছে, ঘরে চিকিৎসার টাকা নেই। শ্রমিক নেতারা বলছেন, কেবল কারখানা বন্ধ হয়নি, বন্ধ হয়েছে বহু মানুষের স্বপ্ন ও মর্যাদা।

আখ চাষিদের অবস্থাও করুণ। একসময় নগদ অর্থকরী ফসলের প্রধান ভরসা আখ চাষ এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। এক প্রবীণ চাষির আক্ষেপ— মিল ছিল বলেই মাঠে আখ ছিল, ঘরে টাকা ছিল, বাজারে প্রাণ ছিল। এখন কিছুই নেই।


উৎপাদন বন্ধ, তবু বন্ধ নেই খরচ। প্রতি মাসে খরচ হচ্ছে প্রায় ২০ লাখ টাকা; গত ৬৮ মাসে বেতন-ভাতাসহ রক্ষণাবেক্ষণে সরকারের মোট ব্যয় প্রায় ১৪ কোটি টাকা। এখনো কর্মরত আছেন ৯২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। শুধু বেতনের প্রায় ১৪ কোটি টাকাই নয়, রোদ-বৃষ্টিতে ফেলে রাখায় শত কোটি টাকার যানবাহন-যন্ত্রপাতিও ধ্বংসের পথে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত ২০ হাজার মানুষের আয়ের পথ বন্ধ, যার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারেও।

শ্রমিক নেতা আবু সুফিয়ান সুজা বলেন, প্রায় ছয় বছরে কোটি কোটি টাকা খরচ শুধু নয়, অবহেলায় পড়ে থাকা শত শত কোটি টাকার সম্পদও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এই কারখানা সচল হলে সর্বস্তরের মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় মিলের বিশাল জমি নিয়েও তৈরি হয়েছে নানা দাবি-পাল্টা দাবি ও সামাজিক উত্তেজনা, যা অঞ্চলকে ঠেলে দিয়েছে জটিল অনিশ্চয়তার দিকে।

এই বাস্তবতার মধ্যেই সম্প্রতি আশার কথা শুনিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, দেশের বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো পুনরায় চালু করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, আর এই প্রক্রিয়ায় আখচাষি, শ্রমিক ও প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি লাভজনক পরিচালনা— এই তিন বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। তার ভাষায়, আমরা চাই, বন্ধ শিল্পকারখানাগুলো আবার উৎপাদনে ফিরুক, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করুক এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি নিয়ে আসুক।


মন্ত্রী জানান, দেশের অধিকাংশ চিনিকলের বয়স ৫০ থেকে ৭০ বছর পেরিয়েছে, তাই আধুনিকায়ন ও নতুন প্রযুক্তি ছাড়া কার্যকর পুনরুজ্জীবন সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, একটি কারখানা সচল থাকলে সরাসরি শ্রমিকের বাইরেও বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আরও অনেকের কর্মসংস্থান তৈরি হয়, যা দারিদ্র্য হ্রাসের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয়ভাবেও একই দাবি জোরালো। চিনিকলের ইনচার্জ মোহাম্মদ শাহিনুর ইসলাম বলেন, মাত্র ৭০-৮০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করলেই মিলটি পুরোদমে সচল করা সম্ভব। এতে প্রায় ১ হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি হবে, ২০ হাজার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি মিলবে।

গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন জানান, মিলটি দ্বিতীয় ধাপে চালুর সম্ভাবনা নিয়ে সরকারকে জানানো হয়েছে।

গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লা বলেন, মিলটি চালু হলে তা এলাকার জন্য ইতিবাচক হবে।

মহিমাগঞ্জের নীরব প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে মনে হয়, এখানে শুধু যন্ত্র থেমে নেই— থেমে আছে বহু মানুষের জীবনের সুর। প্রায় ছয়টি বছরে সাইরেন বাজেনি একবারও। শিল্পমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি এখন এই জনপদের মানুষের একমাত্র ভরসা- সাইরেন কি আবার বাজবে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে মহিমাগঞ্জ, খুঁজছে গাইবান্ধা।

সময়ের আলো/জোই



  বিষয়:   সাইরেন  ডাক  জং. স্বপ্ন  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: