রাতের আঁধারে বাঁশখালীর উপকূলীয় এলাকা ছনুয়া ও খানখানাবাদে পাচারকারী চক্র বাংলাদেশে তৈরি সিমেন্ট নৌপথে ফিশিং বোটে তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। গন্তব্য প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে বাঁশখালীর খানখানাবাদ ইউনিয়নের চৌধুরীঘাট এলাকায় পুলিশের অভিযানে সেই প্রস্তুতিতে ছেদ পড়ে। অভিযানে দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে একটি ওপেন কার্গো ট্রাক, একটি সিঙ্গেল কেবিন পিকআপ ও ৩৪ বস্তা ডায়মন্ড সিমেন্ট জব্দ করেছে পুলিশ।
গ্রেফতার দুজন হলেন কর্ণফুলী উপজেলার চরলক্ষ্যা এলাকার মো. হোসেনের ছেলে মো. আলী (২৭) এবং পটিয়া উপজেলার কোলাগাঁও ইউনিয়নের চাপড়ী গ্রামের আব্দুল আলিমের ছেলে তফজল আলী সোহেল (৩৭)।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বাঁশখালী থানার ওসি রবিউল হক ও অপারেশন অফিসার মো. আরিফ হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল চৌধুরীঘাট এলাকায় অভিযান চালায়। এসময় ট্রাকে করে আনা বাংলাদেশি ‘ডায়মন্ড’ ব্রান্ডের সিমেন্ট ইঞ্জিনচালিত ফিশিং বোটে তুলে নদীপথে পাচারের প্রস্তুতি চলছিল। ঘটনাস্থল থেকে দুইজনকে আটক করা হয় এবং পরে তাদের হেফাজত থেকে সিমেন্ট ও যানবাহন জব্দ করা হয়। গ্রেফতার দুজন ট্রাকের চালক-হেল্পার হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পাচার চক্রের সদস্যরা সটকে পড়ে।
নদীর ঘাটে ঘাটে পাচারের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, বাঁশখালীর উপকূলজুড়ে বঙ্গোপসাগর উপকূল ও সাঙ্গু নদীপথ ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে সিমেন্ট ও সার পাচারের একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। ছনুয়া ইউনিয়নের খুদুকখালী, খানখানাবাদের চৌধুরীঘাট, গণ্ডামারার খাটখালী, চাম্বলের বাংলাবাজার ঘাটসহ বিভিন্ন পয়েন্টকে পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব পণ্য উপকূলের বিভিন্ন ঘাটে জড়ো করে পরে নৌপথে পাচারের চেষ্টা করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সিমেন্ট ও সারের বিনিময়ে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে মাদকসহ অবৈধ পণ্য প্রবেশের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ফলে বাঁশখালী উপকূলের শান্ত নদীপথকে ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ।
ছনুয়ার দুটি বাড়ি থেকে আরও ৪৯৬ বস্তা জব্দ
এদিকে পৃথক ঘটনায় বৃহস্পতিবার দুপুরে ছনুয়া ইউনিয়নের খুদুকখালী গ্রামের মোহাজেরপাড়ার বেড়িবাঁধ সংলগ্ন জনৈক মৃত সোলতান আহমদের ছেলে জাহাঙ্গীর আলমের একটি ঝুপড়ি ঘর ও মৃত হাবিবুর রহমানের ছেলে নুরুল কবিরের বাড়িতে পৃথক অভিযান চালিয়ে আরও ৪৯৬ বস্তা সিমেন্ট জব্দ করেছে বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশ। যৌথ অভিযানে বাঁশখালী থানার ওসি রবিউল হক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন উপস্থিত ছিলেন। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে বাঁশখালী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সুভাষ পাল বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন।
অন্যদিকে চৌধুরীঘাটের ঘটনায় বাঁশখালী থানার অপারেশন অফিসার মো. আরিফ হোসেন বাদী হয়ে গ্রেফতার দুইজনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ৭ থেকে ৮ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় দ্য স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট, ১৯৭৪-এর ২৫(বি)/২৫(ডি) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
মোট ৫৩০ বস্তা সিমেন্ট জব্দ
বাঁশখালী থানার ওসি রবিউল হক বলেন, ছনুয়ার দুটি বাড়ি থেকে পৃথকভাবে ৪৯৬ বস্তা এবং খানখানাবাদের চৌধুরীঘাট থেকে ৩৪ বস্তাসহ মোট ৫৩০ বস্তা সিমেন্ট জব্দ করা হয়েছে। চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
উপকূলের লবণাক্ত বাতাস আর নদীর ঢেউ পেরিয়ে পণ্য যাওয়ার এই অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে বাঁশখালীর সাগরপথ ও নদীপথের নিরাপত্তা নিয়ে। দিনের আলোয় যে নদী জীবন ও জীবিকার পথ, রাতের আঁধারে সেই নদীপথই যদি হয়ে ওঠে চোরাচালানের গোপন করিডোর-তাহলে তার নেপথ্যের জাল কতটা বিস্তৃত, সেই উত্তর খুঁজছে এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সময়ের আলো/এনএন