শরণার্থী শিবিরের অন্ধকার কুঠুরি থেকে শুরু করে বিদেশের আধুনিক সেলাইয়ের আসর কিংবা জাদুঘরের প্রদর্শনী— বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ফিলিস্তিনি প্রবাসীদের কাছে ঐতিহ্যবাহী সূচিকর্ম ‘তাতরিজ’ এখন কেবলই কোনো আলংকারিক নান্দনিকতা নয়। এটি তাদের কাছে স্বদেশের হারিয়ে যাওয়া শিকড় খোঁজার মাধ্যম, আত্মপরিচয়ের দলিল এবং ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক নীরব সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ।
আরবি শব্দ ‘তাতরিজ’ বলতে সাধারণভাবে সূচিকর্ম বা এমব্রয়ডারি বোঝানো হলেও, ফিলিস্তিনি প্রেক্ষাপটে এটি একটি সামাজিক প্রথা, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মায়েরা তাদের সন্তানদের শিখিয়ে আসছেন। এই শিল্পের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে ২০২১ সালে ইউনেস্কো একে ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
লেবাননের শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া ৪৮ বছর বয়সী সামার কাবুলি জানান, এই তাতরিজ শিল্পের মাধ্যমেই তিনি তার বাবা-মায়ের মাতৃভূমির সুতো বুনছেন, যা তিনি কোনোদিন চোখেও দেখেননি। ১৯৪৮ সালের ‘নাকবা’ বা মহাবিপর্যয়ের সময় ইসরায়েলি বাহিনীর তাড়া খেয়ে ফিলিস্তিন থেকে লেবাননে পালিয়ে এসেছিল কাবুলির পরিবার। কৈশোরে অর্থনৈতিক জোগান দিতে এই কাজ শুরু করলেও, তাতরিজ এখন কাবুলির কাছে টিকে থাকা এবং গাজার বর্তমান পরিস্থিতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এক অনন্য ভাষা।
ঐতিহাসিকভাবে, ফিলিস্তিনি নারীরা তাদের ঐতিহ্যবাহী থোব বা পোশাকে চারপাশের পরিবেশ, বিশ্বাস এবং নির্দিষ্ট মোটিফের মাধ্যমে নিজেদের গ্রামের ইতিহাস লিখে রাখতেন। বেথলেহেমের ফিলিস্তিনি হেরিটেজ সেন্টারের পরিচালক মাহা সাকা বলেন, ‘তাতরিজ প্রতিটি ফিলিস্তিনি গ্রাম ও শহরে আমাদের উপস্থিতির জীবন্ত দলিল। আমরা সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে এই অবদমিত লড়াইটা চালিয়ে যাচ্ছি।’
বর্তমানে গাজায় চলমান ইসরায়েলি হামলা ও মানবিক সংকটের জেরে তাতরিজ শিল্পে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। গাজার মানুষের জন্য তহবিল সংগ্রহ এবং ছিটমহলটির ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে অনেকেই এই নকশা ব্যবহার করছেন।
লেবাননের ‘ইনাশ অ্যাসোসিয়েশন’ শরণার্থী শিবিরে থাকা ফিলিস্তিনি নারীদের তাতরিজের মাধ্যমে আয়ের সুযোগ করে দেওয়ার পাশাপাশি এই শিল্প রক্ষায় কাজ করছে। চরম বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মধ্যেও শিবিরের নারীরা ছাদে বসে গাজার মোটিফ দেওয়া টি-শার্ট বা স্কার্ফ তৈরি করছেন।
গাজা যুদ্ধের এই ভয়াবহ শোক প্রকাশ করতে ফ্যাশন ডিজাইনার হামা হিন্নাউই রঙিন সুতোর বদলে কালো কাপড়ের ওপর কালো সূচিকর্মের এক অভিনব ধারা তৈরি করেছেন, যা ধ্বংসযজ্ঞের প্রতি এক গভীর শোকের বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে, নিউইয়র্কের লিনা বারকাউইয়ের মতো প্রবাসীরা অনলাইন কমিউনিটি তৈরি করে ‘এখনই গাজাকে খাওয়ান’ সংবলিত বিশেষ নকশার মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করছেন।
প্রবাসে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের ফিলিস্তিনিদের কাছে তাতরিজ এখন আর কেবল সুই-সুতোর খেলা নয়; এটি তাদের বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যকার সেতুবন্ধন। মাতৃভূমি থেকে বঞ্চিত এই মানুষগুলোর কাছে বাড়ি ফেরার এক গভীর আশ্বাস।
সময়ের আলো/জেডি