কচু ও কচুর লতির জন্য দেশজুড়ে বেশ পরিচিত ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার রামপুর ইউনিয়ন। সবজি উৎপাদনের জন্য পরিচিত এ ইউনিয়নের কচু ও কচুর লতি এখন শুধু দেশের বিভিন্ন জেলায় নয়, বিদেশের ভোজনরসিকদের খাবারের প্লেটেও জায়গা করে নিচ্ছে। একসময় গরিবের খাবার হিসেবে পরিচিত কচু ও লতি চাষ এবং ব্যবসা করে এখন স্বাবলম্বী হচ্ছেন এলাকার অনেক কৃষক ও ব্যবসায়ী।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার রামপুর, সাখুয়া ও ত্রিশাল সদর ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি চাষ হয় ‘লতি রাজ’ জাতের কচু ও কচুর লতি। প্রতিদিন ভোর থেকে কৃষকরা ক্ষেত থেকে লতি সংগ্রহ করে পাইকারি বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে আসেন। রামপুর ইউনিয়নের গফাকুঁড়ি বাজার ও সাখুয়া ইউনিয়নের বাজারে প্রতিদিন দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে কচু ও কচুর লতির জমজমাট হাট। সেখানে পাইকাররা কৃষকদের কাছ থেকে মণ হিসেবে লতি কিনে দিনমজুর শ্রমিক দিয়ে বাছাই করান। এরপর লতিগুলো পুকুরের পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার করে ট্রাকে তোলা হয়।
সেখান থেকে ট্রাকযোগে কচু ও কচুর লতি ঢাকার কারওয়ান বাজার, মহাখালী কাঁচাবাজার, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, গাজীপুর, টঙ্গী, উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, ঢাকার পাইকারদের মাধ্যমে ত্রিশালের কচু ও কচুর লতির একটি অংশ বিদেশেও রপ্তানি করা হচ্ছে, যেখানে এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
প্রায় ১৫ বছর আগে কচুর লতির ব্যবসা শুরু করেন মকবুল হোসেন। শুরুতে এ ব্যবসা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চললেও বর্তমানে কচু ও লতির চাহিদা বাড়ায় তার জীবনযাত্রায় এসেছে বড় পরিবর্তন। ব্যবসার আয় দিয়ে সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ বহন করার পাশাপাশি জমিও কিনেছেন তিনি। এখন তার পরিবারে আর অভাব নেই।
মকবুল হোসেন বলেন, আমি কৃষকদের কচুর লতির ক্ষেত কিনে ঢাকার কারওয়ান বাজার, গাজীপুর, টঙ্গীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করি। আমাদের রামপুরের লতি ঢাকার পাইকাররা বিদেশেও পাঠায়। আমার ব্যবসায় ১৫ জন শ্রমিক কাজ করেন। এতে তাদেরও সংসার ভালোভাবে চলছে। লতি বিক্রি শেষ হলে পরে কচু বিক্রি করি।
কচু-লতির আরেক পাইকার নবী হোসেন বলেন, আমি বহু বছর ধরে কচু ও কচুর লতির ব্যবসা করছি। রামপুর ও সাখুয়ার কচু-লতি শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও বেশ পরিচিত। ঢাকার পাইকারদের কাছ থেকে জেনেছি, বিদেশেও এ লতির চাহিদা রয়েছে। রাজধানীর বাজারে অনেক ক্রেতাই সরাসরি ‘রামপুরের কচু’ ও ‘রামপুরের লতি’ চেয়ে থাকেন।
তিনি আরও বলেন, কৃষকরা ক্ষেত থেকে লতি তুলে আমাদের আড়তে নিয়ে আসেন। আমরা শ্রমিক দিয়ে লতি বাছাই করে পাঁচ কেজি করে আঁটি বাঁধি। এরপর পানিতে ধুয়ে পাইকারদের কাছে বিক্রি করি। বর্তমানে কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি মণ লতি ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় কিনে পাইকারি বাজারে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি করছি। লতি বিক্রি শেষ হলে কচু বিক্রি শুরু হবে। আমার আড়তে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক কাজ করেন।
স্থানীয় কৃষক ইউনুস আলী আজগর আলী জানান, কচুর ক্ষেত থেকে প্রায় তিন মাস লতি বিক্রি করা যায়। প্রতি সপ্তাহে লতি সংগ্রহ না করলে নতুন চারা ও আগাছা জন্মায়। আরও বলেন, ৬ কাঠা জমি থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৮ হাজার টাকার লতি বিক্রি হয়। মাসে প্রায় ৩২ হাজার টাকার লতি বিক্রি করি। লতি বিক্রি শেষ হলে কচু বিক্রির উপযোগী হয়ে ওঠে।
ঢাকার পাইকার আমজাদ হোসেন বলেন, আমি অনেক বছর ধরে এ বাজার থেকে কচু ও কচুর লতি কিনে ঢাকায় নিয়ে যাই। রাজধানীতে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ঢাকার পাইকারদের কাছ থেকে জেনেছি, এখানকার কচু ও লতি বিদেশেও রপ্তানি করা হয়।
উপজেলা ভারপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা হাম্মীম জাহান বলেন, ত্রিশাল উপজেলায় প্রায় ৫০০ একর জমিতে ‘লতিরাজ’ জাতের কচু ও কচুর লতির চাষ হচ্ছে। প্রতিবছর এসব জমি থেকে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার মেট্রিক টন কচু ও কচুর লতি উৎপাদিত হয়। রামপুরের কচু ও কচুর লতি সারা দেশে সুপরিচিত। এ এলাকাকে অনেকেই ‘সবজি গ্রাম’ নামে চেনেন। প্রতিদিন গফাকুঁড়ি বাজার থেকে ট্রাকভর্তি কচু ও কচুর লতি দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দেশীয় শাকসবজির প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রামপুরের কচু ও কচুর লতির চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একসময় অবহেলিত এ ফসল এখন এলাকার কৃষকদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদ, রোগবালাই দমন ও উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়ে কৃষি বিভাগ নিয়মিত পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।
সময়ের আলো/আতা