জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে উপকূলের মাছের প্রজননক্ষেত্রে। একসময় যে নদী-খাল ও মিঠাপানির জলাশয়ে পাওয়া যেত দেশি মাছের সমাহার, সেসব জলাশয়ের পানির চরিত্র বদলে যাচ্ছে। কোথাও বাড়ছে লবণাক্ততা, কোথাও নদীর মিঠাপানির প্রবাহ কমছে।
ফলে বদলে যাচ্ছে মাছের বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র। একই সঙ্গে লবণাক্ত পানির ওপর নির্ভরশীল চিংড়ি চাষেও দেখা দিচ্ছে নতুন ঝুঁকি। আর কৃষিজমি ও চারণভূমিতে লবণাক্ততার বিস্তার ঘটায় সংকট বাড়ছে গবাদিপশুর খাবারেও। বাগেরহাটে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত তাই এখন শুধু কৃষি বা পানীয় জলের সংকটে সীমাবদ্ধ নেই। মৎস্য, চিংড়ি ও প্রাণিসম্পদ তিনটি খাতই একই সঙ্গে জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
মৎস্য অধিদফতরের নিজস্ব মূল্যায়নেও বাগেরহাটকে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় নিয়ে আলাদা জলবায়ু ঝুঁকি ও ঝুঁকি প্রবণতা মূল্যায়ন এবং জলবায়ু সহনশীলতা কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। বাগেরহাটের নদী, খাল, বিল ও পুকুরের পানি লবণাক্ত হওয়ার অন্যতম বড় কারণ উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও নদীর মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ার সঙ্গে মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।
গ্রিন ক্লাব অব বাংলাদেশের (জিসিবি) সাধারণ সম্পাদক ও নৌপথ বিশেষজ্ঞ আশীষ কুমার দে বলেন, লবণাক্ততা বৃদ্ধির প্রভাব শুধু বাজারে বিক্রি হওয়া মাছের পরিমাণ দিয়ে মাপা যাবে না। নদী ও জলাশয়ের পুরো বাস্তুতন্ত্রের ওপর এর প্রভাব পড়ে। মিঠাপানির উদ্ভিদ ও জলজ প্রাণীর অনেক প্রজাতি লবণাক্ততার প্রতি সংবেদনশীল।
সাম্প্রতিক গবেষণাতেও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত লবণাক্ততার কারণে উপকূলীয় নদীর মিঠাপানির জলজ উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যে নেতিবাচক পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ পানির লবণাক্ততা বাড়ার অর্থ শুধু একটি প্রজাতির মাছ কমে যাওয়া নয়, বরং ধীরে ধীরে একটি জলজ পরিবেশের চরিত্রই বদলে যাওয়া।
বাগেরহাট বাংলাদেশের চিংড়ি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। বাগদা ও গলদা দুই ধরনের চিংড়িই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জলজ সম্পদ। মৎস্য অধিদফতরের বার্ষিক প্রতিবেদনেও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে বাগেরহাট-খুলনা-সাতক্ষীরাকে বাগদা চাষের প্রধান অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু চিংড়ির জন্য লবণাক্ত পানি যতটা প্রয়োজনীয়, লবণাক্ততার মাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামা ততটাই বিপজ্জনক। চিংড়ি রফতানি আয় স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর বিস্তারের সঙ্গে পরিবেশগত প্রশ্নও রয়েছে। লবণাক্ত পানি দীর্ঘ সময় জমিতে থাকলে মাটির লবণাক্ততা বাড়তে পারে।
এতে ধান, সবজি ও ঘাস উৎপাদন কঠিন হয়। ফলে একই এলাকায় একদিকে চিংড়ি উৎপাদনের অর্থনীতি শক্তিশালী হচ্ছে, অন্যদিকে গবাদিপশুর খাদ্য উৎপাদনের জমি সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এলাকার বিশিষ্টজনরা।
বাগেরহাটে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে কম আলোচিত প্রভাবগুলোর একটি হলো গবাদিপশুর খাদ্য সংকট। লবণাক্ততা বাড়লে অনেক ধরনের ঘাস ও পশুখাদ্য উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়। চারণভূমি ও ফসলের জমি কমে যাওয়ায় খামারিকে বাজার থেকে খড়, ঘাস, ভুসি ও অন্যান্য খাদ্য কিনতে হয়। এতে গবাদিপশু পালন ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরও গুণগত মানসম্পন্ন খাদ্যের অপ্রতুলতাকে মাঠপর্যায়ের খামারিদের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উপকূলের খামারিদের সমস্যা তাই দ্বিমুখী। একদিকে ঘাস উৎপাদনের জমি কমছে, অন্যদিকে বাজার থেকে খাদ্য কিনতে হচ্ছে বেশি দামে।
ফলে গরু পালন করে লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। খাদ্য সংকটের কারণে ছোট খামারিরা গরুর সংখ্যা কমিয়ে দিতে বাধ্য হলে এর প্রভাব পড়তে পারে দুধ ও মাংস উৎপাদনেও।
বাগেরহাটের স্থানীয় বাস্তবতা তুলে ধরে ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’-এর খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী পরিবেশবিদ শেখ নূর আলম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা বাড়ার পাশাপাশি অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ কৃষির পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তার মতে, ধান ও সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে।
তিনি বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পাশাপাশি চিংড়ি চাষের জন্য খাল কেটে লবণাক্ত পানি আনার ফলে আশপাশের মিঠাপানির উৎসও লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, বাগেরহাটে মৎস্য, চিংড়ি ও প্রাণিসম্পদের সংকট আলাদা কোনো তিনটি সমস্যা নয়। এগুলো একই সঙ্গে পানি ও জমি ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও যুক্ত। নদীতে মিঠাপানি কমলে লবণাক্ততা বাড়ে। লবণাক্ততা বাড়লে মিঠাপানির মাছের আবাস সংকুচিত হয়।
একই সময়ে লবণাক্ত পানি চিংড়ি চাষে প্রয়োজন হলেও এর অতিরিক্ত ওঠানামা উৎপাদন ঝুঁকি বাড়ায়। আর জমির লবণাক্ততা বাড়লে ঘাস ও গোখাদ্য উৎপাদন কমে গিয়ে গবাদিপশু পালন ব্যয়বহুল হয়। এ কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি হিসাব করার সময় শুধু ফসলের উৎপাদন কমেছে কি না এই একটি সূচক দিয়ে পরিস্থিতি বোঝা যাবে না।
সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে দেশের উপকূলের জনজীবনে সংকট প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অভিযোজন প্রক্রিয়া বাড়াতে হবে।
সময়ের আলো/এসএকে