জয়পুরহাট সরকারি কলেজের মাঠে চলমান ফুটবল টুর্নামেন্টের অনুষ্ঠানে দাওয়াত না দেওয়াকে কেন্দ্র করে খেলা বন্ধের দাবিতে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। এ সময় ঝাড়ু হাতে অধ্যক্ষের কক্ষে প্রবেশ, শিক্ষকদের সঙ্গে হট্টগোল এবং এক শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনাও ঘটেছে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে জয়পুরহাট সরকারি কলেজে এ ঘটনা ঘটে। কলেজ শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠলেও তা অস্বীকার করেছেন সংগঠনটির নেতারা।
কলেজের শিক্ষক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সকালে ‘জুলাই-আগস্ট স্মৃতি আন্তঃবিভাগ ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬’এ রসায়ন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের মধ্যে খেলা চলছিল। এই খেলায় কলেজ শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের দাওয়াত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ এনে অধ্যক্ষের সাথে কথা বলতে কক্ষে যান তারা। অধ্যক্ষের কক্ষে থাকা কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে তাদের কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এসময় একজন ঝাড়ু হাতে অধ্যক্ষের কক্ষে প্রবেশ করেন। ঘটনার সময় কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের আবু বক্কর সিদ্দিক নামে এক শিক্ষার্থীকে মারধর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে জয়পুরহাট সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর এ.কে.এম শফিকুল ইসলাম বলেন, কয়েকজন ছাত্র এসে বলল, স্যার, আপনার সঙ্গে কথা বলব। আমি বলছি, বেশ ভালো কথা। তখন আমার সঙ্গে কয়েকজন শিক্ষক ছিলেন। তারা (ছাত্ররা) বলল, না স্যার, শুধু আপনার সঙ্গে কথা বলব। আমি বললাম, ঠিক আছে। তখন শিক্ষকদের বাইরে পাঠিয়ে দিলাম। তারা কয়েকজন কথা বলবে, বলার পর আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী বলবা, বলো। তারা বলল, স্যার, কেমন আছেন? আমি বললাম, হ্যাঁ, ভালো আছি। এরমধ্যে দেখি, এক ছাত্র একটা ঝাড়ু নিয়ে ঢুকছে।
তিনি বলেন, ঝাড়ু নিয়ে ঢোকা দেখে বাইরে থাকা শিক্ষকরা হুট করে ভেতরে চলে এসে জিজ্ঞেস করলেন, এ, তুমি ঝাড়ু নিয়ে ঢুকছো কেন? এই নিয়ে শুরু। বারবার জিজ্ঞেস করা হলো, তুমি ঝাড়ু নিয়ে ঢুকলা কেন? এখন ছাত্ররা আবার তাকে সেভ করার জন্য গালে একটা থাপ্পড় বোধহয় মেরেছে এবং মেরে বাইরে বের করে দিল। এই নিয়ে হট্টগোল শুরু হলো। ঝাড়ু নিয়ে ঢোকা দেখে আমি বাইরে চলে গেছি। কারণ আমার কাছে মনে হলো এটা কোনো এগ্রেসিভ মনোভাব। এরমধ্যে দেখি ভাঙচুর শুরু হয়ে গেছে। এই হলো আমার জানা ঘটনা।
অধ্যক্ষ প্রফেসর এ.কে.এম শফিকুল ইসলাম স্পষ্ট করে জানান, মাঠের খেলা বন্ধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তিনি বলেন, তাদের মূল বক্তব্য ছিল- খেলা বন্ধ করে দেন। আমি বললাম, খেলা বন্ধ করব মানে? প্রধানমন্ত্রী বলছেন খেলা চালাতে। মাঠে খেলা সবসময় চলবে। আমি তো প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুসরণ করছি। আবার আমাদের কাছে চিঠিও আসছে, মাউশি (মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর) থেকেও চিঠি আসছে। এমনকি এখানকার স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ গত বৃহস্পতিবার খেলা উদ্বোধন করে গেছেন এবং তারাও বলেছেন যে এই মাঠে খেলা সবসময় চলতে হবে। তারা মাঠটা সংস্কারের কথাও বলে গেছেন। আর এরা (উত্তেজিতরা) বলছে, খেলা বন্ধ করে দেন। আমি বললাম, খেলা বন্ধ করা তো আমাদের পক্ষে সম্ভব না। এই শেষ।
হামলাকারীরা কারা- এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যক্ষ বলেন, ছাত্র, আমি জানি তারা ছাত্র। এখন কারা ছাত্র, সেটা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারব না। এখানে গ্লাস, ফুলের টব, মঞ্চের টেবিল ভাঙচুর করা হয়েছে।
হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি জিএম আরেফিন। তিনি বলেন, আমরা কয়েকজন অধ্যক্ষ স্যারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। এ সময় কয়েকজন শিক্ষক ও ছাত্রলীগের লোকজন আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন। কলেজে এখনও আওয়ামী লীগের দোসর এবং গুপ্ত শিবিররা প্রশাসনিক দায়িত্বে রয়েছে। আমাদের দাবি একটাই আগামী সাত দিনের মধ্যে তাদেরকে সব অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কলেজ থেকে বিতাড়িত করতে হবে।
কলেজ শাখা ছাত্র শিবিরের সভাপতি ফরহাদ আলী বলেন, স্যার আমাদের ওইভাবে দাওয়াত করেননি। রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে কোনো দাওয়াত দেওয়া হয়নি। এটি নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই। স্যারেরা বলেছেন, তোমরা ছাত্র হিসেবে খেলা উপভোগ করবে। আজ খেলা চলার সময় আমাদের এক ভাই খেলা দেখছিল। হঠাৎ করে অধ্যক্ষ স্যারের কক্ষের গ্লাস ভাঙার শব্দ শুনতে পেয়ে তিনি এগিয়ে যান। কিন্তু তারা (ছাত্রদল) আমাদের ভাইকে মারধর করেছেন।
জয়পুরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। কলেজের পক্ষ থেকে এখনও কোনো অভিযোগ ও মামলার আবেদন করা হয়নি। এখন কারা এর সঙ্গে জড়িত সেটি কলেজ কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে। আমরা অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।
সময়ের আলো/আতা