দেশে চলতি বছর চা উৎপাদনের টার্গেট ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি। বিপরীতে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে পাঁচ কোটি ৮০ লাখ কেজি চা উৎপাদন হয়েছে। গেল সেপ্টেম্বর মাসের উৎপাদনের তথ্য এখনও সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে গত বছরের সেপ্টেম্বরের চেয়ে এবার বেশি উৎপাদন হবে বলে চা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
অন্য দিকে টার্গেট পূরণ না হলেও এবার গত বছরের চেয়ে বেশি চা উৎপাদন হবে বলে জানান বাগান মালিকরা। তারা বলছেন, চা শিল্পের প্রসারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে নানা প্রস্তাব দিলেও ঝুলে আছে। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে দেশে চা শিল্পের আরও প্রসার হবে।
চা বোর্ড সূত্র জানায়, সারা দেশে ১৭২টি নিবন্ধিত চা বাগান আছে। চট্টগ্রামে আছে ২২টি চা বাগান। এর মধ্যে ১৭টি রয়েছে ফটিকছড়ি উপজেলায়। বাকি বাগানগুলোর মধ্যে রাঙ্গুনিয়ায় তিনটি বাঁশখালীতে ১টি ও কাপ্তাইয়ে ১টি বাগান রয়েছে। দেশে সিলেট অঞ্চলে চা বাগান সবচেয়ে বেশি।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির হালদা ভ্যালী টি এস্টেটের মালিক নাদের খান সময়ের আলোকে বলেন, আমাদের বাগানে উৎপাদন ভালো হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিমান্ড কমেছে। উৎপাদন বেশি হওয়ায় অতিরিক্ত মজুদ হয়ে গেছে চা। বাগান মালিকদের পক্ষ থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রস্তাবের ব্যাপারে ইতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
ফটিকছড়ির চৌধুরী টি এস্টেটের মালিক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চা বাগান সম্প্রসারণের জন্য আমরা সহজ সুদে কৃষিঋণ চেয়েছিলাম। যাতে চা বাগানগুলোর পরিধি বাড়ানো যায়। কিন্তু কৃষি ঋণের প্রস্তাব এখনও আলোর মুখ দেখেনি। কৃষিঋণ পেলে চা উৎপাদন আরও বাড়তে পারে। সম্প্রসারণ করা যেত চা বাগান।
মাসভিত্তিক চা উৎপাদন পরিস্থিতি জানতে বাংলাদেশ চা বোর্ডের জনসংযোগ ও শ্রমকল্যাণ কর্মকর্তা রাজিবুল হাসানকে কয়েকবার ফোন দেওয়া হলেও রিসিভ করেননি।
চা বোর্ডের গবেষণা কর্মকর্তা নাজমুল আলম বলেন, চা বাগানগুলোতে উৎপাদন পরিস্থিতি এবার সন্তোষজনক। আশা করছি চলতি বছর চা উৎপাদন ভালো হবে। চলতি বছর আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ কোটি ৮০ লাখ কেজি চা উৎপাদন হয়েছে। এভাবে উৎপাদনের ধারা অব্যাহত থাকলে আশা করি আমাদের টার্গেট পূরণ হবে।
অনুকূল আবহাওয়ার কারণে বাগানে বেড়েছে উৎপাদন। নিয়মিত নিলামে বিকিকিনি চলছে বেশ। চলতি বছর প্রথম আট মাসে চট্টগ্রামের চা বাগানগুলোতে গত বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশের বেশি চা উৎপাদিত হয়েছে।
চা বাগান মালিক ও উৎপাদকদের সংগঠন চা সংসদের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চট্টগ্রাম অঞ্চলের ২২টি চা বাগানে চলতি বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মোট ৬১ লাখ ৫৫ হাজার ৮১ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। বিগত বছরের তুলনায় যা ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালে একই বাগানগুলোর মোট উৎপাদন ছিল ৫২ লাখ ৫৬ হাজার ৯৮১ কেজি।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের চা বাগানগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ১০টি বাগানেই উৎপাদিত হয়েছে ৫০ লাখ কেজির বেশি চা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৯ লাখ ৬৩ হাজার ৫১২ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে কর্ণফুলী চা বাগানে। সিটি গ্রুপের মালিকানাধীন ৬ হাজার ৫৭২ একর আয়তনের এই বাগানটিকে এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ চা বাগান হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। উৎপাদনের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে শতভাগ ক্লোন চা বাগান হালদা ভ্যালী টি এস্টেট। সেখানে আট মাসে ৬ লাখ ৩৪ হাজার ৪০১ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। তৃতীয় সর্বোচ্চ চা উৎপাদিত হয়েছে নেপচুন চা বাগানে। দেশের খ্যাতনামা করপোরেট গ্রুপ এম এম ইস্পাহানী লিমিটেডের মালিকানাধীন এই বাগানে আগস্ট পর্যন্ত মোট উৎপাদিত চায়ের পরিমাণ ৬ লাখ ৫ হাজার ১৮০ কেজি। এ ছাড়া উদালিয়া চা বাগানে ৫ লাখ ৭৩ হাজার ১০৮ কেজি, বারমাসিয়া চা বাগানে ৫ লাখ ৩২ হাজার ৮৯৯ কেজি, খৈয়াছড়া ডলু চা বাগানে ৪ লাখ ১৬৮ কেজি, রাঙ্গাপানি চা বাগানে ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৩৬২ কেজি, রামগড় চা বাগানে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৯৫২ কেজি, কোদালা চা বাগানে ৩ লাখ ৯ হাজার ৬২১ কেজি ও চানপুর বেলগাঁও চা বাগানে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৪৫ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে।
অনুকূল আবহাওয়া বিশেষ করে আগাম বৃষ্টির কারণে উৎপাদন এবার বেশি হয়েছে বলে মনে করছেন বাগান মালিকরা। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, রাঙ্গুনিয়া, বাঁশখালীসহ এ অঞ্চলের চা গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি হয়েছে। সাধারণত বছরে ৬০ থেকে ১০০ ইঞ্চি বৃষ্টিপাতের প্রয়োজন হয়। আবার টানা তিন মাস অনাবৃষ্টি বা খরা থাকলে চায়ের নতুন কুঁড়ি জন্মানো বাধাগ্রস্ত হয়। তবে এবার আগাম বৃষ্টির পাশাপাশি ধারাবাহিক বৃষ্টিপাত চা উৎপাদনে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। এ জন্য উৎপাদনে ইতিবাচক চিত্র দেখা গেছে।
এদিকে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি চায়ের ভালো দর উঠছে নিলাম বাজারে। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের শেখ মুজিব রোডে আন্তর্জাতিক চা নিলামকেন্দ্র এখন জমজমাট। প্রতি সপ্তাহের সোমবার নিয়মিত চা নিলামে বেড়েছে চায়ের চাহিদা। ইস্পাহানী, টিকে গ্রুপ, সিটি গ্রুপসহ দেশের বৃহৎ পরিসরের কোম্পানি ও পাইকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই নিলামে অংশ নিয়ে থাকে।
চা বোর্ড সূত্র জানায়, চলতি নিলামবর্ষে চট্টগ্রাম নিলাম বাজারে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২০টির বেশি নিলাম অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব নিলামে চায়ের গড় মূল্য উঠেছে প্রতি কেজি ২৮০ দশমিক ৮৮ টাকা। সর্বশেষ ২৮ সেপ্টেম্বর এক চা নিলামে ৯ লাখ কেজির বেশি চা বিক্রি হয়। টাকার অঙ্কে এসব চায়ের মূল্য ২৫ কোটি ৫৪ লাখ ৮৬ হাজার টাকা।
বোর্ডের ঊর্ধ্বতন বিপণন কর্মকর্তা আহসান হাবিব বলেন, সেপ্টেম্বর মাসের বাগানের চা উৎপাদন তথ্য পেতে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে সেপ্টেম্বরে বেশ ভালো চা উৎপাদন হয়েছে বলে আমরা জানি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চা সংসদের তিন প্রস্তাব : বাংলাদেশ চা সংসদ নামে চা বাগান মালিকদের একটি সংগঠন আছে। এই সংগঠন মালিকদের পক্ষে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি সরকারের কাছে বিভিন্ন দাবি-প্রস্তাব পেশ করে। গত দুই বছর আগে চা সংসদের পক্ষ থেকে তিন দফা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। এর মধ্যে আছে যেসব বাগানে চা হবে না সেখানে অন্য আইটেমের ফলমুল চাষাবাদের অনুমতি দেওয়া, প্রতিবেশী দেশ ভারতের মতো টি এস্টেটে রিসোর্টের অনুমতি দেওয়া এবং সরকারের কাছ থেকে চা বাগানের জন্য লিজ নেওয়া জমির মধ্যে প্রতিটি বাগান মালিককে ৩৩ একর জমির মালিকানা দেওয়া।
এ ব্যাপারে হালদা ভ্যালী টি এস্টেটের মালিক নাদের খান বলেন, মালিকদের লিজে নেওয়া যেসব বাগানে চা হয় না সেখানে অন্য ধরনের ফলমুল চাষাবাদের অনুমতিসহ তিনটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এসব প্রস্তাবে সাড়া মেলেনি। জমি পড়ে থাকার চেয়ে অন্য ফলমুলের চাষ করলে মালিক, সরকার এবং দেশের জনগণ সবাই লাভবান হবে।
ভারতের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে টি স্টেট বা চা বাগানে রিসোর্ট করার অনুমতি আছে। কিন্তু দেশের চা বাগানগুলোতে রিসোর্টের অনুমতি নেই। রিসোর্ট করার অনুমতি দেওয়া হলে অবকাশ যাপনের অন্যতম একটি জায়গা হবে চা বাগান।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জোই