চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় অনুমোদন ছাড়াই চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা, বেসরকারি ক্লিনিক ও ল্যাবরেটরি (নিয়ন্ত্রণ) আইন লঙ্ঘন এবং অনুমোদনবিহীন ফুড সাপ্লিমেন্ট বিক্রি ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অপরাধে তিনজনকে বিভিন্ন মেয়াদে বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযানে জব্দ করা ফুড সাপ্লিমেন্ট ধ্বংস করা হয়েছে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে আলমডাঙ্গা পৌর এলাকার মিয়াপাড়ায় অভিযান চালিয়ে এ দণ্ড দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাহীনুর আক্তার। অভিযানে সহযোগিতা করেন আলমডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. আশিক আহমেদ।
দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার মহেশপুর প্রাণিসম্পদ অফিস রোড এলাকার সিরাজুল ইসলামের ছেলে হুমায়ন কবীর সিরাজী, আলমডাঙ্গা উপজেলার ডম্বরপুর গ্রামের মোজাম আলীর ছেলে আব্দুর রহমান এবং কুষ্টিয়ার হরিশংকরপুর (বর্তমানে মজমপুর) এলাকার মহসিন আলীর ছেলে মাসুদ করীম।
অভিযান সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আব্দুর রহমান আলমডাঙ্গা শহরের মিয়াপাড়ায় একটি ফ্ল্যাটবাড়ি ভাড়া নিয়ে তিয়ানশি বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেডের ফুড সাপ্লিমেন্ট বিক্রির কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। সেখানে মাসুদ করীম বিভিন্ন রোগ ও শারীরিক সমস্যা নিয়ে রোগীদের ‘ক্লাস’ নিতেন। পরে রোগীদের বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা শনাক্ত ও চিকিৎসার কথা বলে হুমায়ন কবীর সিরাজীকে সেখানে আনা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, হুমায়ন কবীর নিজেকে চিকিৎসক হিসেবে উপস্থাপন করে রোগীদের হাতে দুটি যন্ত্র দিয়ে হালকা বৈদ্যুতিক শক ও ভাইব্রেশন দেওয়ার পাশাপাশি ল্যাপটপে মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের ছবি দেখিয়ে রোগ নির্ণয়ের দাবি করতেন। পরে রোগীদের তিয়ানশি স্বাস্থ্য সম্পূরক খাদ্যপণ্য ও থেরাপি গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হতো।
এভাবে রোগীদের বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কথা বলে ১৭ ধরনের ফুড সাপ্লিমেন্ট ও থেরাপির কথা জানানো হতো। এসব পণ্য ও থেরাপি নিতে রোগীদের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো বলে জানা গেছে। নতুন রোগীদের কাছ থেকে নেওয়া হতো ১ হাজার ২০০ টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন গ্রামের সাবেক ও বর্তমান ইউপি সদস্য এবং প্রভাবশালী নারীদের মাধ্যমে ওই প্রতিষ্ঠানে রোগী সংগ্রহ করা হতো। রোগীপ্রতি তাদের কমিশন দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। প্রায় তিন মাস ধরে সেখানে এ ধরনের কার্যক্রম চলছিল বলে স্থানীয়রা জানান। তারা আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহে এ চিকিৎসা পরিচালনা করেন।
শনিবার দুপুরে স্থানীয় কয়েকজন ওই প্রতিষ্ঠানে গিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম ও ব্যবহৃত পণ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে সেখানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে স্থানীয়রা বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানান। খবর পেয়ে ইউএনও শাহীনুর আক্তার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. আশিক আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে যান।
অভিযানে প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও কাগজপত্র পরীক্ষা করা হয়। এ সময় অনুমোদন ছাড়াই চিকিৎসাসেবা পরিচালনা এবং বেসরকারি ক্লিনিক ও ল্যাবরেটরি (নিয়ন্ত্রণ) আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি ধরা পড়ে। একই সঙ্গে অনুমোদনবিহীন ফুড সাপ্লিমেন্ট বিক্রি ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পরে বিভিন্ন ফুড সাপ্লিমেন্ট জব্দ করে সেগুলো ধ্বংস করা হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালতে মেডিকেল প্র্যাকটিস এবং বেসরকারি ক্লিনিক ও ল্যাবরেটরি (নিয়ন্ত্রণ) আইন লঙ্ঘনের দায়ে হুমায়ন কবীর সিরাজীকে চার মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। আর অনুমোদনবিহীন ফুড সাপ্লিমেন্ট বিক্রি ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অপরাধে আব্দুর রহমান ও মাসুদ করীমকে দুই মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং প্রত্যেককে ৫ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। এসময় আলমডাঙ্গা পৌরসভার স্যানেটারি ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান রানা এবং আলমডাঙ্গা থানার এসআই শাহারিয়ার হোসেন রুবেল সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে উপস্থিত ছিলেন।
অভিযান সংশ্লিষ্টরা জানান, চিকিৎসাসেবা দেওয়ার নামে অনুমোদনহীন কার্যক্রম পরিচালনা এবং অনুমোদনবিহীন পণ্য বিক্রির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার সুযোগ রয়েছে। এ ধরনের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
সময়ের আলো/আতা