বাংলাদেশে বর্তমানে হাতে গোনা জীবন্ত কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পীদের মধ্যে সৈয়দ আব্দুল হাদী অন্যতম। তিনি বাংলাদেশের সংগীত জগতে এক ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। সংগীতের ইতিহাসের পাতায় তিনি উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে রবেন।
তিনি হতে পারতেন ভালো একজন শিক্ষক। হয়েছিলেনও কিছু সময়ের জন্য- জগন্নাথ কলেজে বাংলার শিক্ষক। কিন্তু তা বেশি দিন করেননি। টেলিভিশনের প্রযোজক হিসেবেও কিছু সময়ের জন্য কাজ করেছেন, কিন্তু সেখানেও স্থায়ী হননি। তবে গানের সঙ্গে সমন্বয় করে আজীবন সরকারি চাকরি করেছেন। সর্বশেষ তিনি ছিলেন জাতীয় গ্রন্থাগারের পরিচালক। এত কথা বলার কারণ- সংগীত তাকে ছোটবেলা থেকেই টেনেছে। সুরের টানেই তিনি পার করেছেন পুরোটা জীবন আর তাই তো তিনি সংগীতভুবনে কিংবদন্তি একজন- সৈয়দ আব্দুল হাদী।
আজ ১ জুলাই এই কিংবদন্তি শিল্পীর জন্মদিন। ৮৭ বছর বয়সে পদার্পণ করতে যাচ্ছেন তিনি। জন্মদিন উপলক্ষে ২৬ জুন শিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদীর বারিধারা বাসায় আলাপচারিতা করা হয়। সেই আলাপচারিতার চুম্বক অংশটুকু রইল আনন্দ সময়ের পাঠকদের জন্য :
ষাট দশকের শিল্পীর গাওয়া গান এখন আর শোনা যায় না কেন?
এর প্রধান কারণ হচ্ছে যুগের পরিবর্তন। মানুষের জীবন ধারা থেকে শুরু করে সবকিছুতেই পরিবর্তন এসেছে। জীবনের দ্রুত গতির পরিবর্তনের সঙ্গে গান শোনার পরিবর্তন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। নজর নেই পুরোনো গানের দিকে। এখন সবাই চায় ভাইরাল হতে। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একই অবস্থা। আর যারা গান গাইছেন তাদের মধ্যে হাতে গোনা শিল্পী ছাড়া সবাই গায়ক হতে চায়। শিল্পী হতে চায় না। তবে হ্যাঁ, সময়ের কথা বিবেচনা করতে হবে। ক্ল্যাসিক্যাল যুগ আর নেই। গান বেশি হচ্ছে। সবার সুদৃষ্টি দেওয়া যায় না। শিল্পী হয়ে ওঠার জন্য শিল্পবোধ ও সৃজনশীলতাকে গায়কির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
সবার মধ্যে ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা কেন ?
দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে- জাতিগতভাবে আমাদের মধ্যে শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসার বোধহয় ঘাটতি রয়েছে।
আপনি কি মনে করেন একজন কণ্ঠশিল্পীর দ্বৈত সত্তা রয়েছে, বিশেষ করে যারা চলচ্চিত্রে গান করেন?
যখন বেতারে বা টেলিভিশনে গান গাওয়া হয় তখন তো শিল্পীর ইমোশন কাজ করে। আর যখন চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দেন তখন তো সেই কণ্ঠ অভিনেতার হয়ে যায়। কারণ সেই কণ্ঠের মধ্য দিয়ে ছবির দৃশ্যটি ফুটিয়ে তুলতে হবে।
আপনি তো সংগীত পরিচালক সুবল দাসের সঙ্গে কাজ করেছেন। তো আপনি কেন সংগীত পরিচালক হলেন না?
আমাকে সুবল দাসই শিল্পী হওয়ার পরার্মশ দিয়েছেন। কারণ সংগীত পরিচালক হলে হয়তো গান গাওয়া হতো না। তবে সংগীত পরিচালক হিসেবে সত্য সাহা, খন্দকার নূরল আলম, আজাদ রহমান, খান আতাউর রহমান গান গেয়েছেন এটাও ঠিক।
সৈয়দ আব্দুল হাদী এমন কোনো গীতিকার ও সুরকার নেই যে, যার সুরে বা যার লেখায় গান করেননি। এমনকি কমল দাশগুপ্তের সুরেও গান গেয়েছেন। সংগীতভুবনে সৈয়দ আব্দুল হাদী সব গীতিকার ও সুরকারের কাছে গ্রহণযোগ্যতার এক আশ্চর্য প্রদীপ হয়ে উঠেছিল। তারই ধারাবাহিকতায় আপনার কাছে জানতে চাই- কোন সুরকার আপনার কাছে খুব ভালো মনে হয়েছে?
সবাই আমার কাছে প্রিয়। তবে আমার কাছে আলাউদ্দিন আলীকে একটু ব্যতিক্রম মনে হয়েছে। বাংলাদেশে এমন সুরকার সত্যি খুব কম আছে। আসলে আমি যাদের সুরে গান গেয়েছি তারা সবাই নিজ নিজ স্থানে যোগ্য। বেতারের আব্দুল আহাদ, রাজা হোসেন খান, খন্দকার নূরুল আলম, কাদের জামেরী সত্যি খুবই ভালো সুরকার।
আপনি তো বাংলা আধুনিক গানের পাশাপাশি অসংখ্য চলচ্চিত্রে গান করেছেন। এছাড়া দেশাত্মবোধক গানও গেয়েছেন। গান গেয়ে কত টাকা পেয়েছেন?
আমি কখনো টাকার জন্য গান করিনি। গান গেয়ে যা পেয়েছি তাই নিয়েছি। গান গেয়ে তৃপ্তিবোধটাই আমার কাছে বড় পাওয়া।
তবে গান গাওয়া ছেড়ে দিলেন কেন?
এখনকার যে ধরনের গান হচ্ছে তাতে মন আর সায় দেয় না। ৬৫ বছর ধরে গান গেয়েছি। আর কত? আমাদের যুগটা গেছে স্বর্ণ যুগ। এখন এমন সময় আমরা পার করছি যখন দেখছি গান গাওয়ার জন্য মানুষের প্রয়োজন হবে না। এআই আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে। আলাপচারিতার এক পর্যায়ে জানালেন, নিজের স্মৃতিচারণামূলক জীবনের বেড়ে ওঠার একটি বই লিখেছেন, যা চতুর্থ সংস্করণ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে।
তিনি একুশে পদক নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও, মনে করেন শ্রোতা-দর্শকের ভালোবাসাপ্রাপ্তি জীবনের বড় পাওয়া। সত্তর দশকের এই শিল্পী অনেক গান গেয়েছেন, যা এখন তার কাছে নেই। সেসব গানের মধ্যে রয়েছে, রাত শুধু নিঝুম এই রাত, যেওনা সজনী গো এমন করে, অলকে ছুটে যাই দেখি যে তুমি নেই, কিছু বলো কিছু বলো, এসো কিছুটা সময় রেখে যাই ইত্যাদি। জীবন্ত এই কিংবদন্তির জন্মদিনে সময়ের আলোর পরিবারের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা।
সময়ের আলো/এসএকে