একসময় ফ্যাশন বা স্টাইল মানেই ছিল নামিদামি ব্র্যান্ডের শোরুমে গিয়ে পছন্দের পোশাক বা অনুষঙ্গটি কিনে নেওয়া। কিন্তু সময়ের চাকা ঘুরেছে। তরুণ প্রজন্মের কাছে ফ্যাশন মানে শুধু ব্র্যান্ডের লোগো নয়, ফ্যাশন মানে নিজের ব্যক্তিত্ব, রুচি আর ভাবনার বহিঃপ্রকাশ। আর এই বহিঃপ্রকাশের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে ‘কাস্টমাইজেশন’। ল্যাপটপ, স্মার্টফোন, হেডফোন থেকে শুরু করে নিত্যদিনের ব্যবহারের মগ, ব্যাগ, কিংবা পার্স- সবকিছুতেই এখন তরুণরা ফুটিয়ে তুলছে নান্দনিক প্রিন্ট, ডিজিটাল গ্রাফিক ডিজাইন এবং হ্যান্ডপেইন্ট। লাইফস্টাইলের এই নতুন ধারাটি কেবল একটি ট্রেন্ড নয়, বরং এটি তরুণদের নিত্যদিনের ফ্যাশন।
কেন এই কাস্টমাইজেশন : ঢাকার রাস্তায় হাঁটলে কিংবা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে তাকালে প্রায়ই চোখে পড়ে ল্যাপটপের পেছনে রিকশা পেইন্টের ডিজাইন, হেডফোনে প্রিয় ব্যান্ডের লোগো, কিংবা ক্যানভাস ব্যাগে কোনো বিখ্যাত সিনেমার উক্তি। তরুণদের এই রূপান্তরের পেছনে কাজ করছে মূলত তিনটি বিষয়। প্রথমত অনন্য বা ইউনিক হওয়ার আকাক্সক্ষা। বাজারে হাজারটা ল্যাপটপ বা ফ্লাস্কের ডিজাইন হয়তো একই রকম। তরুণরা সেই ভিড়ে হারিয়ে যেতে চায় না। তারা চায় তাদের ব্যবহৃত জিনিসটি যেন কেবল তাদেরই গল্প বলে।
দ্বিতীয়ত সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন। পপ কালচার, অ্যানিমে বা নেটফ্লিক্সের সিরিজের পাশাপাশি বাংলাদেশের তরুণরা তাদের শিকড়কেও ভুলে যায়নি। তাই তো আধুনিক গ্যাজেটে অনায়াসে জায়গা করে নিচ্ছে ঐতিহ্যবাহী রিকশা আর্ট, জামদানি মোটিফ কিংবা লোকশিল্পের আল্পনা।
তৃতীয়ত সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের যুগে তরুণরা তাদের সৃজনশীলতা প্রদর্শন করতে ভালোবাসে। নিজের হাতে রাঙানো একটি কফি মগ বা কাস্টমাইজড ব্যাগের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় মুহূর্তেই প্রশংসা কুড়ায়, যা অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করে।
গ্যাজেট ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস স্মার্টফোন, ল্যাপটপ বা ব্লু-টুথ স্পিকার এখন আর কেবল প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয় না, এগুলো হয়ে উঠেছে লাইফস্টাইলের অংশ। বাংলাদেশের তরুণরা এখন তাদের ল্যাপটপের ব্যাক কাভারে বাহারি গ্রাফিতি ব্যবহার করছে। এসব স্কিনে থাকছে সাইবারপাঙ্ক থিম, মিনিমালিস্টিক জ্যামিতিক নকশা কিংবা প্রিয় কোনো চরিত্রের গ্রাফিক ইলাস্ট্রেশন। এমনকি হেডফোন বা ইয়ারবাডসের কেসেও এখন মেটালিক পেইন্ট বা মিনি গ্রাফিক্সের কাজ দেখা যাচ্ছে। গেমার তরুণদের মধ্যে তাদের গেমিং পিসি, মাউস ও কিবোর্ডে কাস্টম কালার ও গ্রাফিক্স করানোর প্রবণতা দারুণভাবে বাড়ছে। এটি একদিকে যেমন ডিভাইসটিকে স্ক্র্যাচ থেকে রক্ষা করে, অন্যদিকে তেমনি দেয় একটি প্রিমিয়াম ও ব্যক্তিগত লুক।
কফি মগ থেকে পানির ফ্লাস্কজুড়ে শিল্পকর্ম : সকালবেলার কফির মগটি যদি হয় নিজের পছন্দের কোনো থিমে রাঙানো, তবে দিনটাই যেন সুন্দর হযে ওঠে। ঢাকার কর্মজীবী তরুণ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টেবিলে এখন কাস্টমাইজড মগ ও থার্মাল ফ্লাস্ক পরিচিত একটি উপকরণ। কেউ সিরামিকের মগে সাবলিমেশন প্রিন্ট করিয়ে নিচ্ছেন নিজের কোনো প্রিয় মুহূর্ত বা ক্যারিকেচার, আবার কেউ মেটাল বা কাচের পানির বোতলে অ্যাক্রিলিক কালার দিয়ে করিয়ে নিচ্ছেন চমৎকার হ্যান্ডপেইন্ট। জবা ফুল, রাতের আকাশ, কিংবা প্রিয় কোনো কবিতার লাইন-কী নেই সেই ক্যানভাসে! এই জিনিসগুলো প্রতিদিনের একঘেয়ে জীবনে এনে দিচ্ছে এক চিলতে রঙের আনন্দ।
অন্যদিকে তরুণদের মাঝে প্লাস্টিক বর্জন এবং পরিবেশবান্ধব লাইফস্টাইলের সচেতনতা বাড়ছে। আর এই সচেতনতা থেকেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সুতি বা ক্যানভাসের ‘টোট ব্যাগ’। আর এই সাধারণ টোট ব্যাগগুলোকেই তরুণ শিল্পীরা রূপ দিচ্ছেন অনন্য শিল্পকর্মে।
ক্যানভাস ব্যাগের ওপর ফেব্রিক কালার বা টেক্সটাইল পেইন্ট দিয়ে আঁকা হচ্ছে নান্দনিক সব নকশা। শান্তিনিকেতনি মোটিফ, মণ্ডুলা আর্ট, ভ্যান গঘের ‘স্টারি নাইট’ কিংবা ওয়ান পিস-নারুটোর মতো জনপ্রিয় অ্যানিমের চরিত্রগুলো জায়গা করে নিচ্ছে এই ব্যাগে। শুধু তরুণীরাই নন, তরুণদের কাঁধেও এখন শোভা পাচ্ছে এমন কাস্টমাইজড ব্যাগ। এর পাশাপাশি ছোট পার্স, কয়েন পাউচ এবং চামড়ার ওয়ালেটেও এখন লেজার এনগ্রেভিং বা হ্যান্ডপেইন্টের মাধ্যমে নাম ও বিশেষ ডিজাইন ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে।
এই কাস্টমাইজেশন কালচার কেবল তরুণদের শখ মেটাচ্ছে না, বরং এটি বাংলাদেশে একটি বিশাল অনলাইনভিত্তিক বিজনেস বা এফ-কমার্স ইকোসিস্টেম তৈরি করেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটের মতো বড় শহর ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এখন ঘরে বসে উদ্যোক্তা হয়ে উঠছেন।
ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে অসংখ্য পেজ গড়ে উঠেছে, যেখানে মূলত তরুণারাই তাদের গ্রাফিক ডিজাইন ও হ্যান্ডপেইন্টের দক্ষতা বিক্রি করছেন। এর ফলে পড়াশোনার পাশাপাশি অনেক শিক্ষার্থীরই পার্ট-টাইম আয়ের দারুণ সুযোগ তৈরি হয়েছে।
‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগলাইনের সঙ্গে এই কাস্টমাইজড পণ্যগুলো এখন করপোরেট গিফটিংয়ের ক্ষেত্রেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের উপহার দেওয়ার জন্য এখন কাস্টমাইজড ডায়েরি, মগ বা ল্যাপটপ স্কিন বেছে নিচ্ছে। সম্ভাবনার পাশাপাশি এই সেক্টরে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। হ্যান্ডপেইন্টের ক্ষেত্রে ভালো মানের কালার বা ম্যাটেরিয়ালস বাংলাদেশে সবসময় সহজে বা সুলভ মূল্যে পাওয়া যায় না। অনেক সময় নিম্নমানের রঙের কারণে ধোয়ার পর ডিজাইন নষ্ট হয়ে যায়, যা ক্রেতাদের অসন্তুষ্ট করে।
এ ছাড়া, গ্রাফিক ডিজাইনের ক্ষেত্রে পাইরেসি বা একে অপরের ডিজাইন হুবহু নকল করার একটি প্রবণতাও দেখা যায়। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে তরুণ উদ্যোক্তাদের গুণগত মান বজায় রাখা এবং নিজস্ব মৌলিক ডিজাইন তৈরিতে আরও জোর দিতে হবে।
তরুণদের এই গ্যাজেট, ব্যাগ বা মগ রাঙানোর অভ্যাসটি আসলে প্রমাণ করে যে, বাঙালি শিল্পমনস্ক। যান্ত্রিক এই নাগরিক জীবনে তারা যান্ত্রিকতার মাঝেও কিছুটা নিজস্বতা আর রঙের ছোঁয়া খুঁজে নিতে চায়। প্রযুক্তির উৎকর্ষতা আর তরুণদের সৃজনশীলতার এই যুগলবন্দি বাংলাদেশের লাইফস্টাইল ইন্ডাস্ট্রিকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করছে। নিজের ব্যবহারের জিনিসটিতে নিজের একটু ছোঁয়া রাখার এই ট্রেন্ডটি আগামী দিনে আরও নতুন নতুন রূপে আমাদের সামনে হাজির হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে