বইয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকে অজান্তা গড়ে তোলে অর্কেস্ট্রা। গ্রাফিক : সময়ের আলো
বই পড়ার অভ্যাসটা অজান্তা ইসলাম আশার ছোটবেলা থেকেই। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বই পড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন পাঠচক্র ও বইকেন্দ্রিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ হয়েছে তার। কাজ করেছেন বইমেলাতেও। এসব অভিজ্ঞতার মধ্যেই বই নিয়ে কিছু করার ইচ্ছেটা ধীরে ধীরে নিজের ভেতরে জায়গা করে নেয়। সেই ইচ্ছা থেকেই একসময় বুকক্যাফে বা লাইব্রেরি করার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। সেই স্বপ্নেরই বাস্তব রূপ এখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্ত সবুজের মাঝে গড়ে তোলা ‘অর্কেস্ট্রা’।
অর্কেস্ট্রার শুরু হয়েছে ২০০টি বই দিয়ে। ছবি : সৌজন্য
অর্কেস্ট্রার নামটি আগে থেকেই ঠিক করা ছিল না। বুকক্যাফের কাজ শুরু করার পর প্রায় এক সপ্তাহ ধরে নাম খুঁজেছেন অজান্তা। শেষপর্যন্ত সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘অর্কেস্ট্রা’ গ্রন্থের নাম থেকেই পছন্দের নামটি খুঁজে পান। ‘অর্কেস্ট্রা’ শব্দের অর্থ সমস্বর। বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের বাদক মিলে যখন একটি সুর তৈরি করেন, তখন তাকে অর্কেস্ট্রা বলে। অজান্তার কাছে বিভিন্ন লেখকের বিভিন্ন বইও অনেকটা তেমনই। আলাদা আলাদা লেখার মিলনায়তন হিসেবেই তিনি নিজের বইয়ের জায়গাটির নাম রেখেছেন অর্কেস্ট্রা।
বই নিয়ে কাজ করা, মানুষকে বই পড়তে উৎসাহিত করাই ছিল অর্কেস্ট্রা গড়ে তোলার মূল কারণ। ছবি : সৌজন্য
অর্কেস্ট্রা তৈরির পেছনে অবশ্য ব্যবসার চিন্তাটা প্রধান ছিল না। বই নিয়ে কাজ করা, মানুষকে বই পড়তে উৎসাহিত করা এই ইচ্ছেগুলোই ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে, বাস্তবতার প্রয়োজনও রয়েছে। এখনো পড়াশোনা করছেন অজান্তা। তাই নিজের আয়ের একটি উৎসের কথাও ভাবতে হয়েছে তাকে। সে কারণেই বইয়ের পাশাপাশি অর্কেস্ট্রায় রাখা হয়েছে চা-কফির ব্যবস্থা।
অর্কেস্ট্রার সাজসজ্জার বেশিরভাগ জিনিসই অজান্তার নিজের হাতে তৈরি। ছবি : সৌজন্য
অর্কেস্ট্রার যাত্রা শুরু হয়েছে প্রায় ২০০টি বই নিয়ে। ভবিষ্যতে বইয়ের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার। বইয়ের পাশাপাশি জায়গাটির সাজসজ্জাও অর্কেস্ট্রার অন্যতম আকর্ষণ। এখানে কৃত্রিম সাজসজ্জার বদলে কাঠ, বেত কিংবা হাতে তৈরি জিনিস ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন অজান্তা। অর্কেস্ট্রার সাজসজ্জার বেশিরভাগ জিনিসই তার নিজের হাতে তৈরি। বাংলা বিভাগে পড়াশোনার অভিজ্ঞতাও এখানে কাজে লেগেছে। কলেজে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সাজসজ্জার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি জায়গাকে সাজানোর অভিজ্ঞতা হয়েছিল অজান্তার। অর্কেস্ট্রার ক্ষেত্রেও সেই ভাবনাই ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি।
অর্কেস্ট্রা নিয়ে ব্যস্ত ও মধুময় সময় কাটে অজান্তার। ছবি : সৌজন্য
তবে, স্বপ্নের জায়গাটি তৈরি করা খুব সহজ ছিল না। অর্কেস্ট্রার শুরুর সময়ের চ্যালেঞ্জের কথা বলতে গিয়ে অজান্তা বলেন, ‘কোনো কিছু শুরু করার ক্ষেত্রে চারপাশের মানুষের নেতিবাচক কথাগুলো অনেক সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কেউ নতুন কিছু করতে চাইলে আশেপাশের মানুষ শুরুতেই তাকে সম্ভাব্য ব্যর্থতার কথা শোনাতে থাকে। তাই অন্যের কথায় থেমে না গিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে এগিয়ে যাওয়াটা জরুরি।’
একজন শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনার পাশাপাশি অর্কেস্ট্রা চালানোও তার জন্য কম পরিশ্রমের নয়। তবে, সেই চাপটুকুকে স্বপ্ন পূরণের অংশ হিসেবেই দেখেন তিনি।
সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘অর্কেস্ট্রা’ গ্রন্থের নাম থেকেই বুকক্যাফের জন্য পছন্দের নামটি খুঁজে পান অজান্তা। ছবি : সৌজন্য
অর্কেস্ট্রায় আসা মানুষদের প্রতিক্রিয়া অবশ্য সেই পরিশ্রমের অনেকটাই ভুলিয়ে দেয়। প্রথমবার এসে জায়গাটির সাজসজ্জা দেখে অনেকেই মুগ্ধতার কথা জানান। কেউ অর্কেস্ট্রার পরিবেশের প্রশংসা করেন, কেউ আবার যাওয়ার সময় বলে যান, আবার তারা আসবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলোই অজান্তাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে। নিজের তৈরি একটি জায়গায় এসে মানুষ আনন্দ পাচ্ছে, কিছুক্ষণ সময় কাটাচ্ছে, একজন উদ্যোক্তার কাছে এটি বেশ আনন্দের।
অর্কেস্ট্রায় রাখা হয়েছে চা-কফি খাওয়ার ব্যবস্থাও। ছবি : সৌজন্য
অজান্তা চান, বইপত্র ও বইয়ের জগতের মানুষের মিলনমেলা হিসেবে অর্কেস্ট্রা পরিচিত হোক। শীঘ্রই পাঠচক্র শুরুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। ভবিষ্যতে সুযোগ হলে অর্কেস্ট্রার সাংস্কৃতিক পরিসর আরও বাড়াতে চান অজান্তা। অর্কেস্ট্রায় কেউ প্রথমবার এসে যেন মনে না করেন যে, এখানে এসে সময় নষ্ট হয়েছে- এটাই তার প্রত্যাশা। বরং বই পড়া, আড্ডা কিংবা চা-কফির সঙ্গে কিছুটা ভালো সময় কাটিয়ে মানুষ যেন সুন্দর অনুভূতি নিয়ে ফিরে যান এবং বারবার ফিরে আসেন সেটাই চান তিনি।
অজান্তা ইসলাম আশা বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে স্নাতকোত্তরে পড়ছেন। বই পড়া, ঘুরে বেড়ানো ও সাইক্লিং তার পছন্দ। বর্তমানে পড়াশোনার পাশাপাশি অর্কেস্ট্রা নিয়ে ব্যস্ত ও মধুময় সময় কাটছে তার।