শিশুর হাত ধরেই গড়ে উঠুক প্রাণীবান্ধব সমাজ

সময়ের আলো ডেস্ক

ফিচার

একটি অবলা প্রাণীকে আঘাত করা কিংবা কষ্ট পেতে দেখে হাসাহাসি- এসব আচরণকে আমরা সাধারণত স্বাভাবিক হিসেবেই দেখি। কিন্তু, এটি যে

2026-10-04T14:30:21+00:00
2026-10-04T14:38:25+00:00
 
  রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬,
১৯ আশ্বিন ১৪৩৩
রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
ফিচার
শিশুর হাত ধরেই গড়ে উঠুক প্রাণীবান্ধব সমাজ
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৩০ পিএম  আপডেট: ০৪.১০.২০২৬ ২:৩৮ পিএম
শিশুর হাত ধরেই গড়ে উঠুক প্রাণীবান্ধব সমাজ। ছবি : সংগৃহীত
একটি অবলা প্রাণীকে আঘাত করা কিংবা কষ্ট পেতে দেখে হাসাহাসি- এসব আচরণকে আমরা সাধারণত স্বাভাবিক হিসেবেই দেখি। কিন্তু, এটি যে খুব খারাপ কাজ এবং মানুষ কেন এভাবে অবলা প্রাণীকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পায়, তা আমরা ভাবি না। এর পেছনে থাকতে পারে শৈশবের শিক্ষা, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক মূল্যবোধ কিংবা গভীর কোনো মানসিক সমস্যা। 

এমন দৃশ্য হরহামেশাই দেখা যায়- থেঁতলে যাওয়া পা নিয়ে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে খুঁড়িয়ে হাঁটছে একটি কুকুর। তার পেছনে কয়েকজন কিশোর-কিশোরী হাসতে হাসতে ইটের টুকরো ছুড়ে মারছে। আঘাত থেকে বাঁচতে প্রাণপণে পালানোর চেষ্টা করছে কুকুরটি। পথের কুকুর-বিড়ালসহ অসংখ্য প্রাণী প্রতিদিন এভাবে মানুষের আঘাত, নির্যাতন ও অবহেলার শিকার হয়। 

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মনোরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদের মতে, প্রাণীর প্রতি এই নিষ্ঠুরতার পেছনের কারণকে ৩টি ক্ষেত্রে ভাগ করা যায়- জ্ঞানীয় শিক্ষা, সামাজিক শিক্ষা এবং মানসিক ব্যাধি।


আমরা যা দেখি, অনেক সময় সেটাই শিখি

শিশুরা তাদের চারপাশের মানুষদের দেখে আচরণ শেখে। পরিবারে যদি কোনো শিশু নিয়মিত দেখতে পায় যে, পশু-পাখিকে তাড়াতে লাঠি ব্যবহার করা হচ্ছে, পাথর ছোড়া হচ্ছে কিংবা তাদের কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, তাহলে সে ধীরে ধীরে এসব আচরণকে স্বাভাবিক বলে মনে করতে পারে।

ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একটি শিশুর কাছে ঠিক ও ভুলের ধারণা অনেকাংশেই তার পরিবেশ থেকে তৈরি হয়। পরিবার বা সমাজে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ দেখতে দেখতে বড় হলে, সেই আচরণকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করার সম্ভাবনা বাড়ে।

শিশুর মধ্যে সহমর্মিতা তৈরি করা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অন্য মানুষ কিংবা প্রাণীর ভয়, কষ্ট ও প্রয়োজন বুঝতে শেখানো না হলে তার মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই সহানুভূতির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

বাংলাদেশের অনেক পরিবারে পথের কুকুর ও বিড়ালকে বিরক্তিকর কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণী হিসেবে দেখা হয়। এমনও দেখা যায়, বাবা-মা নিজেরাই লাঠি বা পাথর দিয়ে প্রাণী তাড়ান এবং সন্তানকেও একই কাজ করতে উৎসাহ দেন। এতে শিশুর মনে প্রাণীর প্রতি মমত্ববোধের বদলে ভয়, বিরক্তি কিংবা নিষ্ঠুরতা তৈরি হতে পারে।


সমাজের চাপও বড় কারণ

সব মানুষ প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর হয় না, বরং অনেক মানুষ স্বাভাবিকভাবেই প্রাণীর প্রতি সহানুভূতিশীল। 

হেলাল উদ্দিন আহমেদের মতে, সামাজিক রীতিনীতি একজন মানুষের আচরণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। কোনো সমাজে যদি প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতাকে স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সেখান থেকে আলাদা অবস্থান নেওয়া অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।


ঢাকার পথের কুকুরদের নিয়ন্ত্রণের নামে অতীতে গণহারে হত্যার ঘটনাগুলো এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। কুকুরের সংখ্যা কমানো বা বংশবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে কোনো কোনো পৌর কর্তৃপক্ষ বিষ প্রয়োগসহ অমানবিক পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। যখন কোনো প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতাকে বৈধ বা গ্রহণযোগ্য আচরণ হিসেবে উপস্থাপন করে, তখন সাধারণ মানুষও মনে করে, প্রাণীর ক্ষতি করা গুরুতর কোনো বিষয় নয়।


মানসিক সমস্যা ও শৈশবের আঘাত

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে গভীর মানসিক সমস্যা, শৈশবের আঘাত কিংবা আচরণগত ও ব্যক্তিত্বজনিত সমস্যা হতে পারে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার কারণ। কিছু ক্ষেত্রে সিজোফ্রেনিয়ার মতো গুরুতর মানসিক অসুস্থতাও আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।

হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘শৈশবে পাওয়া মানসিক আঘাত পরবর্তী জীবনে একজন মানুষের আচরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। যে শিশু সহিংসতা, নির্যাতন কিংবা অবহেলার মধ্যে বড় হয়, তার নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কখনো কখনো সে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া সহিংস আচরণ অন্য মানুষ কিংবা প্রাণীর ওপরও প্রয়োগ করতে পারে।’

গবেষণায় প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে মানুষের প্রতি সহিংস আচরণের সম্পর্কের কথাও উঠে এসেছে। অর্থাৎ, প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতাকে ছোটখাটো ঘটনা হিসেবে উপেক্ষা না করে শুরুতেই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। 


কীভাবে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা কমানো যায়?

প্রতিরোধের শুরু হওয়া উচিত পরিবার থেকেই। শিশুর সামনে বাবা-মায়ের আচরণ তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তাই সন্তানকে শুধু মুখে প্রাণীর প্রতি দয়া করতে বললেই হবে না; নিজেদের আচরণের মাধ্যমেও তার সামনে ইতিবাচক উদাহরণ তৈরি করতে হবে।

হেলাল উদ্দিন আহমেদের মতে, শিশুদের শেখাতে হবে যে পোষা প্রাণী কিংবা পথের প্রাণী- দুই ক্ষেত্রেই তাদের প্রতি দায়িত্বশীল ও সহানুভূতিশীল আচরণ করা প্রয়োজন। প্রাণীও ভয় পায়, ব্যথা পায় এবং কষ্ট অনুভব করে- শিশুকে এই বিষয়গুলো বোঝানো জরুরি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। স্কুলের পাঠ্যক্রম ও বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে শিশুদের প্রাণীর প্রতি সহমর্মিতা, দায়িত্বশীল পোষ্যপালন এবং প্রাণীকল্যাণ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা কীভাবে বৃহত্তর সামাজিক সহিংসতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, সে বিষয়েও শিশুদের বয়স উপযোগী শিক্ষা দেওয়া দরকার।


গণমাধ্যম ও বিনোদন জগতও মানুষের চিন্তাভাবনা পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ও ইনফ্লুয়েন্সাররা প্রাণীর প্রতি ইতিবাচক আচরণের উদাহরণ তৈরি করতে পারেন।

অভিনেতা, রাজনৈতিক ব্যক্তি, ব্যবসায়ী নেতা কিংবা অন্যান্য পরিচিত ব্যক্তিদের সামাজিক প্রভাব অনেক বেশি। তারা প্রকাশ্যে প্রাণীর প্রতি সহানুভূতি দেখালে এবং দায়িত্বশীল আচরণকে উৎসাহিত করলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এর পাশাপাশি আইনের কার্যকর প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধের আইন থাকলেও, এসব আইন বাস্তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। শুধু আইন থাকলেই হবে না, আইন প্রয়োগের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাণী নির্যাতনের ঘটনা জানানোর ব্যবস্থা, কমিউনিটিভিত্তিক উদ্যোগ এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলে প্রাণীদের ওপর সহিংসতা কমানো সম্ভব। আজ আমরা শিশুদের যে মূল্যবোধ শেখাব, আগামী দিনের সমাজ অনেকাংশে তারই প্রতিফলন হবে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন প্রাণীর কষ্টকে উপেক্ষা না করে, বরং তাদের প্রতি ভালোবাসা ও সহমর্মিতা নিয়ে বেড়ে ওঠে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

সময়ের আলো/মহু


  বিষয়:   শিশু  প্রাণী  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: