সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো নিয়ে সবশেষ যা জানা যাচ্ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

নতুন অর্থবছরের শুরু থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের ঘোষণা দেওয়া হলেও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ

2026-07-01T23:35:28+00:00
2026-07-01T23:35:28+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬,
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো নিয়ে সবশেষ যা জানা যাচ্ছে
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬, ১১:৩৫ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
নতুন অর্থবছরের শুরু থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের ঘোষণা দেওয়া হলেও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করেনি সরকার। ফলে কোন গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন কত বাড়বে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যায়নি। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত বেতন কমিশনের সুপারিশই কার্যকর হবে, নাকি বর্তমান সরকার সংশোধিত কোনো কাঠামো বাস্তবায়ন করবে সেটিও এখনো স্পষ্ট নয়।

সরকারি সূত্র জানিয়েছে, ক্ষমতা গ্রহণের পর বর্তমান সরকার নতুন পে-স্কেল পর্যালোচনার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। কমিটি ইতোমধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর একটি খসড়া রূপরেখা তৈরি করেছে। বর্তমানে সেটি চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এতে বেতন বৃদ্ধির হার, কত ধাপে বেতন-ভাতা বাস্তবায়ন করা হবে এবং মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

এ কারণে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামো কবে কার্যকর হবে, কত হারে বেতন বাড়বে এবং কত ধাপে তা বাস্তবায়ন হবে এসব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, নতুন অর্থবছরের শুরু থেকেই বেতন কাঠামো কার্যকরের পরিকল্পনা থাকলেও গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। প্রশাসনিক আদেশ, গেজেট প্রকাশ এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেও আরও কিছু সময় লাগতে পারে। তবে নতুন কাঠামো কার্যকর হলে তা বকেয়াসহ পরিশোধের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, নতুন বেতন কাঠামো যথাসময়েই বাস্তবায়ন করা হবে।

অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘদিন পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোয় পরিবর্তন প্রয়োজন হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

বাংলাদেশে সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর প্রতি বছর মূল বেতনে ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হলেও নতুন কোনো পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়নি। ফলে প্রায় এক যুগ ধরে নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় রয়েছেন সরকারি চাকরিজীবীরা।

২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে 'জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫' গঠন করে। কমিশন গত ২২ জানুয়ারি সরকারের কাছে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করে।

সুপারিশে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত যাতায়াত ভাতায় বড় ধরনের সংস্কারের সুপারিশ করা হয়।

তৎকালীন কমিশনপ্রধান জাকির আহমেদ খান জানিয়েছিলেন, গত এক দশকে দেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই এসব সুপারিশ করা হয়েছে। পুরো সুপারিশ বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে বলেও কমিশন উল্লেখ করে।

বর্তমান সরকার পরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। কমিটি নতুন বেতন কাঠামোর খসড়া প্রস্তুত করেছে এবং সেই ভিত্তিতেই গেজেট তৈরির কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে।


প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনায় রেখেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি জানান, ইশতেহারে যথাসময়ে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি ছিল এবং সে অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে গেজেট প্রকাশের নির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে তিনি কিছু বলেননি। শুধু জানিয়েছেন, এটি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।

যদিও জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঘোষণা দিয়েছিলেন, প্রায় ১১ বছর একই বেতন কাঠামোয় থাকা সরকারি কর্মচারীদের জন্য ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে নতুন পে-স্কেল কার্যকর করা হবে।

পে-স্কেল পর্যালোচনা কমিটিও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছিল। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম দুই অর্থবছরে মূল বেতন ৫০ শতাংশ করে বৃদ্ধি এবং তৃতীয় বছরে বিভিন্ন ভাতা কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরও নিশ্চিত করেছেন, নতুন কাঠামোয় বেতন ও ভাতা একসঙ্গে কার্যকর হবে না। প্রথম ধাপে মূল বেতন বৃদ্ধি করা হবে। তবে কোন গ্রেডে কত বেতন বাড়বে, সে বিষয়ে এখনই কিছু জানাতে রাজি হননি তিনি। তার ভাষ্য, পর্যালোচনা ও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, চলতি মাসের মাঝামাঝি বা শেষ দিকে নতুন বেতন কাঠামোর গেজেট প্রকাশ হতে পারে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতার জন্য প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ এ খাতে মোট বরাদ্দ ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। 'জনপ্রশাসন-নিট' খাতে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় অতিরিক্ত ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য সংরক্ষিত হয়েছে। এ অর্থ সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনভোগীদের জন্য ব্যয় করা হবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর যৌক্তিকতা রয়েছে। তবে বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শুধু বেতন বাড়ালেই হবে না, তা দেশের অর্থনীতির জন্য কতটা সহনশীল হবে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রায় এক যুগ পর নতুন পে-স্কেল চালু হওয়া ইতিবাচক। মূল্যস্ফীতির তুলনায় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি খুবই সীমিত ছিল। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের বড় অঙ্কের ব্যয় হলেও এটিকে ব্যয়ের পরিবর্তে বিনিয়োগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে শুধু মূল বেতন নয়, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, উৎসব ও শিক্ষা ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধাও বাড়বে। তবে এর প্রভাব অন্যান্য খাতেও পড়বে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখেই বাস্তবায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন জনগণের করের অর্থ থেকে দেওয়া হয়। তাই বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি জনগণ যাতে যথাযথ সেবা পায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বেতন বাড়লেও যদি দুর্নীতি অব্যাহত থাকে, তাহলে রাষ্ট্র ও জনগণ উভয়েরই ক্ষতি হবে।

সময়ের আলো/আরবিএন 


  বিষয়:   সরকারি চাকরিজীবী  গেজেট 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: