স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দলীয় প্রতীক ছাড়া হতে যাওয়া এ নির্বাচনে ভোটের লড়াই যতটা প্রার্থীদের মধ্যে, তার চেয়ে বেশি নজর থাকবে নির্বাচন পরিচালনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতার ওপর। অতীতের স্থানীয় নির্বাচনে সহিংসতার নজির এবং প্রশাসনিক পক্ষপাতের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভোটারদের আস্থা অর্জন ও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়াই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
দেশের তৃণমূল পর্যায়ের প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব বাছাইয়ের এই আয়োজন সামনে রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী অক্টোবরে নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে সাংবিধানিক এই সংস্থাটি। পতিত হাসিনা রেজিমের পতনের পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচন সরকারের জন্যও এক ধরনের পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অতীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে সহিংসতার ঘটনাও রাজনৈতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ২৩৬ জন নিহত হন। অন্যদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সহিংসতায় নিহত হন ১১৬ জন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনকে নিরপেক্ষ রাখা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
দেশের ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন, ৫০০ উপজেলা, ৬১টি জেলা পরিষদ, ১৩টি সিটি করপোরেশন ও ৩৩০টি পৌরসভায় নির্বাচনের এই আয়োজন হতে যাচ্ছে ভিন্ন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায়। অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। বিশেষ করে ভোটার উপস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি আস্থা তৈরির বিষয়গুলোই এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হয়ে উঠতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতার বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন দলের তৃণমূলের নেতারাও। গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার টোক ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক রুকন সময়ের আলোকে বলেন, আমাদের আসনে জামায়াতের এমপি। আশা করি স্থানীয় প্রশাসন এমপির কথায় তাদের নিরপেক্ষতা হারাবে না। কেননা এখানে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীসহ সব দলই স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেবে। দলের মধ্যেও একাধিক প্রার্থী সুতরাং ত্রিমুখী লড়াই হবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন, ইউএনও, ওসি, এসি ল্যান্ড, নির্বাচনি কর্মকর্তাসহ মাঠে যারা দায়িত্বে থাকবে তাদের নিরপেক্ষতা জরুরি।
একই ধরনের কথা বলেন জামায়াত নেতা ইয়াসিন আরাফাত। তিনি কুমিল্লা-১০ আসন থেকে জাতীয় নির্বাচন করে পরাজিত হন। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, এখানকার এমপি বিএনপি। আশা করি তিনি নির্বাচনে প্রশাসনকে ব্যবহার করে কোনো প্রভাব বিস্তার করবেন না।
এদিকে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে পছন্দের প্রার্থীদের সুবিধা পাইয়ে দিতে ইতিমধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় বিএনপির এমপিরা তাদের পছন্দমতো ইউএনও নিযুক্ত করছেন। যাতে স্থানীয় নির্বাচনের বৈতরণী তারা পছন্দমতো পার হতে পারেন।
ঢাকা জেলা মাঠ প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সময়ের আলোকে বলেন, নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে প্রথমত সরকারের রাজনৈতিক পূর্ণ সদিচ্ছা থাকতে হবে। সরকার আন্তরিক হলে স্থানীয় প্রশাসন বাধ্য নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে। আর নির্বাচনের সময় আমরা কোনো এমপি কিংবা মন্ত্রী নির্দেশ পালনে বাধ্য নই। হ্যাঁ তার ব্যক্তিগত অনুরোধ কিংবা সুপারিশ থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু ফোর্স করার অধিকার তাদের নেই। আমরা নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের অধীনে কাজ করি।
এদিকে নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বহুল আলোচিত বিষয় হলো বিদ্রোহী প্রার্থী। বিভিন্ন পর্যায়ে অনেকে মনে করছেন, দলীয় সমর্থন পাওয়া ও না পাওয়া প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ ভিন্নভাবে বিষয়টি দেখছেন। তাদের মতে, বিদ্রোহী প্রার্থী নয় বরং সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে মাঠ প্রশাসনকে কতটা নিরপেক্ষ রাখা যায় এবং ভোটারদের মধ্যে কতটা আস্থা সৃষ্টি করা যায়।
যেকোনো নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে ভোটার উপস্থিতির ওপর। ভোটকেন্দ্রে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি নির্বাচনকে শুধু বৈধতাই দেয় না বরং ফলাফলের প্রতি আস্থাও বাড়ায়। ভোটাররা যদি বিশ্বাস করেন তাদের ভোট নিরাপদ এবং তা সঠিকভাবে গণনা হবে, তা হলে উপস্থিতি বাড়বে। কিন্তু যদি নির্বাচন আগেই একতরফা বা অনিশ্চিত বলে মনে হয়, তা হলে ভোটারদের একটি অংশ কেন্দ্রে যেতে অনাগ্রহী হতে পারেন। তাই প্রশাসনের নিরপেক্ষ আচরণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নির্বাচন কমিশনের কার্যকর ভূমিকা ভোটার উপস্থিতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত বলে মনে করেন নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা।
দেশে বর্তমানে শেখ হাসিনা মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি এবং তার দল আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ। বিরোধী ভোটের বড় অংশ এখনও দলটির প্রতি অনুকূল অবস্থানে রয়েছে। আওয়ামী লীগ জাতীয় রাজনীতিতে যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার প্রভাব স্থানীয় পর্যায়েও পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। স্থানীয় নির্বাচনে দলটির গ্রহণযোগ্য স্থানীয় নেতারা নির্বাচনে অংশ নিতেও পারে। নির্বাচনের সময় মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার প্রভাব শুধু একটি নির্বাচনে সীমাবদ্ধ থাকে না। দীর্ঘমেয়াদে এটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থাও প্রভাবিত করতে পারে।
এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান মেজবাহ-উল-আজম সওদাগর সময়ের আলোকে বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। এই ম্যান্ডেটের ভিত্তি অনেক শক্তিশালী। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন যেহেতু দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না তাই এটি সরকারের জন্য সে রকম বড় কোনো চ্যালেঞ্জ নয়। তবে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সরকারকে সিরিয়াস হতে হবে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনে অক্টোবরকে লক্ষ্য ধরেই কাজ এগুচ্ছে ইসি। আর অক্টোবরে হলে এর ৪৫ দিন আগে তফসিল ঘোষণা করা হবে। আমরা মূলত অক্টোবর ধরেই কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, এবারের স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলো হবে নির্দলীয়, অর্থাৎ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের ব্যবহার থাকছে না। তারপরও আমরা মনে করছি, যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে। কাজেই ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছাই হোক, নির্দলীয় নির্বাচনে তারাও ইনভলব থাকবেই। এ কারণেই তাদের কাছে মতামত জানতে চেয়েও চিঠি দেওয়া হয়েছে।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ‘সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে’ আয়োজনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন প্রস্তুতি শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, পরবর্তী স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রয়েছে।
সময়ের আলো/আআ