সংস্কার সুপারিশ হিমাগারে

রফিকুল ইসলাম সবুজ

জাতীয়

ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্র সংস্কারকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এ লক্ষ্যে গঠন করা হয় ১১টি সংস্কার

2026-07-02T01:23:25+00:00
2026-07-02T01:23:25+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬,
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
জুলাই গণঅভ্যুত্থান
সংস্কার সুপারিশ হিমাগারে
রফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬, ১:২৩ এএম 
জুলাইয়ের প্রথমদিন এনসিপি নেতারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদদের কবর জিয়ারত করেন। ছবি : সময়ের আলো
ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্র সংস্কারকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এ লক্ষ্যে গঠন করা হয় ১১টি সংস্কার কমিশন। কমিশনগুলো সরকারের কাছে আড়াই হাজারেরও বেশি সুপারিশ জমা দেয়। এর মধ্যে সংবিধান সংস্কার কমিশন ছাড়া বাকি ১০টি কমিশনের দুই হাজারেরও বেশি সুপারিশ ছিল, যার অনেকই সরকার অধ্যাদেশ জারি বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে পারত। কিন্তু দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় অধিকাংশ সুপারিশই কার্যত হিমাগারে।

অন্যদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে শুধু সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি। বিরোধীদলীয় জোট প্রকাশ্যে সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তনের দাবি তুলছে। তাদের দাবি, বর্তমান রাজনৈতিক ও নির্বাচনি সংকটের মূল কারণ সংবিধানের কয়েকটি বিতর্কিত অনুচ্ছেদ। তবে একই সময়ে প্রশাসন, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, অর্থনীতি ও দুর্নীতি দমনসংক্রান্ত অন্যান্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। বিরোধী দলগুলোরও এসব বিষয়ে তেমন কোনো উচ্চকণ্ঠ অবস্থান দেখা যাচ্ছে না। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে- রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনা কি কেবল সংবিধানেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে?

বিরোধী জোটের একাধিক নেতা বলেছেন, সংবিধান সংশোধন ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্ভব নয় বিশেষ করে নির্বাচনকালে নিরপেক্ষ ব্যবস্থার প্রশ্নটি আবারও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে যে জুলাই সনদ তৈরি হয়েছিল, তার ভিত্তিতে জনগণ গণভোটে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও সরকার তা বাস্তবায়ন করেনি। তিনি বলেন, সংশোধন নয়, সংবিধান সংস্কারের সুযোগ সংসদে না পেলে তারা জনগণের কাছেই যাবেন এবং জনগণের ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

সংবিধান সংশোধনে সংসদীয় কমিটি গঠনের উদ্যোগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, জনগণ সংবিধান সংশোধনের জন্য নয়, সংস্কারের জন্য রায় দিয়েছে। সংস্কার ও সংশোধনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সংবিধান সংশোধন আদালতের বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় পড়ে, কিন্তু জনগণের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে হওয়া সংস্কারের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও হাইকোর্ট বেঞ্চ বিকেন্দ্রীকরণের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, অতীতে আদালতের রায়ে বিভিন্ন সাংবিধানিক সংশোধনী বাতিল হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সংবিধান পরিবর্তনের বিতর্ক সামনে আসায় অন্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ইস্যুগুলো আড়ালে চলে যাচ্ছে। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত বিভিন্ন কমিশন প্রশাসনিক জবাবদিহি, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, বিচার বিভাগের সংস্কার ও পুলিশ সংস্কার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ দিয়েছিল। কিন্তু সেগুলোর অধিকাংশই এখনও ফাইলবন্দি।

প্রথম ধাপে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন, সংবিধান সংস্কার কমিশন, পুলিশ সংস্কার কমিশন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন এবং দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশনসহ ছয়টি কমিশন গঠন করা হয়। পরে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন, স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন, স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন, শ্রম সংস্কার কমিশন এবং নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়।

কমিশনগুলো আড়াই হাজারের বেশি সুপারিশ দিলেও অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ জনপ্রশাসন, পুলিশ, দুদকসহ বিভিন্ন খাতের ৩৬৭টি সংস্কার প্রস্তাবকে ‘আশু বাস্তবায়নযোগ্য’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন কমিশনের মাত্র ৩৭টি সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আশু করণীয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব ছিল স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন, সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন আচরণবিধি প্রণয়ন, গণশুনানি ও নাগরিকদের অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা চালু, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে স্থায়ী নাগরিক কমিটি গঠন, মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা কমানো এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) একীভূত করা। এ ছাড়া কুমিল্লা ও ফরিদপুরকে বিভাগ ঘোষণা, জেলা প্রশাসককে জেলা কমিশনার হিসেবে অভিহিত করা, উপজেলা পর্যায়ে ম্যাজিস্ট্রেট আদালত স্থাপন, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা এবং সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) পুনর্গঠনের সুপারিশও ছিল।

বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন আশু করণীয় হিসেবে জুডিশিয়াল সার্ভিস সদস্যদের জন্য আচরণবিধি প্রণয়ন, ফৌজদারি মামলা তদন্তে পৃথক তদন্ত সার্ভিস গঠন, বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠা, জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে আদালতের সহায়ক কর্মচারী নিয়োগ, প্রতিটি আদালতে তথ্যকেন্দ্র (ইনফরমেশন ডেস্ক) স্থাপন এবং বিভিন্ন মামলায় বদলি হওয়া পুলিশ সদস্যদের অনলাইনে সাক্ষ্যগ্রহণের ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেছিল।

জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন সরকারের মন্ত্রণালয়গুলো যুক্তিসংগতভাবে পুনর্বিন্যাস করে ২৫টি মন্ত্রণালয় ও ৪০টি বিভাগে সীমিত করার সুপারিশ করে। পাশাপাশি সমপ্রকৃতির মন্ত্রণালয়গুলোকে পাঁচটি গুচ্ছে বিভক্ত করা, একটি নয়, তিনটি পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন এবং উপসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রশাসন ক্যাডারের কোটা ৭৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫০ শতাংশে আনার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।

পুলিশ সংস্কার কমিশনের আশু বাস্তবায়নযোগ্য ১৩টি প্রস্তাবের মধ্যে ছিল পুলিশ কমিশন গঠন, পুলিশের জন্য পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল সার্ভিস চালু, রাতে বাসায় তল্লাশির সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি বা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তির উপস্থিতি নিশ্চিত করা, এফআইআরবহির্ভূত কাউকে গ্রেফতার না করা এবং ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন।

বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের আশু বাস্তবায়নের তালিকায় থাকা ৩৮টি প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি নীতিমালা প্রণয়ন, বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের জন্য আচরণবিধি জারি, স্বতন্ত্র ফৌজদারি তদন্ত সার্ভিস প্রতিষ্ঠা এবং বাণিজ্যিক আদালত গঠন।

দুদক সংস্কার কমিশনের ৪৩টি সুপারিশের মধ্যে রয়েছে দুদক আইন সংশোধন করে কমিশনারের সংখ্যা পাঁচজনে উন্নীত করা, কমিশনারদের মেয়াদ পাঁচ বছর নির্ধারণ, রাষ্ট্রীয় ও আইনি ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে স্বার্থের দ্বন্দ্ব নিরসন ও প্রতিরোধসংক্রান্ত আইন প্রণয়ন এবং আয়কর আইনের একটি ধারা সংশোধনের মাধ্যমে দুদককে প্রয়োজনীয় তথ্য ও দলিল সংগ্রহে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করা। এ ছাড়া উচ্চমাত্রার দুর্নীতি তদন্তে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে পৃথক টাস্কফোর্স গঠন, পর্যায়ক্রমে সব জেলায় দুদকের কার্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং স্থায়ী প্রসিকিউশন ইউনিট গঠনের সুপারিশও ছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংবিধান সংস্কার বড় রাজনৈতিক ইস্যু হওয়ায় বিরোধী দলগুলো এটি নিয়ে সরব থাকলেও প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মতো অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত বিষয়গুলো গুরুত্ব হারাচ্ছে। অথচ দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনায় এসব খাতের সংস্কারের প্রভাবই বেশি।

সরকারি সূত্র বলছে, সংস্কার কার্যক্রম পুরোপুরি থেমে নেই। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো ধাপে ধাপে এসব সুপারিশ পর্যালোচনা করছে। তবে রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন বাস্তবায়ন কঠিন বলেও তারা স্বীকার করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, সংবিধান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু সংবিধান পরিবর্তন করলেই রাষ্ট্রের সব সংকট দূর হবে না। প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসবে না। তিনি বলেন, বিভিন্ন কমিশন বহু সুপারিশ দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার সীমিত। ফলে সংস্কার প্রক্রিয়া আংশিক হয়ে যাচ্ছে।

সুজন- সুশাসনের জন্য নাগরিকের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, সংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে। সবাই সংস্কারের কথা বলছে, কিন্তু কোন সংস্কার আগে হবে এবং কীভাবে হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা নেই। তার মতে, নির্বাচন ব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আমলাতন্ত্রই দেশের সংস্কারের সবচেয়ে বড় অন্তরায়। দুদক সংস্কার কমিশনের প্রায় সব প্রস্তাবেই রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য থাকলেও সেগুলোর বাস্তবায়নে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রতিটি সংস্কার কমিশনের আশু করণীয় সুপারিশ বাস্তবায়নের কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক সংস্কারই করা হয়নি। সংবিধান সংশোধন এবং বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকার ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগোতে চায় বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, যেসব সুপারিশ ও অধ্যাদেশ নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে, সেগুলো অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে আরও পরিমার্জনের পর সংসদে উপস্থাপন করা হবে। তার ভাষ্য, সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন ছাড়া জুলাই সনদের অনেক বিষয় বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশিত সংস্কার বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি আরও বলেন, সংবিধান সংস্কারের নামে নতুন সংবিধান প্রণয়নের প্রয়োজন নেই; সংশোধনের মাধ্যমেই প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা সম্ভব।

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   সংস্কার  সুপারিশ  হিমাগার  জুলাই  গণঅভ্যুত্থান 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: