নেশাদ্রব্য কিনতে চুরি করে ২২ শতাংশ মাদকসেবী

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী

জাতীয়

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে চুরির ঘটনা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের নিভৃত পল্লী- সবখানেই হানা দিচ্ছে

2026-07-02T01:57:57+00:00
2026-07-02T02:08:12+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬,
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
নেশাদ্রব্য কিনতে চুরি করে ২২ শতাংশ মাদকসেবী
সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬, ১:৫৭ এএম  আপডেট: ০২.০৭.২০২৬ ২:০৮ এএম
ছবি : সংগৃহীত
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে চুরির ঘটনা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের নিভৃত পল্লী- সবখানেই হানা দিচ্ছে চোর চক্র। রেহাই পাচ্ছে না খোদ পুলিশও। বৈদ্যুতিক তার, গরু, মসজিদ, স্কুল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিসও বাদ যাচ্ছে না চোরদের টার্গেট থেকে।

বিভিন্ন চুরির ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাদকাসক্তরা এসবে জড়িত। ২২ শতাংশ মাদকসেবী চুরি করেন মাদক কেনার টাকার জন্য। 

মাদকের জন্য চুরি : বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার জনস্বাস্থ্য ও আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এটি দেশের সব অঞ্চল ও সামাজিক শ্রেণির ব্যক্তি, পরিবার এবং জনগোষ্ঠীকে প্রভাবিত করছে।

২০২৫ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি), বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগ এবং রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেডের (আরএমসিএল) সহযোগিতায় দেশব্যাপী একটি জরিপ পরিচালনা করা হয়। এতে বলা হয়, একজন মাদকসেবী প্রতি মাসে মাদকের পেছনে গড়ে ৪ হাজার টাকারও বেশি ব্যয় করে। ৪৮ শতাংশ মাদকসেবী জানিয়েছে, তারা নিজেরাই মাদক কারবার করে মাদকের টাকা সংগ্রহ করে। আর ২২ শতাংশ মাদকসেবী চুরি করে মাদকের অর্থ জোগাড় করে।

গত ২১ জুন মাদক সেবন, মাদক বিক্রি ও চুরির অভিযোগে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার পলাশ ইউনিয়নের পাখিজান গ্রামে আব্দুশ শহীদ নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে আগুন দেয় এলাকাবাসী।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, আব্দুশ শহীদ দীর্ঘদিন ধরে মাদক সেবন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত ছিল। তার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগও ছিল। ঘটনার দিন রাতে এলাকার একটি মাদরাসার ব্যাটারি চুরি করতে গিয়ে সে জনরোষের শিকার হয়। একপর্যায়ে কয়েকজন তার বসতঘরে আগুন দিলে সে আহত হয়।

বিশ্বম্ভরপুর থানার তদন্ত ওসি ওয়ালী আশরাফ খান জানান, আব্দুশ শহীদের বিরুদ্ধে চুরি ও মাদকসহ মোট ছয়টি মামলা রয়েছে।

মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার বিভিন্ন বাজারে সম্প্রতি দোকান ও বাড়িতে অহরহ চুরির ঘটনা ঘটছে। বাদ যায়নি পুলিশের ট্রলারের গিয়ারবক্সও। চুরি আতঙ্কে রয়েছেন এলাকাবাসী।

স্থানীয়দের ভাষ্য, খেয়াঘাটের নৌকা থেকে ডিজেল, জেলেদের নৌকা থেকে জাল, ইজিবাইকের ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক মোটর, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন সামগ্রী চুরি হচ্ছে। তাদের দাবি, নেশার টাকা জোগাড় করতে উঠতি বয়সি অনেকে চুরিতে জড়িয়ে পড়ছে।

দড়িকান্দি গ্রামের জেলে শফিকুল ইসলাম বলেন, ধারদেনা করে ৪৪টি জাল কিনেছিলাম। রাতের আঁধারে সব চুরি হয়ে গেছে। মাদকসেবী চারজনকে সন্দেহ করলেও প্রমাণের অভাবে কিছু করতে পারছি না।

রাত জেগে পাহারা : দেশের বিভিন্ন এলাকায় চোরের উপদ্রবে আতঙ্কিত হয়ে উঠেছেন গ্রামবাসী। কোথাও কোথাও রাত জেগে পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় সম্প্রতি একের পর এক গরু চুরির ঘটনায় কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারা পালাক্রমে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন।

জানা গেছে, গত ১০ দিনে উপজেলার তিনটি গ্রাম থেকে অন্তত ১০টি গরু চুরি হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় মূল্যবান মালামাল চুরির ঘটনাও বেড়েছে। পুলিশের নিয়মিত টহলের অভাবের অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
কালীগঞ্জ থানার ওসি জেল্লাল হোসেন বলেন, গরু চুরির বিষয়ে কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের জানায়নি। তবে লোকমুখে বিষয়টি জানার পর পুলিশ ক্যাম্পগুলোকে বাড়তি নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চুরি প্রতিরোধে টহলও বাড়ানো হয়েছে।

গরু চুরির ঘটনা গাজীপুর, ঝিনাইদহসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘটছে। কুরবানির ঈদের আগে গাজীপুরের শ্রীপুর ও কাপাসিয়ায় এক সপ্তাহে কৃষক ও খামারিদের ২৩টি গরু চুরি হয়। জামালপুরের মাদারগঞ্জেও এক রাতে আটটি গরু চুরির ঘটনা ঘটে।

টার্গেট বৈদ্যুতিক তার : চোরদের অন্যতম টার্গেট বৈদ্যুতিক তার। সম্প্রতি এ ধরনের বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের রেড টেলিফোন সংযোগের তারও চুরি করে নিয়ে যায় চোর চক্র। গত ৪ জুন বাংলাদেশ সচিবালয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের রেড টেলিফোন সংযোগের তার চুরির ঘটনায় দুজনকে গ্রেফতার করে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। গত এপ্রিল মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জে এক রাতে সেচকাজে ব্যবহৃত দুটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরি হয়। এতে আতঙ্কে রয়েছেন কৃষকরা।

নারায়ণগঞ্জেও সাম্প্রতিক সময়ে চুরির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে সড়কবাতি, বৈদ্যুতিক তার, বাড়ির এসির পাইপসহ ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের চুরি ঘটছে নিয়মিত। জেলা প্রশাসনের অভিযোগ, স্থাপনের পরপরই অনেক জায়গা থেকে সড়কবাতি ও তার খুলে নিয়ে যাচ্ছে চোর চক্র।

নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) মিজানুর রহমান মুন্সী বলেন, আমরা সড়ক ও জনপথ বিভাগের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা লাইট প্রতিস্থাপন করবে। সংঘবদ্ধ চোর চক্রকে ধরতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

গত ২৭ জুন বরগুনার আমতলী উপজেলার ঘোপখালী এলাকায় এক রাতে চারটি প্রতিষ্ঠানে দুঃসাহসিক চুরির ঘটনা ঘটে। চোর চক্র একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তালা ভেঙে ল্যাপটপ, মসজিদের আলমারি ভেঙে নগদ টাকা এবং একটি দোকান থেকে সিগারেট নিয়ে যায়। এক রাতে একাধিক প্রতিষ্ঠানে চুরির ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

গত ২৮ জুন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের একটি এটিএম ও কালেকশন বুথ থেকে ১৭ লাখ টাকা চুরির ঘটনায় এক নিরাপত্তাকর্মীকে রংপুর থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশে ৩ হাজার ৯২৮টি চুরির মামলা হয়েছে। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৬৭২টি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে রাজধানীতে ৫২২টি চুরির মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সিঁধেল চুরির মামলা ২২১টি এবং অন্যান্য চুরির মামলা ৩০১টি। অন্যদিকে ২০২৫ সালে রাজধানীতে মোট ১ হাজার ৬০৯টি চুরির মামলা হয়েছিল। এর মধ্যে সিঁধেল চুরির মামলা ছিল ৫৬৫টি এবং অন্যান্য চুরির মামলা ১ হাজার ৪৪টি।

তবে সংশ্লিষ্টদের ধারণা, রুজুকৃত মামলার তুলনায় প্রকৃত চুরির ঘটনা আরও অনেক বেশি। কারণ অনেক ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ করতে আগ্রহী নন।

চুরির শাস্তি : আইনের দৃষ্টিতে চুরির ধরনভেদে শাস্তিও ভিন্ন। দণ্ডবিধির ৩৭৯ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি চুরি করলে তিনি সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। ৩৮০ ধারা অনুযায়ী, বসতবাড়িতে চুরি করলে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

৩৮১ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো চাকর বা ভৃত্য মালিকের সম্পত্তি চুরি করলে তিনি সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ৩৮২ ধারা অনুযায়ী, চুরি করার আগে, চুরির সময় বা চুরি করে পালানোর সময় গুরুতর আঘাত করার প্রস্তুতি নিয়ে চুরি করলে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   নেশাদ্রব্য  চুরি  মাদকসেবী  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: