দেশের পুঁজিবাজারে বর্তমানে মূল্য-আয় অনুপাত (পিই রেশিও) এবং লভ্যাংশ প্রাপ্তি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত অনুকূল ও নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। তাত্ত্বিক ও কৌশলগতভাবে বিনিয়োগের এমন আদর্শ পরিবেশ বজায় থাকার পরও বাজারে সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের খরা কাটছে না। এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক সতর্কতা ও অনীহার কারণে পুঁজিবাজারে নতুন বিনিয়োগকারী ও তারল্যের আগমন ঘটছে না। ফলে লেনদেনের পরিমাণ দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে। পুঁজিবাজার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের মাসিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এমন বৈপরীত্য দেখা যায়। বুধবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মে ২০২৬ মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের মাসের চেয়ে শূন্য দশমিক ৯৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫,৩৩৫.৮৭ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক শেয়ার মূল্যসূচক কাসপি (সিএএসপিআই) এপ্রিলের তুলনায় শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৪,৯০৯.৭৩ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। তবে প্রধান সূচকগুলোর এই নামমাত্র ঊর্ধ্বগতি পুঁজিবাজারের প্রকৃত তারল্য সংকটকে আড়াল করতে পারছে না।
প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, বাজারে বিনিয়োগকারীদের অত্যন্ত দুর্বল অংশগ্রহণের কারণে মে মাসে উভয় স্টক এক্সচেঞ্জেই লেনদেনের পরিমাণে বড় ধরনের ধস নেমেছে। মে মাসে ডিএসইতে মোট লেনদেন আগের মাসের তুলনায় ১৭.৩৯ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১৪ হাজার ২০৮ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। সিএসইর অবস্থা ছিল আরো নাজুক, যেখানে লেনদেনের পরিমাণ এপ্রিলের তুলনায় এক ধাক্কায় ৪৪.১৬ শতাংশ কমে মাত্র ৪১১ কোটি টাকায় এসে ঠেকেছে।
খাতভিত্তিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বরাবরের মতোই সাধারণ বীমা ও জীবন বীমা খাতের আধিপত্য ছিল সবচেয়ে বেশি। মে মাসের মোট লেনদেনে বীমা খাতের অবদান ছিল ১৫.৪৯ শতাংশ। এরপর পর্যায়ক্রমে ইঞ্জিনিয়ারিং খাত ১৩.৪৭ শতাংশ, ফার্মাসিউটিক্যালস ও কেমিক্যালস খাত ১৩.১৯ শতাংশ এবং ব্যাংকিং খাত ১২.৮০ শতাংশ লেনদেন দখল করে শীর্ষ অবস্থানে ছিল।
অনুকূল বাজার পরিমাপক, তবুও অনীহা
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে বাজার মূল্যায়ন বা ভ্যালুয়েশন অনুযায়ী শেয়ারের দাম অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও সস্তা স্তরে নেমে এসেছে। মে মাসের শেষে ডিএসইর সার্বিক পিই রেশিও কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮.৭২ এবং সিএসইর পিই রেশিও দাঁড়িয়েছে ১০.৫০। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, পিই রেশিও ১৫-এর নিচে থাকলে তা বিনিয়োগের জন্য আদর্শ ও কম ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ হিসেবে গণ্য হয়।
এর পাশাপাশি উভয় বাজারে লভ্যাংশ প্রাপ্তি বৃদ্ধি পেয়ে ডিএসইতে ৫.১৭ শতাংশ এবং সিএসইতে ৪.৮০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। একই সঙ্গে কম পিই রেশিও এবং ক্রমবর্ধমান উচ্চ লভ্যাংশ প্রাপ্তি স্পষ্ট নির্দেশ করে যে বাজার এখন বিনিয়োগের অনুকূলে রয়েছে। কিন্তু এই ইতিবাচক পরিসংখ্যানের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম ‘ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা’ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাজারে এক ধরনের আস্থার সংকট ও মনস্তাত্ত্বিক ভীতি বিরাজ করায় সস্তা দরেও বিনিয়োগকারীরা নতুন তহবিল নিয়ে এগিয়ে আসছেন না।
কমছে তারল্যের গতিশীলতা ও বাজার মূলধন
বিনিয়োগকারীদের এই নিষ্ক্রিয়তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজারের তারল্যের গতিশীলতার ওপর। ডিএসইতে তারল্য পরিমাপের অন্যতম প্রধান সূচক ‘টার্নওভার ভেলোসিটি রেশিও’ (টিভিআর) এপ্রিলের ৩০.১২ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়ে মে মাসের শেষে ২৪.৯১ শতাংশে নেমে এসেছে। টিভিআরের এই নিম্নগতি স্পষ্ট করে যে, বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে বাজারে বড় ধরনের লেনদেন থেকে বিরত থেকে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করছেন।
তা ছাড়া মে মাসের শেষে প্রধান দুই পুঁজিবাজারেই সামগ্রিক বাজার মূলধন হ্রাস পেয়েছে। ডিএসইর বাজার মূলধন শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮৪ হাজার ৪৩৩ বিলিয়ন টাকায়। অন্যদিকে সিএসইর বাজার মূলধন এপ্রিল মাসের তুলনায় বড় ব্যবধানে অর্থাৎ ৬৪.১২ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৪১৯ বিলিয়ন টাকায় নেমে এসেছে। মে মাসে বাজারে তালিকাভুক্ত বেশ কিছু বড় খাতের শেয়ারের দাম কমে যাওয়ার কারণে বাজার মূলধনের এই পতন ত্বরান্বিত হয়েছে।
উন্নয়ন ও সুরক্ষায় নানামুখি নীতি, তবুও কাটছে না স্থবিরতা
পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ বাড়াতে এবং দীর্ঘমেয়াদি তারল্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসি সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন ও তারল্য বাড়াতে লিয়েনকৃত ট্রেজারি বন্ডের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ বা ওভারড্রাফট সুবিধা প্রদানের অনুমতি দিয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় বিএসইসি ক্ষুদ্র মূলধনি বা এসএমই প্ল্যাটফর্মে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ আরও সুশৃঙ্খল করতে ন্যূনতম স্টক পোর্টফোলিও ৩০ লাখ টাকা নির্ধারণ করেছে। এ ছাড়া মেয়াদি বা ক্লোজড-অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ডগুলোকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সুবিধার্থে ওপেন-অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ডে রূপান্তরের জন্য আনুষ্ঠানিক নীতিমালা ও গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকনোমিক্সের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মুসা বলেন, বিগত সময়ে দেশে ভালো মানের বা ১০ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানি বেশি ছিল না। তা ছাড়া অনেক কোম্পানি শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) নেগেটিভ দেখিয়েছিল। এ জন্যই বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তবে যাদের টাকা ছিল তারা শেয়ারে বিনিয়োগ না করে সরকারি ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করেছে, কারণ এখানে ঝুঁকি কম। তবে নতুন সরকার গঠনের পর বিনিয়োগকারীরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। যদি ধারাবাহিকভাবে শেয়ারবাজারে সূচক ও মূল্য বাড়তে থাকে তা হলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আবার বিনিয়োগকারীরা ফিরতে শুরু করবে।
তিনি বলেন, বাজারে নতুন তহবিল আসলে চাহিদা বাড়বে এটা স্বাভাবিক। তবে তহবিল না আসলেও যদি শেয়ারের মূল্য হঠাৎ অনেক কমে না যায়, তা হলে বিনিয়োগকারীরা আসবে।
সময়ের আলো/আআ