ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। বহরে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন জাহাজ। বার্ষিক আয়ও বেড়েছে অনেক। আগামী অর্থবছরেও বড় অঙ্কের মুনাফার আশা করা হচ্ছে। জাতীয় পতাকাবাহী এই প্রতিষ্ঠানের নানা পরিকল্পনা সময়ের আলোর কাছে তুলে ধরেছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান সাইফুদ্দিন তুহিন
সময়ের আলো : অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়া বিএসসি অল্প সময়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৩০৭ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। কীভাবে মুনাফা অর্জনের পথে গেল বিএসসি?
মাহমুদুল মালেক : একসময় বিএসসির বহরে অনেক জাহাজ ছিল। এসব জাহাজের বেশিরভাগ ছিল পুরোনো। স্ক্র্যাপের পর্যায়ে যাওয়া এসব জাহাজ বহরে আর নেই। বর্তমানে ছোট বহর হলেও সব নতুন জাহাজ। প্রতিটি জাহাজ ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে বিএসসি বিপুল লাভ করছে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতীয় পতাকাবাহী এই সংস্থাকে এগিয়ে নিতে সুন্দর একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। শর্টটার্ম, মিডটার্ম, লংটার্ম সেভাবে সেট করা হয়েছে। সেই লক্ষ্য নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের প্রফিট মার্জিন কত হবে এটির কোনো টার্গেট সেট করিনি। এটি ভেরিয়েবল। দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা কি অবস্থায় থাকে তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। তবে আমরা আশাবাদী বিএসসি এগিয়ে যাবে। আশা করছি এই লাভের ধারা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।
বহরে আগামী পাঁচ বছরে কতটি নতুন জাহাজ যুক্ত হতে পারে?
বর্তমানে ছোট বহরে সাতটি জাহাজ আছে। সাতটিই নতুন হওয়ায় পরিচালন ব্যয় তেমন নেই। তাই এসব জাহাজ ভাড়া দিয়ে বিএসসি আয় করছে বেশি। আমরা চিন্তা করছি বহরে আরও নতুন জাহাজ যুক্ত করা হলে বিএসসির আয়ও বাড়বে।
আমাদের প্রত্যাশা আগামী পাঁচ বছরে মোট ২২টি জাহাজ হবে বিএসসির। বহরে কয়েক বছরের মধ্যেই যুক্ত হচ্ছে সাতটি জাহাজ। এসব জাহাজ কেনার প্রক্রিয়াও অনেক দূর এগিয়েছে। আগেই আমরা বিএসসির নিজস্ব অর্থায়নে দুটি জাহাজ বহরে যুক্ত করেছি। বাকিগুলো বিদেশি ঋণের মাধ্যমে কেনার প্রক্রিয়া চলছে। আমাদের প্রত্যাশা প্রতি বছর বিএসসি নিজস্ব অর্থায়নে একটি করে নতুন জাহাজ কিনতে পারবে। নিজস্ব অর্থায়নে জাহাজ কেনার সামর্থ্য অর্জন করতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। যতবেশি নতুন জাহাজ বহরে থাকবে ততবেশি অর্থ আয় হবে।
বিএসসির বহরে নতুন অয়েল ট্যাঙ্কার নেই। বিদেশ থেকে লাখ লাখ টন পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি হয় বিদেশি জাহাজ ভাড়া করে। বহরে অয়েল ট্যাঙ্কার বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা আছে কি না?
কার্গো জাহাজের চেয়ে অয়েল ট্যাঙ্কারে তেল পরিবহনের মাধ্যমে আয় বেশি হয়। আবার জাহাজ পরিচালনের দিক চিন্তা করলে কার্গো জাহাজের ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক কম। অয়েল ট্যাঙ্কারে ঝুঁকি বেশি। সব মিলিয়ে বাল্ক কার্গো, কনটেইনার জাহাজের পাশাপাশি সমতার মাধ্যমে অয়েল ট্যাঙ্কারও বহরে রাখতে চাই। নতুন যেসব জাহাজ বহরে যুক্ত হবে সেখানে অয়েল ট্যাঙ্কারও আছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধের সময় হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বিএসসির একটি জাহাজ আটকা ছিল। চার্টারপার্টি এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী আটকে থাকার কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েনি বিএসসি। ভাড়া গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান সব দায় বহন করেছে। কিন্তু ভবিষ্যতে জাহাজ ভাড়া নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালন খাতে ক্ষতির দায় কি নিজেরা বহন করবে?
বিএসসিসহ বিশ্বের সব বড় বড় শিপিং কোম্পানির ব্যবসা বলতে গেলে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে শুধু বিএসসি নয় সব দেশের জাহাজ চলাচলে সমস্যা হয়েছে। বিএসসির বাংলার জয়যাত্রা সাড়ে চার মাস আটকে ছিল। আমি প্রতিদিনের ভাড়া পেয়েছি। বাট আমি তো বের হতে পারিনি।
২৩ জুন অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে মেরিটাইম কৌশল ব্যবহার করে সেখান থেকে বের করে নিয়ে আসি বাংলার জয়যাত্রাকে। পরদিন ২৪ জুন সকাল থেকেই কিন্তু হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধ হয়ে যায়। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে জাহাজ মালিক পরিচালন খাতের ব্যয় বহন করবে কি না এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। তারা চার্টারপার্টি এগ্রিমেন্টের শর্ত পরিবর্তন করলে সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তবে এতে বিএসসির তেমন কোনো ক্ষতি হবে বলে মনে করি না।
স্বল্প সময়ে চলতি বছর বা আগামী বছরের মধ্যে কতটি জাহাজ যুক্ত হচ্ছে বহরে?
আমাদের পরিকল্পনা আছে আগামী পাঁচ বছরে বিএসসির বহরে ১৫টি জাহাজ যুক্ত হবে। তখন বর্তমান জাহাজগুলোসহ সব মিলিয়ে জাহাজের সংখ্যা দাঁড়াবে ২২টি। এর মধ্যে নিজস্ব অর্থায়নে দুটি জাহাজ কিনেছি। যা ৫৪ বছরের ইতিহাসে প্রথম। তিনটি জাহাজ কেনার প্রক্রিয়া একনেকের জন্য ক্লিয়ার হয়েছে। তিনটিই পাইপলাইনে আছে।
এর মধ্যে দুটি এমআর ট্যাঙ্কার। আর একটি বাল্ক ক্যারিয়ার। চীন থেকে জিটুজি ভিত্তিতে আরও চারটি জাহাজ পেতে যাচ্ছি। বর্তমানে বহরে জাহাজ আছে সাতটি। দ্রুত সময়ের মধ্যে যুক্ত হতে পারে আরও সাতটি জাহাজ। এতে বহরে অল্প সময়ে জাহাজের সংখ্যা হবে ১৪টি। ২৯ জুন বৈঠক করেছি এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) সঙ্গে। তারা ৬টি কনটেইনার জাহাজে অর্থায়নের ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত দিয়েছে।
দেশের বিভিন্ন শিপইয়ার্ডে তৈরি জাহাজ বিদেশে রফতানি হচ্ছে। বিএসসি ভবিষ্যতে নতুন জাহাজ তৈরির অর্ডার দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে দিতে পারে। তাদের সক্ষমতা কতটুকু?
দেশের বিভিন্ন শিপইয়ার্ডে নতুন নতুন জাহাজ তৈরি হচ্ছে। বিদেশে রফতানি হচ্ছে দেশের তৈরি জাহাজ। এটি দেশের জন্য ভালো দিক। তবে বিএসসি অনেক বড় পরিসরের জাহাজ ক্রয় করে। কোনো কোনো জাহাজের ধারণক্ষমতা ৫০ হাজার বা ৬০ হাজার মেট্রিকটন। এত বড় পরিসরের জাহাজ দেশের শিপইয়ার্ডে তৈরি হয় না। ভবিষ্যতে তৈরি করতে পারবে হয়তো। তবে এখনই নয়। এভাবে দেশীয় প্রতিষ্ঠান জাহাজ তৈরির কাজ অব্যাহত রাখলে আগামী ১০ বছরে সেই সক্ষমতা অর্জন করবে বলে আমার বিশ্বাস।
বিএসসির জাহাজের বহর বৃদ্ধির সঙ্গে দেশের মেরিন অফিসার-নাবিকদের কর্মসংস্থান কতটুকু বাড়বে?
বিএসসির বহরের সব জাহাজের অফিসার-নাবিক বাংলাদেশি। কোনো জাহাজেই বিদেশি অফিসার-নাবিক নেই। সামনে বহরে যেসব নতুন জাহাজ যুক্ত হবে সেখানেও শতভাগ বাংলাদেশি অফিসার-নাবিকরা কাজ করবেন। বিএসসির বহর বড় হওয়ার সঙ্গে নাবিকদের কর্মসংস্থানও বাড়বে। আমাদের গ্রোথ যতবেশি বাড়বে আমাদের লোকজনের কর্মসংস্থান বেশি হবে।
সময়ের আলো/এসএকে