আজ শুরু হলো ২০২৬-২৭ অর্থবছর। নতুন অর্থবছরের যাত্রা শুরু হচ্ছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেটকে সঙ্গে নিয়ে। তবে এ পথ মোটেই সহজ নয়। কারণ, দেশের অর্থনীতিকে এ বছর একাধিক কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বড় অঙ্কের বাজেট ঘাটতি, উচ্চাভিলাষী, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সব মিলিয়ে নতুন অর্থবছরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই বিশাল বাজেটের কার্যকর বাস্তবায়ন।
এদিকে নতুন অর্থবছরের বাজেটে নিত্যপণ্যের দাম কমার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কেননা ৬১টির মতো ভোগ্যপণ্যের ওপর শুল্ক-কর কমানো হয়েছে। তবে এর সঠিক বাস্তবায়ন কবে হবে এবং এর প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষ কবে পাবে সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে নতুন বাজেট পাস হয়েছে।
বাজেটে যেসব পণ্যের শুল্ক-কার বাড়ানো-কমানো হয়েছে সেগুলোও কার্যকর হবে আজ থেকেই। সে কারণেই প্রশ্ন এবার মিলবে তো পণ্যের শুল্ক কমানোর সুফল। এদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস হলো, কিন্তু চ্যালেঞ্জগুলো শুধু কাগজ-কলমে আটকে রাখলে হবে না। প্রথম দিন থেকেই সরকারকে বাজেট বাস্তবায়নে মাঠে নেমে পড়তে হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
এ মন্তব্য করে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘একটি বিশেষ পরিস্থিতির মধ্যে নতুন সরকারকে নতুন বাজেট দিতে হয়েছে। বিশেষ করে ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে এবং যুদ্ধসহ বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে এই বাজেট প্রণয়ন করেছে সরকার।
অন্যদিকে সম্পদের সীমাবদ্ধতা এবং রাজস্ব আহরণে সংকটময় অবস্থাও বিরাজ করছে এখন। এই যখন অবস্থা তখন সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট দিয়েছে। এটি বর্তমান সরকার ও অর্থমন্ত্রীর অনেক সাহসী বাজেট। এখন কথা হচ্ছে- এই বড় বাজেট বাস্তবায়ন করা কতটা সহজ হবে সরকারের কাছে বা নতুন অর্থবছরের পথচলা কেমন হবে সরকারের জন্য। এককথায় বললে বলতে হয়- নতুন অর্থবছরে সরকারকে অনেক কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে। কারণ এই পথের বাঁকে বাঁকে কাঁটা বিছানো থাকবে। অর্থাৎ প্রতিটি ধাপে ধাপে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে সরকারকে আগামী একটি বছর। তাই এ রকম পরিস্থিতিতে সরকার কীভাবে সব বাধা মোকাবিলা করে বাজেট বাস্তবায়ন করে এবং দেশের মানুষকে স্বস্তি দেয় সেটিই দেখার বিষয়।’
মূল চ্যালেঞ্জগুলো কী হবে : অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন অর্থবছরে সরকারের সামনে এত চ্যালেঞ্জ থাকবে যে বছরের ৩৬৫ দিনই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। নতুন বছরে নতুন নতুন দায় দিয়ে পথ চলতে হবে। আজ ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটির বাজেটে ঘাটতিই থাকবে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ অর্থাৎ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ঘাটতি পূরণ করা হবে বড় চ্যালেঞ্জ। এই ঘাটতির বড় অংশই আনার লক্ষ্য ব্যাংক ও বিদেশি ঋণ থেকে। সুদের হার বেশি থাকায় ঋণের কিস্তি দিতেই বাজেটের বড় অংশ চলে যাচ্ছে। এটিকে ঘাটতির ঘূর্ণিপাক বলে। এ কারণে উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ কমে যেতে পারে।
নতুন অর্থবছরে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সরকারের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। গত কয়েক বছর ধরে কর-জিডিপি ৭ শতাংশের ঘরে আটকে আছে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে টিআইএনের বাধ্যবাধকতা বাতিলের কারণে করের আওতা কমবে। আবার ৫ শতাংশ ছাড়ের সুবিধাও বাদ গেছে। তা হলে টাকা আসবে কোথা থেকে। রাজস্ব না বাড়লে ঘাটতি মেটাতে বেশি ঋণ করতে হবে সরকারকে। তাই রাজস্ব নিয়ে বড় দুশ্চিন্তা থাকবে বছরজুড়ে।
আরেক বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা ও ভর্তুকির চাপ কমানো। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৯ শতাংশের কাছে। নতুন অর্থবছরে সেটি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা অনেক দুরুহ কাজ হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। যদিও সরকার নতুন বাজেটে ৬১টি পণ্যের ওপর শুল্ক-কর কমিয়েছে দেশের সাধারণ ভোক্তাকে স্বস্তি দিতে। তবে এই স্বস্তি উড়ে যেতে পারে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে। এ জন্য অর্থনীতিবিদরা বাজার তদারকির ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
এ ছাড়া নতুন বাজেটে ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, যা আগের চেয়ে বেশি। এ ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, সারের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়লে এই ভর্তুকি আরও ফুলেফেঁপে আরও বড় হবে। তখন বাজেট বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জন্য নিত্যপণ্যের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
নতুন অর্থবছরের আরেক চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটানো। বিগত কয়েক বছর ধরেই দেশে চরম বিনিয়োগ সংকট চলছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ একেবারে তলানিতে নেমে গেছে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে- বাজেটে বেসরকারি খাতের জন্য বড় কোনো প্রণোদনা নেই। এ ছাড়া ডলার সংকট, উচ্চ সুদ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে ভরসা পাচ্ছেন না। এর ফলে প্রবৃদ্ধির চাকা সরকারি খরচের ওপরই নির্ভরশীল থাকবে, যা টেকসই নয়।
নতুন বছরে আরেক বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাজেট বাস্তবায়ন ও সুশাসনে ঘাটতি। অতীতে দেখা গেছে বড় বাজেটে বড় দুর্নীতি হয়েছে। মেগা প্রকল্প গ্রহণ করে মেগা দুর্নীতি হয়েছে। লাখ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। প্রতি বছরই দেখা যায় এডিপির টাকা শেষদিকে খরচ হয়। মেগা প্রকল্পের ব্যয় বাড়ে। দুর্নীতি ও অপচয় ঠেকানো যায় না। আবার বাজেট বড় হলেও মাঠ পর্যায়ে সুফল পৌঁছায় না।
তাই বাজেটের সফল বাস্তবায়ন ও সুশাসন বাড়াতে না পারলে বছর পাড়ি দেওয়া কঠিন হবে সরকারের জন্য। অর্থাৎ একদিকে যেমন রাজস্ব আদায় বাড়িয়ে টাকা তোলা কঠিন হবে, অন্যদিকে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য পরিচালন ব্যয় বাড়বে। তাই খরচের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।
স্বস্তির জায়গাও আছে কিছু : নতুন অর্থবছরে সরকারের জন্য কিছু স্বস্তির জায়গাও রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে কর-ব্যবস্থায় সহজীকরণ করা। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে টিআইএন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা বাতিল করা হয়েছে। এতে ১৮ বছরের কম বয়সি, ক্ষুদ্র আয়ের মানুষের জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক নয়। এতে হয়রানি কমবে। আবার অনলাইন রিটার্নের ক্ষেত্রে জরিমানা মওকুফ করা, ইউজার-ফ্রেন্ডলি পোর্টাল করার কথা বলা হয়েছে। এতে কর অফিসে দৌড়াদৌড়ি কমবে এবং হয়রানি বন্ধ হবে। ফলে মধ্যবিত্ত ও নতুন করদাতাদের জন্য প্রক্রিয়া সহজ। এ জন্য কর বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে।
নতুন বছরে সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তির কারণ হতে পারে নতুন বাজেটে নিত্যপণ্যে ব্যাপক কর ছাড়। বাজেটে নিত্যপণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর সুফল মিলতে পারে সাধারণ মানুষ। কেননা বাজেটে চাল-ডাল, ভোজ্য তেল, গুঁড়ো দুধ, চিকিৎসা সরঞ্জামসহ কিছু জরুরি পণ্যে আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট কমানো হয়েছে। এর মাধ্যমে বাজারে পণ্যের দাম কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। সরকারের মূল টার্গেটই এটি। তবে এতে সফলতা নির্ভর করছে বাজার ব্যবস্থাপনায় কতটা উন্নতি ঘটাতে পারে সরকার।
নতুন অর্থবছরে কিছুটা স্বস্তি আনতে পারে বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বাড়ানো। বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও উপবৃত্তির বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে নিম্নআয়ের ১ কোটির বেশি পরিবার সরাসরি উপকৃত হবে।
নতুন অর্থবছরে আরেকটি স্বস্তির বিষয় হতে পারে মেগা প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়া। বিগত সরকারের আমলে নেওয়া বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের মেয়াদ শেষের দিকে। যেমন- পদ্মা রেল লিংক, মেট্রো লাইন-৫, রূপপুরের মতো বড় প্রকল্পগুলো ২০২৬-২৭ এ অনেকটাই শেষ হওয়ার কথা। এসব মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ হলে যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ খাতে খরচ কমবে, সেবার মান বাড়বে।
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের করণীয় : অর্থনীতিবিদরা মনে করেন নতুন অর্থবছরে যেমন অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তেমনি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের জন্য কিছু করণীয় আছে। করণীয়গুলো ঠিকমতো পালন করতে পারলে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাও সহজ হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, করণীয়ের মধ্যে সবার আগে রাজস্ব আরহণ বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রেও রাজস্ব আদায়ে কৌশল বদল করা দরকার। কর বাড়ানো নয়, কর ফাঁকি ঠেকানো দরকার। নতুন কর না বসিয়ে কর ফাঁকি, ভ্যাট ফাঁকি বন্ধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে আধুনিকায়ন করতে হবে এবং ঢেলে সাজাতে হবে। ই-টিআইএন, ই-বিন, ই-চালান শতভাগ বাস্তবায়ন করতে হবে। তা হলে রাজস্ব আদায় বাড়বে।
করণীয়ের মধ্যে এর পর রয়েছে অপচয় রোধ ও বাজেট বাস্তবায়নে শৃঙ্খলা বজায় রাখা। এ ক্ষেত্রে মেগা প্রকল্পের খরচে কাটছাঁট, অপ্রয়োজনীয় সরকারি গাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ, সেমিনার বন্ধ করা দরকার। এডিপির টাকা বছর শেষে তাড়াহুড়ো করে খরচ বন্ধ করতে হবে। কেননা বাজেটে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ ঘাটতি মেটাতে গিয়ে ব্যাংক ঋণ নিলে বেসরকারি খাত টাকা পাবে না। সুদের বোঝা বাড়বে। ফলে সংকট কাটানো কঠিন হবে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে দেশের সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য সরকারের প্রচেষ্টা থাকতে হবে। এ জন্য সরকারকে মূল্যস্ফীতির মূল জায়গায় আঘাত করতে হবে। বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে মনিটরিং জোরদার করতে হবে। জ্বালানি ও ডলারের দাম স্থিতিশীল রাখতে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা ঠিক করতে হবে। কৃষিতে ভর্তুকি সময়মতো যাতে দেওয়া হয় এবং কৃষক যাতে ভর্তুকির প্রকৃত সুফল পায় সে ব্যবস্থা করতে হবে। কেননা পণ্যের দাম বাড়লেই মানুষের স্বস্তি থাকবে না।
করণীয়ের মধ্যে সরকারকে বেসরকারি বিনিয়োগে ভরসা ফেরানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য বিনিয়োগ পরিবেশে যেমন উন্নতি ঘটাতে হবে তেমনি এক জায়গায় সব লাইসেন্স পাওয়ার ব্যবস্থা বা ওয়ানস্টপ সার্ভিস ঠিকমতো চালু করতে হবে। নীতির অস্থিরতা বন্ধ করতে হবে এবং ব্যাংক ঋণের সুদ কমাতে হবে। কেননা সরকারের পক্ষে একা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হবে না। ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ না করলে কর্মসংস্থান বাড়বে না।
করণীয়ের মধ্যে আরও আছে- সব ক্ষেত্রে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। এ জন্য প্রতি মাসে বাজেট বাস্তবায়ন রিপোর্ট প্রকাশ করা দরকার। একই সঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ দরকার। কারণ টাকা থাকলেও সুফল মিলবে না, যদি না দুর্নীতি কমানো না যায়। মানুষকে বিশ্বাস করাতে হবে যে টাকা ঠিক জায়গায় খরচ হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এসব বিষয়ে সরকার যদি ভালোভাবে নজর দেয় এবং পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করে তা হলে নতুন বছরে অনেক চ্যালেঞ্জ থাকলেও তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
সময়ের আলো/এসএকে