কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত সাইবার আক্রমণের সরঞ্জামগুলোকে ‘ডিজিটাল পারমাণবিক অস্ত্রের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর প্রধান জন র্যাটক্লিফ। তার মতে, এই প্রযুক্তি বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। মার্কিন সময় মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের এক সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এমন মন্তব্য করেন। সেখানে তিনি সিআইএর কাজে বেসরকারি খাতের প্রযুক্তি ও পণ্য দ্রুততার সঙ্গে সংগ্রহ ও ব্যবহার করার বিষয়েও আলোচনা করেন।
র্যাটক্লিফ বলেন, এআই প্রযুক্তি আমাদের প্রতিপক্ষ দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করে তুলবেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের আলোচনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি যোগ করেন, এই প্রযুক্তির সক্ষমতাকে ডিজিটাল পারমাণবিক অস্ত্রের সমতুল্য বললে ভুল হবে না। তার দাবি, প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো ‘যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবন ও অগ্রগতিকে চুরি ও বিকৃত করে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’
এআইয়ের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা : সাইবার নিরাপত্তা ভেদ করার ক্ষমতাসহ এআই প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতি বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত মাসেই অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা জোট ‘ফাইভ আইজ’ সতর্কবার্তা দিয়ে জানায়, আধুনিক এআই মডেলগুলো ‘শিল্পের বর্তমান প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে যাবে এবং সাইবার আক্রমণ ও প্রতিরক্ষা উভয় ক্ষেত্রেই মৌলিক পরিবর্তন আনবে।’ তাদের মতে, এই পরিবর্তন আসতে কয়েক বছর নয়, মাত্র কয়েক মাসই লাগবে।
মার্কিন সিনেটর মার্ক ওয়ার্নারও এক শুনানিতে একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা এনএসএর প্রধান জোশুয়া রাড তাকে বলেছেন, অ্যানথ্রপিক প্রতিষ্ঠানের ‘মিথোস ৫’ এআই মডেলটি ‘সপ্তাহ নয়, মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রায় সব শ্রেণিবদ্ধ সুরক্ষিত ব্যবস্থায় প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে।’ তবে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, এনএসএর পরীক্ষাটি প্রকৃত হ্যাকিং নয়, বরং সুরক্ষা ত্রুটি শনাক্তে এআইর সক্ষমতা যাচাই করার উদ্দেশ্যে চালানো হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে এআই খাতের দ্রুত প্রসারের পেছনে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ রয়েছে, যার সমর্থন দেওয়া হচ্ছে ভবিষ্যতে বিশাল লাভের প্রত্যাশা দিয়ে। কিছু বিশ্লেষক অবশ্য একে আর্থিক বুদ্বুদ হিসেবে আখ্যা দিয়ে সতর্ক করছেন। তাদের মতে, যদি মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বব্যাপী একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তবে এই খাতে ধস নামতে পারে।
তবে এআইয়ের সক্ষমতা নিয়ে সব ভবিষ্যদ্বাণী এখনও বাস্তবে রূপ পায়নি। যেমন বর্তমান মডেলগুলো কোড তৈরি ও তথ্য বিশ্লেষণে দক্ষ হলেও পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় গাড়ি চালানোর প্রযুক্তি এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
ডিপসিক-এ যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যে বাধা : যুক্তরাষ্ট্রের এআই অগ্রযাত্রার বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদেশি প্রতিযোগিতা যেখানে সমান ক্ষমতাসম্পন্ন প্রযুক্তি অনেক কম খরচে তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চীনের প্রতিষ্ঠান ডিপসিক তাদের ‘আর১’ ও ‘ভি৩’ মডেল উন্মুক্ত করে পুরো শিল্পকে চমকে দেয়। এই মডেলগুলোর সক্ষমতা চ্যাটজিপিটিসহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রযুক্তির সমতুল্য হলেও উৎপাদন খরচ ছিল তার এক ভাগেরও কম। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করেন, এই সাফল্যের পেছনে মূলত মার্কিন গবেষণা ও কাজের ওপর ভিত্তি করে চীনা প্রতিষ্ঠানটি সুবিধা নিয়েছে।
এর পর গত জুনের মাঝামাঝি সময়ে চীনের আরেক প্রতিষ্ঠান ঝিপু তাদের নতুন কোড তৈরির মডেল ‘জিএলএম-৫.২’ প্রকাশ করলে আবারও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। মেটা ও গুগল ডিপমাইন্ডের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ম্যাট ভেলোসো একে বর্ণনা করেন ‘প্রথম উন্মুক্ত মডেল হিসেবে, যা প্রতিদিনের ব্যবহারের যোগ্যতা রাখে।’
এদিকে উন্নত মাইক্রোচিপ তৈরিতেও চীন দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমান্তরালে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের গতি কমানোর যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল এখন কার্যকর হচ্ছে না। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর্যাপ্ততা চীনকে এআই প্রতিযোগিতায় আরও একধাপ এগিয়ে রাখছে।
সময়ের আলো/আআ