সিয়াটল ট্র্যাজেডি : ভাগ্যের সঙ্গে সেনেগালের চিরন্তন অভিমানের গল্প

ক্রীড়া ডেস্ক

খেলা

ফুটবল কি কেবলই একটি খেলা? নাকি সবুজ গালিচায় মঞ্চস্থ হওয়া কোনো নির্মম গ্রীক ট্র্যাজেডি? যারা আজ ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে চোখ

2026-07-02T16:53:34+00:00
2026-07-02T16:53:34+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬,
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
খেলা
সিয়াটল ট্র্যাজেডি : ভাগ্যের সঙ্গে সেনেগালের চিরন্তন অভিমানের গল্প
ক্রীড়া ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬, ৪:৫৩ পিএম 
সিয়াটলে সেনেগালের রূপকথা ভাঙার গল্প। সংগৃহীত ছবি
ফুটবল কি কেবলই একটি খেলা? নাকি সবুজ গালিচায় মঞ্চস্থ হওয়া কোনো নির্মম গ্রীক ট্র্যাজেডি? যারা আজ ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে চোখ রেখেছিলেন, তারা হয়তো দ্বিতীয় উত্তরটিই বেছে নেবেন। ম্যাচের ৮৫ মিনিট পর্যন্ত যে দলটির নামের পাশে ২-০ গোলের জ্বলজ্বলে লিড, যারা অদম্য বিক্রমে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করে রেখেছিল, মাত্র কয়েক মিনিটের এক পৈশাচিক ঝড়ে তাদেরই বিশ্বকাপ স্বপ্ন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। ৮৬তম মিনিট থেকে শুরু হওয়া সেই ধ্বংসযজ্ঞের শেষ দৃশ্যে বেলজিয়ামের কাছে ৩-২ ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হলো সেনেগালকে।

ম্যাচটা যখন শেষ হতে আর অল্প কিছু সময় বাকি, তখনো সেনেগালের ডাগআউট ও গ্যালারিতে ছিল উৎসবের আবহ। কিন্তু ফুটবল দেবতা হয়তো পর্দার আড়ালে বসে অন্য কোনো নিষ্ঠুর চিত্রনাট্য লিখছিলেন। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে কী এক অবিশ্বাস্য বিপর্যয় নেমে আসতে যাচ্ছে, তা টের পাওয়ার পর সেনেগালের দর্শকদের স্তব্ধ, হতবিহ্বল অভিব্যক্তিই বলে দিচ্ছিল-বিশ্বকাপের এই রঙিন ও স্বপ্নিল মঞ্চ থেকে আরেকটি বুকভাঙা বিদায়ের কাব্য রচিত হতে চলেছে। ৮৫ মিনিট পর্যন্ত সব ঠিকঠাক থাকার পর, অতিরিক্ত সময়ের খেলা শেষে যখন স্কোরবোর্ড ৩-২ হলো, তখন শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথে পুরো স্টেডিয়াম মুহূর্তেই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল।


একটু আগেও যারা বিদায়ের প্রহর গুনছিল, সেই বেলজিয়াম শিবির তখন বন্য উল্লাসে ফেটে পড়েছে। আর ঠিক তার বিপরীত প্রান্তে সেনেগাল শিবিরে নেমে এসেছে শ্মশানের নীরবতা আর কান্নার রোল। হতাশায় পিচেই ভেঙে পড়া আফ্রিকান সিংহদের সেই মুখগুলো পৃথিবীর যেকোনো পাষাণ মানুষের হৃদয়কেও ছুঁয়ে যেতে বাধ্য। তবে সব ছাপিয়ে সিয়াটলের বাতাসকে ভারী করে তুলছিল ২০ বছর বয়সী তরুণ মিডফিল্ডার লামিন কামারার অবিরত, বুকফাটা কান্না।

পরাজয়ের এই গভীর ক্ষতের পেছনে সবচেয়ে বড় দায়টা যেন এক লহমায় চেপে বসেছিল এই তরুণের কাঁধেই। ম্যাচের ১২৪ মিনিটে, যখন ম্যাচটি টাইব্রেকারের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই তার একটি ফাউল থেকে পেনাল্টি পেয়ে যায় বেলজিয়াম। আর তাতেই নিশ্চিত হয় সেনেগালের এই করুণ বিদায়। ম্যাচ শেষের পর নিজের আবেগ আর ধরে রাখতে পারেননি কামারা। সতীর্থরা নিজেরা ভেঙে পড়ার পরও বুকে টেনে নিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন তাকে, এগিয়ে এসেছিলেন দলের স্টাফরাও। কিন্তু কোনো কিছুতেই কামারার ফুঁপিয়ে ওঠা কান্না থামানো যাচ্ছিল না। এমনকি এই ম্যাচে বেলজিয়ামের জয়ের নায়ক ইউরি টিলেমান্স পর্যন্ত এগিয়ে এসে কামারার মাথায় ও পিঠে হাত বুলিয়ে পরম মমতায় শান্ত করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু নাহ, কোনো সান্ত্বনাই যেন সেই মুহূর্তে যথেষ্ট ছিল না। এই এক পেনাল্টির অপরাধবোধ আর কান্নার রেশ ভুলতে কামারার হয়তো গোটা জীবনটাই লেগে যাবে!


কামারার এই কান্না দেখতে দেখতে নিউজের টেবিলে বসে বারবার একটা কথাই মনে হচ্ছিল-এমনও হয় নাকি! এভাবেও কি একটা জেতা ম্যাচ হারতে হয়! নিয়তি কেন এতটা নির্মম? এই হারের ক্ষত শুধু কামারাকে নয়, সাদিও মানে কিংবা ইসমাইলা সারদেরও অনেক দিন তাড়া করে বেড়াবে। বহু রাত হঠাৎ দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠার কারণ হবে সিয়াটলের এই ভোর। এই তো মাত্র কিছুদিন আগের কথা, মাঠের লড়াইয়ে জেতার পরও এক অদ্ভুত নিয়মে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল সেনেগালের আফকন শিরোপা। আর এবার বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন ট্র্যাজেডি। ভাগ্যের ওপর অভিমান করে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেও হয়তো আজ সেনেগালের খেলোয়াড়দের দোষ দেওয়া যাবে না।

ফুটবল আসলে এমনই এক দ্বিধারী তলোয়ার। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও রোমাঞ্চকর এই খেলাটি মুহূর্তের মধ্যে হয়ে উঠতে পারে এক ভয়ংকর আততায়ী; যা হাসতে হাসতে ছুরি বসিয়ে দিতে পারে বুকের বাঁ পাশে। আজ তেমনই এক আততায়ীর হাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে, রক্তাক্ত হৃদয় নিয়ে বাড়ির পথ ধরতে হবে সেনেগালের খেলোয়াড় ও কোটি ভক্ত-সমর্থককে। হয়তো বিষাদে আচ্ছন্ন মনে তারা ভাববেন, এত নিষ্ঠুর যে খেলা, তা না খেললেই তো ভালো হতো!


অথচ ম্যাচের শুরুটা দেখে কেউ ভাবতেও পারেনি এমন কিছু ঘটতে যাচ্ছে। অনেকেই হয়তো সেনেগাল ২-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর ম্যাচটিকে সম্পূর্ণ ‘নীরস’ ও একপেশে ভেবে টেলিভিশন বন্ধ করে ঘুমাতেও চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কিছু একটা ঘটার আশায় যেসব আশাবাদী মানুষ রাত জেগে বসেছিলেন, ফুটবল তাদের এক অবিশ্বাস্য ‘উপহার’ দিয়েছে। বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও শ্বাসরুদ্ধকর এক রোমাঞ্চের সাক্ষী হয়েছেন তারা।

গাণিতিক ও কৌশলগতভাবে এটি এমন এক ম্যাচ, যেখানে একটি দল ৮৫ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও ৯০ মিনিটের মধ্যে সেই লিড ধরে রাখতে পারল না। আবার প্রতিপক্ষকে অতিরিক্ত সময়ের ১১৯ মিনিট পর্যন্ত বুক চিতিয়ে আটকে রাখার পরও ম্যাচটিকে টাইব্রেকারে নিয়ে যেতে পারল না। এই না পারার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা হয় না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া এই কয়েক মিনিটের ধ্বংসযজ্ঞের কোনো উত্তর কারো জানা নেই। সিয়াটলের ম্যাচ শেষে সেনেগালের খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ থেকে শুরু করে সাধারণ সমর্থক-সবার চোখমুখ জুড়েই ছিল সেই ব্যাখ্যাতীত মুহূর্তগুলোর উত্তর খোঁজার আকুলতা।


বিশ্লেষকরা এই হারের পেছনে অনেক কারণই দাঁড় করাবেন। কেউ বলবেন রেফারির বিতর্কিত পেনাল্টির সিদ্ধান্তের কথা, কেউ মেতে উঠবেন বেলজিয়ামের কখনো হার না-মানা মানসিকতার প্রশংসায়, কিংবা কেউ খুঁড়ে বের করবেন সেনেগালের রক্ষণভাগের শেষ মুহূর্তের গন্ডগোলকে। তবে কারণ যা-ই হোক না কেন, রূঢ় সত্যিটা হলো-লামিন কামারার সেই কান্না সিয়াটলের বাতাসকে আরও অনেক দিন ভারী করে রাখবে। ফুটবল ইতিহাসে মারকানা কিংবা বেলো হরিজেন্তের মাঠে কান পাতলে যেমন আজো ব্রাজিলিয়ানদের কান্নার আর্তনাদ শোনা যায়, ঠিক তেমনি বহু বছর পরও সিয়াটল স্টেডিয়ামের ঘাসে কান পাতলে শোনা যাবে লামিন কামারার সেই ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ।

সময়ের আলো/আরবিএন 


  বিষয়:   সেনেগাল  সিয়াটল  বেলজিয়াম 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: